Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ৩০ নভেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৬ ১৪২৮ ||  ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

তিন দশকে নদীগর্ভে বিলীন রাজবাড়ীর ১০ হাজার হেক্টর জমি

রাজবাড়ী প্রতিনিধ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪৭, ২৫ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১২:৪৭, ২৫ অক্টোবর ২০২১
তিন দশকে নদীগর্ভে বিলীন রাজবাড়ীর ১০ হাজার হেক্টর জমি

প্রমত্তা পদ্মা বিদৌত রাজবাড়ী জেলা পদ্মার কন্যা বলে পরিচিত। জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে চারটি উপজেলা পাংশা-কালুখালী-রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা পদ্মার পাড় ঘেষে অবস্থিত। কিন্তু গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে পদ্মার তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে এই জেলা। এরই মধ্যে নদীর পেটে চলে গেছে জেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি। নদীতে বিলীন হয়েছে ঘড়বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির-মসজিদ, কবরস্থানসহ অসংখ্য স্থাপনা। 

সম্প্রতি পদ্মা আবারও আগ্রাসী রুপ ধারন করেছে। বুধবার (২০ অক্টোবর) সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরসিলিমপুরে আবারও নতুন করে ৫০ মিটার এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দেয়। এনিয়ে গত দুই মাসে পদ্মার ভাঙ্গনে এক হাজার মিটারের বেশি এলাকাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,মসজিদ ও বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। 

রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নি দিয়ে  প্রবাহিত  পদ্মা নদী ভাঙতে ভাঙতে  এখন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করেছে। বর্তামানে নদীর দূরত্ব শহর রক্ষা বাঁধ থেকে পাঁচ থেকে দশ ফিটের মতো। যে কোনো মুহূর্তে শহর রক্ষা বাঁধটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পদ্মা পাড়ের মানুষরা উদ্বেক- উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।

সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের নয়ন মৃধা জানান, একটা সময় তার জায়গা জমি ছিলো প্রায় ৮০ বিঘা। সে সময় তার জমিতে পটল, ধান, আখসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো। সংসারে কোনো অভাব ছিলো না। কিন্তু গত এক দশকে নদী ভাঙ্গনের কারণে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি আমি।’ 

একই গ্রামের সফিকউদ্দিন মোল্লা জানান, তার ১০০ বিঘা জমি ছিলো। সেই জমি থেকে ধান, পাটসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ হতো। ক্ষেত পরিচর্জার জন্য প্রতিদিন পনের থেকে বিশজন শ্রমিক কাজ করতো। ভাঙ্গনের কারণে তার জায়গা-জমি সব কিছুই এখন পদ্মার পেটে। এখন তিনি অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালান। অর্থের অভাবে ছেলে-মেয়েদের লেখা পড়া করাতে পারেন না।

কবি নেহাল মাহামুদ জানায়, বর্তমানে পদ্মা বেড়ি বাঁধের কাছে অবস্থান করছে। অথচ নদী ছিলো আরও অন্তত দশ কিলোমিটার দূরে। ওই দশ কিলোমিটারের মধ্যে ছিলো গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসা, মন্দিরসহ কয়েক হাজার পরিবারের বসবাস। 

প্রতি বছরে নদী ভাঙ্গনের কারনে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা সব কিছু হারিয়েছে। সম্প্রতি পদ্মা পৌরসভার ভেতরে প্রবেশ করেছে। স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা না হলে বেড়ি বাঁধ থাকবে না। সেই সঙ্গে রাজবাড়ী শহরও আস্তে আস্তে নদীতে হারিয়ে যাবে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, ১৯৮৫ সাল থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নদীতে বিলীন হয়েছে ৯ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমি। এর মধ্যে সদর উপজেলা থেকে গোয়ালন্দ উপজেলা পর্যন্ত ৮ হাজার হেক্টর, সদর থেকে থেকে কালুখালী ২৬০ হেক্টর ,কালুখালী থেকে পাংশা উপজেলায় ১ হাজার ৭শত হেক্টর জমি। ২০০৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী নদী ভাঙ্গন রোধে ৩টি প্রকল্পে ৫৫০ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ এসেছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের  নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ জানায়, "নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। নদীর পাড় যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় তার জন্য জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙ্গন রোধ করা হয়েছে। রাজবাড়ী জেলায় ৮৫ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে পদ্মা নদী। সব জায়গা তো নদীর তীর সংরক্ষন করা সম্ভব না বা প্রয়োজনও নাই। যেসব জায়গা অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ সে সব জায়গায় চিহ্নিত করে বড় একটা প্রকল্পের প্রস্তাব করছি। সেই প্রকল্পে পাংশা ও কালুখালী উপজেলায় ১১ কিলোমিটার, সদর উপজেলার চরসিলিমপুর থেকে মহাদেবপুর ৪ কিলোমিটার, গোয়ালন্দ উপজেলার অন্তর মোড় থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ ধরা আছে। 

 জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, গত দুই বছরে এই জেলায় নদী ভাঙ্গনের কারণে ৮৬০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে টিন, নগদ অর্থ সহায়তা করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম জানান, রাজবাড়ী জেলা প্রতি বছরই নদী ভাঙে। এ বছর সদর উপজেলার গোদার বাজার এলাকায় তিনটা পয়েন্টে ভাঙনের কারণে নদী শহর রক্ষা বাঁধের কাছে চলে এসেছে। এই তিনটা পয়েন্টে বিশেষজ্ঞ দ্বারা তদন্ত করে সেখানে যেন উপযুক্ত কার্যক্রম গ্রহন করা হয় তার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভাঙন রোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সুকান্ত/মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়