Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ৪ ১৪২৮ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কোলাহল নেই শালবন বিহারে, কমেছে রাজস্ব আয় 

আবদুর রহমান, কুমিল্লা  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৫১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১১:৫৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১
কোলাহল নেই শালবন বিহারে, কমেছে রাজস্ব আয় 

কুমিল্লার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শালবন বিহার

কুমিল্লার ‌‘পর্যটন নগরী’ খ্যাত কোটবাড়ি এলাকার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর। সারা বছরই পর্যটকদের পদচারণায় ঐতিহাসিক স্থান দুটি মুখর থাকতো। বছরজুড়েই প্রত্নসম্পদে ভরপুর কোটবাড়ি এলাকাটি নানা বয়সী দর্শনার্থীরা প্রাণচাঞ্চল্যময় করে রাখতেন। এছাড়া কোটবাড়ি এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও ভিড় লেগে থাকতো ভ্রমণপিপাসুদের।

তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস যেন সবকিছুর গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। সারাদেশের মতো কুমিল্লার পর্যটন খাতেও লেগেছে করোনার ধাক্কা। করোনার প্রকোপ ঠেকাতে প্রথম দফায় দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র। দেশজুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে আবারও প্রায় চারমাস বন্ধ থাকে জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র।

গত মাসে জেলার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘরসহ দর্শনীয় স্থানগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু হলেও আগের মতো দেখা মিলছে না পর্যটকের। এসব স্থানে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে কমেছে সরকারের রাজস্ব আয়। এছাড়া দর্শনার্থী কম থাকায় পর্যটনসংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ও ভাটা পড়েছে। তবে সবারই প্রত্যাশা, করোনাের ক্ষত কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে কুমিল্লার পর্যটন খাত।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা কার্যালয় সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ৬ মাস পর ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চালু করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের মার্চে সারাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে এপ্রিলের শুরু থেকে ফের বন্ধ করে দেওয়া হয় এসব ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পরিস্থিতি কিছুুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় প্রায় চার মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৯ আগস্ট থেকে আবারও এসব স্থান চালু করা হয়। কিন্তু চালুর এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও আগের মতো দেখা মিলছে না পর্যটকদের।

সূত্র জানায়, কুমিল্লার লালমাই ও ময়নামতি পাহাড় এলাকায় অন্তত ২৩টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উন্মোচিত হওয়া ১২টির মধ্যে শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর থেকে সরকার রাজস্ব আয় করছেন। অন্যগুলো এখনো বিনা খরচে দেখতে পারছেন পর্যটকরা। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার পর সবার প্রত্যাশা ছিল, নানা বয়সী পর্যটকের কোলাহলে জেলার এসব স্থান মুখর হয়ে উঠবে। এছাড়া করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ধীরে ধীরে প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠবে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী লালমাই পাহাড় ঘিরে গড়ে ওঠা সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পার্কগুলো। আর কর্মব্যস্ত হয়ে উঠবেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসায়ী। কিন্তু পর্যটকদের পদচারণা তেমন না থাকায় সবার ধারণা পাল্টে গেছে। এরপরও সুদিনের অপেক্ষায় রয়েছেন কুমিল্লার পর্যটন সংশ্লিষ্ট সবাই।

মঙ্গলবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিন শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুটো স্থানেই দর্শনার্থীদের তেমন চাপ নেই। কোলাহল নেই। যদিও অন্যান্য বছরে এ সময় দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হতো কর্তৃপক্ষের। এছাড়া অন্যান্য বছর এমন সময়ে দেশীয় দর্শনার্থী ছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি থাকতো চোখে পড়ার মতো। কিন্তু করোনার কারণে বর্তমানে বিদেশি পর্যটক নেই বললেই চলে।

শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরকে কেন্দ্র করে সেখানে অর্ধশতাধিক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, পর্যটনসংশ্নিষ্ট এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মন্দা। পর্যটক তেমন না আসায় দোকানীদের বিক্রি একেবারেই কম। ফলে অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান গুণতে হচ্ছে।

ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান হাসিবুল হাসান সুমি বলেন, ২০১৯ সালের এই সময়ে যেই পরিমাণ পর্যটক এসেছেন, এখন তার তিন ভাগের একভাগও নেই। আগে এমন সময়ে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসতো। পর্যটকদের সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হতো। আর করোনার প্রকোপের কারণে এখন সেখানে পর্যটক আসছেন প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২'শ। এছাড়া বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা একেবারেই কম। তবে আমরা আশাবাদী, আবারও পর্যটকদের কোলাহলে প্রাণচাঞ্চল্যময় হয়ে উঠবে এসব এলাকা।

হাসিবুল হাসান সুমি আরও বলেন, দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রবেশের সময় তাদের নিরাপত্তা কর্মীরা এবং টিকিট কাউন্টারে থাকা কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি তদারকি করছেন। তবে দর্শনার্থী কম আসায় রাজস্ব আয়ও অনেক কমে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শালবন বিহারে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী ফেরদৌস আক্তার লাইজু বলেন, ঐতিহাসিক এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিল। আমাদের ধারণা ছিল দর্শনার্থীদের চাপ বেশি থাকবে। তাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে এসেছি। তবে আগের মতো এখন আর মজা লাগছে না। পর্যটকের সংখ্যা অনেক কম।

আরেক দর্শনার্থী মো. মহিউদ্দিন আকাশ বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কুমিল্লাকে গৌরবান্বিত করে এই শালবন বিহার।  দীর্ঘ দিন পর শালবন বিহার ও ময়নামতি জাদুঘরে ঘুরতে এসেছি। এসেই বুঝতে পেরেছি, করোনা আমাদের জীবনের গতিপথ অনেক বদলে দিয়েছে। আগে এই সময়ে যেই পরিমাণ দর্শনার্থীর ভিড় থাকতো, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। অনেক দিন পর আসায় সবকিছু যেন নতুন নতুন লাগছে।

শালবন বিহারের সামনে ফুচকা-চটপটি বিক্রি করেন খোরশেদ আলম। কিন্তু পর্যটক কম আসায় তার ব্যবসা মন্দা চলছে। খোরশেদ বলেন, দীর্ঘ দিন পর সব কিছু চালু হয়েছে। আশা করেছিলাম ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু পর্যটকের উপস্থিতি একেবারেই কম। তবে এরপরও আশা ছাড়িনি, আশা করছি সব কিছু ঠিক থাকলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।

খুদে কুটির শিল্প ব্যবসায়ী আবুল কালাম ওরফে কালু বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘ দিন আমার দোকানটি বন্ধ ছিল। এতে লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, নতুন করে সব শুরু হচ্ছে, পর্যটকদের ঢল নামবে। আবার ঘুরে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বিক্রি একেবারেই কম।

কুমিল্লা ভিক্টোরি ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ পাটোয়ারি বলেন, কুমিল্লা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জেলা। কুমিল্লার পর্যটন অনেক আগে থেকেই সমৃদ্ধ। কুমিল্লার পর্যটন স্পটগুলো থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া গেলে কুমিল্লার সরকারি-বেসরকারি পর্যটন খাত আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে প্রত্যাশা করি।

/মাহি/ 

সর্বশেষ