Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৮ ||  ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

নারিকেল তেল উৎপাদনের খ্যাতি হারাচ্ছে বাগেরহাট 

আলী আকবর টুটুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৪৩, ১৯ অক্টোবর ২০২১  
নারিকেল তেল উৎপাদনের খ্যাতি হারাচ্ছে বাগেরহাট 

এক সময়ে নারিকেল তেল উৎপাদনে বাগেরহাটের খ্যাতি ছিলো। ৬০টিরও বেশি মিলে উৎপাদিত হত নারিকেলের তেল।  নারিকেলের অভাবে এখন আর সেভাবে তেল উৎপাদন করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। 

এর বাইরে রয়েছে মোড়কজাত তেলের আধিপত্য। যা স্থানীয় তেল উৎপাদনকারীদের জন্য আরও শঙ্কার কারণ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাগেরহাটের অনেক তেলের মিল এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। নষ্ট হচ্ছে এসব তেলমিলের মূল্যবান যন্ত্রাংশ। অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মিলের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকরা। বিশ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র দশ ভাগে। তারপরেও হাতেগোনা কয়েকজন মিল মালিক ধরে রাখতে চান এই ব্যবসা।

মিল মালিকদের থেকে জানা যায়, আশির দশকে বাগেরহাটে ৬০টির অধিক মিলে নারিকেলের তেল উৎপাদিত হতো।তারও আগে ঘানিতে তেল উৎপাদন হতো। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এই তেল চলে যেতো ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তবে নারিকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্রমান্বয়ে মিলগুলো বন্ধ হতে থাকে। বর্তমানে চালু আছে মাত্র দশটি মিল। এর মধ্যে শুধু বিসিক শিল্প নগরীর ১৫টি মিলের মধ্যে চালু আছে ৬টি মিল। যার উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৯০ ভাগ।

বিসিক ও মিল মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, একসময় বাগেরহাটের বিসিক শিল্প এলাকাসহ জেলার ৬০টি নারিকেল তেলের মিলে প্রতিদিন প্রায় ২৬ মেট্রিক টন নারিকেল তেল উৎপাদন হতো। সেই উৎপাদন এখন নেমে এসেছে মাত্র দশ ভাগে। নারিকেল প্রক্রিয়াজাতের সাথে জড়িত ছিল দুই হাজারের অধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক। বর্তমানে বিসিকের ৬টি ও যাত্রাপুর, চুলকাঠী, সিএন্ডবি বাজারের ৪টিসহ মাত্র ১০টি তেলের মিল চালু রয়েছে। 

বাগেরহাট শিল্প এলাকায় অবস্থিত কোকোনাট ওয়েল মিল ‘সাহা এন্টারপ্রাইজ’ এর মালিক জীবন কৃষ্ণ সাহা বলেন, ১৯৯৮ সালে মিলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দৈনিক ৫০০ কেজি তেল উৎপাদন হতো। চাহিদা থাকায় এক পর্যায়ে উৎপাদন বেড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ কেজিতে দাঁড়ায়। জেলায় দৈনিক নারিকেল তেল উৎপাদন ছিল ২৪ থেকে ২৫ টন। তখন এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে অসংখ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু ২০০৬ সালের দিকে বাজারে মোড়কজাত তেল বিক্রি শুরু হলে কমতে থাকে এই তেলের চাহিদা ও উৎপাদন। বর্তমানে আমার মিলে দৈনিক ২০০ কেজির বেশি তেল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। মিল চালুর প্রথম দিকে প্রতি কেজি তেল দেড়শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হত। পরে ছয়শ থেকে সাতশ টাকা দরেও বিক্রি করেছি। আর এখন সেই তেল বিক্রি করতে হচ্ছে চারশ টাকায়।

অপর এক ব্যবসায়ী অশোক সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে নারিকেল তেলের জন্য বাগেরহাট ছিল বিখ্যাত। দিন দিন তেলের উৎপাদন কমতে থাকায় এখন আর সেই জৌলুস নেই। হাটে পর্যাপ্ত নারিকেল ওঠে না। উৎপাদিত নারিকেল বেশিরভাগ-ই ডাব হিসেবে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন শহরে। পর্যাপ্ত নারিকেলের যোগান না থাকার জন্যই আগের মতো তেল উৎপাদন হয়।’

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বর্ণালী অটো কোকোনাট অয়েল মিলের মালিক শংকর সাহা বলেন, একদিকে চাহিদা অনুযায়ী নারিকেল পাইনা, অন্যদিকে মোকামে পাইকারদের কাছে বকেয়া থাকায় মিল চালাতে কষ্ট হচ্ছিলো। এর মধ্যে আবার করোনা মহামারি। সব কিছু মিলিয়ে মিল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি।

রামপালের চাকশ্রী এলাকার নারিকেল ব্যবসায়ী শেখ ইউসুফ আলী বলেন, ‘এক যুগ আগেও বিভিন্ন হাট থেকে পাঁচ-ছয় হাজার পিস নারিকেল কিনতাম। বর্তমানে হাটে এক হাজারের বেশি নারিকেল কেনা সম্ভব হয় না। আগের মত ব্যবসা না হওয়ায় এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়’। 

সদর উপজেলার বৈটপুর এলাকার বাসিন্দা রাজিব মল্লিক বলেন, ‘আমার প্রায় ত্রিশটি নারিকেল গাছ রয়েছে। আগে শুকনা নারিকেল হাটে নিয়ে বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন ডাব ক্রেতারা বাড়িতে এসে ডাব কিনে নিয়ে যায়। কষ্টও হয়না, দামও ভালো পাই। 

তেল মিলের শ্রমিক হেলেনা বেগম বলেন, আট বছর আগে নারিকেল ভেঙে প্রতি মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে আয় করতাম। বর্তমানে এক হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারি না। অন্য কোনো কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে এই মিলে কাজ করছি। এর আগে অন্য দুইটি মিলে কাজ করেছি। সেই মিল গুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শরিফ সরদার বলেন, ‘বাগেরহাট বিসিক শিল্প এলাকায় ১৫টি নারিকেল তেলের মিল চালু ছিলো। এর মধ্য বর্তমানে ৯টি বন্ধ রয়েছে। বাকি ৬টির উৎপাদনও আগের তুলনায় অনেক কম’। 

বাগেরহাট/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়