Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৭ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১১ ১৪২৮ ||  ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Risingbd Online Bangla News Portal

তিন মানসিক প্রতিবন্ধী নিয়ে ভালো নেই বৃদ্ধ দীনেশ

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:২৭, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:৩০, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
তিন মানসিক প্রতিবন্ধী নিয়ে ভালো নেই বৃদ্ধ দীনেশ

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের কস্তুরিপাড়া গ্রামে চার সদস্যের পরিবারে তিন সদস্য মানসিক প্রতিবন্ধী। থাকেন ভাড়া করা জরাজীর্ণ টিনের ঘরে। তিন জনেরও একজনও পান না প্রতিবন্ধী ভাতা। খুবই মানবেতর জীবন কাটছে এই পরিবারটির। 

প্রতিবন্ধী ভাতাসহ তাদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছে ওই পরিবারের কর্তা বৃদ্ধ দীনেশ সূত্রধর।

দীনেশ সূত্রধর জানান, ১৯৭৪ সালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া এলাকার সুবল সুত্রধরের মেয়ে পারুল সুত্রধরকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে দীনেশ করোটিয়াতেই বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন। তার অধীনে বেশ কয়েকজন রাজমিস্ত্রী কাজ করতো। সংসারও বেশ ভালোভাবে চলছিলো। তাদের দুইটি ছেলে হওয়ার পর প্রায় ২০ বছর আগে দীনেশের স্ত্রী পারুল সূত্রধরের টাইফয়েড দেখা দেয়। এতে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এরপর ৭ বছর বয়সে বড় ছেলে দিজেন নেশায় আসক্ত হয়। এক সময় পাগল হয়ে যায়। পরে তাকে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হতো। এরপর একদিন হঠাৎ শিকল ভেঙে পালিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাকে খুঁজে পায়নি পরিবার।  

২০০২ সালে তাদের ঘরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় দীপা সূত্র ধর। পরবর্তিতে দীপা যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশুনা করে তখন তারও টাইফয়েড জ্বর হয়। এরপর থেকেই দীপাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। প্রায় ৫ বছর ধরে দীপাকেও শিকল দিয়ে ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছে। 

এরপর পরিবার নিয়ে ২০১৬ সালে দীনেশ সূত্রধর নিজ এলাকা কালিহাতীর বীরবাসিন্দার কস্তুরীপাড়া এলাকায় চলে আসে। এখানে আসার পরই দীনেশের আরেক ছেলে দীপন সূত্রধরও প্রায় এক বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। তাকেও শিকলে বন্দি করে বাড়ির বাইরে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন। তবে স্থানীয়দের সাহায্য সহযোগিতায় দীপনের মানসিক চিকিৎসা করানোয় সে বর্তমানে কিছুটা ভাল হয়েছে।

এদিকে একই পরিবারের তিনজন মানসিক প্রতিবন্ধী থাকলেও সরকারিভাবে দেওয়া হয়নি প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক ভাতার কার্ড।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীনেশ সূত্রধর পেশায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করলেও বয়সের ভারে ন্যূব্জ। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। সড়কের পাশে জরাজীর্ণ টিনের একটি ঘর ৮০০ টাকা ভাড়া নিয়ে কোন রকমে প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন খেয়ে না খেয়ে। তার একমাত্র মেয়েটিকে ঘরের এক কক্ষে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। চিকিৎসার করানোর পর দুই তিন মাস হল ছেলে কিছুটা সুস্থ হয়েছে। তবে প্রতিদিনই তিনজনকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। দীনেশ সূত্রধর ভিক্ষাবৃত্তি না করলেও তাদের সংসার চলছে মানুষের দয়া বা করুণায়।

কস্তুরীপাড়া গ্রামের শাহাদৎ হোসেন বলেন, দীনেশের স্ত্রী,  ছেলে ও মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী। মেয়েটিকে ঘরের মধ্যে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছেলেটিকেও দুইমাস আগেও বাড়ির বাইরে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। খুবই দরিদ্র অসহায় দীনেশ। তার ছেলের এই অবস্থা দেখে স্থানীয়রা মিলে টাকা সংগ্রহ করে তার ছেলের মানসিক চিকিৎসা করানো হয়। বর্তমানে ছেলেটা কিছু সুস্থ হলেও মেয়েটা শিকলেই বাঁধা রয়েছে। ঠিকমত খাবারই পায় না সেখানে তার সন্তান ও স্ত্রীকে কিভাবে চিকিৎসা করাবে। এলাকার অনেক ধনী মানুষ সরকারি বয়স্ক ভাতার কার্ড পেয়েছে। কিন্তু এই অসহায় মানসিক ভারসাম্যহীন পরিবারটি সরকারি কোন সহায়তা পায় না। 

বৃদ্ধ দীনেশ বলেন, পরিবারের তিনজন পাগল। বৃদ্ধ বয়সে এখন আর কাজ করতে পারি না। ফলে পাগলদের দেখাশুনা করতে করতে নিজেও মানসিক রোগীতে পরিণত হচ্ছি। বাড়ির রান্না-বান্না আমাকেই করতে হয়। 

বীরবাসিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বলেন, পরিবারটি এরআগে করটিয়ায় ছিল। পরিষদ থেকে এর আগে চাল দেওয়া হয়েছিল। চার সদস্যের পরিবারের তিনজনই মানসিক প্রতিবন্ধী। দীনেশের ছেলেকে মাস খানেক আগেও রাস্তার ধারে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছি। নতুন বরাদ্দ আসলেই তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানরা তালিকা দেয়। সেখানে তাদের নাম দেওয়া হয়নি। পরবর্তিতে তাদের নামে ভাতার কার্ড চালুর বিষয়ে উপজেলা মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হবে।

জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গণি বলেন, কালিহাতীতে একটি পরিবারে চারজন সদস্য প্রতিবন্ধী এবং তারা আর্থিক সহায় সম্বলহীন নিঃস্ব। কিন্তু তারা এখনও প্রতিবন্ধী ভাতা পান না অথবা অন্যান্য সরকারি সহায়তা পান না বলে জানতে পেরেছি। তদন্ত করে অতিদ্রুতই তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার প্রয়োজন হলে সেই ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের আবাসনের দরকার হলে জেলা প্রশাসন থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তাদের প্রদান করা হবে। এছাড়াও তাৎক্ষনিক সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবু কাওছার/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়