ঢাকা     সোমবার   ১৭ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৩ ১৪২৮ ||  ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

যে বিমানবন্দরে গরু-ছাগলও চরে!

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৭, ২ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৩:৪১, ২ ডিসেম্বর ২০২১

কক্সবাজার-ঢাকা আকাশ পথে দৈনিক ৪০টি ফ্লাইট চলাচল করছে। এ কারণে ঢাকার পর দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দর হচ্ছে কক্সবাজার। আর দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরের রানওয়েতে চলাচল করছে সাধারণ লোকজন। গরু-ছাগল চরানোর অনুমতি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। 

গত ৩০ নভেম্বর কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের সময় বিমান বাংলাদেশের একটি বিমানের ডানায় ধাক্কা লেগে রানওয়েতে থাকা দুটি গরু মারা যায়। তবে বেঁচে যান বিমানের ৯৪ আরোহী। এ দুর্ঘটনার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, টাকার বিনিময়ে নিরাপত্তা কর্মীরা সীমানা টপকে লোকজনের চলাচল, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে গরু-ছাগল চরানোর অনুমতি দেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকায় বিমানবন্দরের কাঁটা তারের বেড়া টপকে লোকজন চলাচল করছেন। সীমানার ভেতর ঘাস খেতে বিচরণ করছে অর্ধশতাধিক গরু-ছাগল। অপরপাশে চলছে বিমানবন্দর সংস্কারের কাজ। আর টহল দিচ্ছেন দুজন আনসার-এপিবিএন সদস্য।

বিমানবন্দর সীমানায় দায়িত্ব পালন নিয়ে এপিবিএন-আনসারদের মধ্যে ঝামেলা রয়েছে বলেও জানা গেছে। 

বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত উত্তর কুতুবদিয়াপাড়া-উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকার লোকজন চলাচল করতে সীমানার পাশে এসে ভিড় করেন বলে জানান শাহরিয়ার নামের এক আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্য। 

শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের ডিউটি ৬ ঘণ্টা। আর আনসারদের ডিউটি ৮ ঘণ্টা। ৬ ঘণ্টার পরে কোথায় কী ঘটছে না ঘটছে এগুলো আমাদের দেখার বিষয় না।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘অসুস্থ রোগী, ছোট বাচ্চা কোলে করে অনেক নারী বিমানবন্দরের মধ‌্য দিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এ পাশে  বিমানবন্দরের সংস্কার কাজও চলছে। তাই বিমান চলাচল না করলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। অনেক বছর ধরে লোকজন এভাবে যাওয়া আসা করে। কোনো সময় সমস্যা হয় না। তাই তাদের বাধা দেওয়া হয় না। উত্তর পাশ দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।’ তবে টাকার বিনিময়ে ঘাস বিক্রি ও বিমানবন্দরের মাঠে গরু-ছাগল ঢুকতে দেওয়ার ব্যাপারে কিছু জানেন না দাবি করেনে তিনি। 

মাঠের ভেতরে চরা গরুর মালিক হাজেরা বেগম বলেন, ‘আমার একটি গরু। বাড়ির আশেপাশে বিলে ঘাস না থাকায় বিমানবন্দরের ভেতর বেঁধে দিই। কখনো গরু ছেড়ে দিই না। বিমানবন্দরের ভেতরে হলেও খুঁটিতে সবসময় বাঁধা থাকে গরু। এখানে বেঁধে না দিলে গরুটি না খেয়ে মরে যাবে। তাই দায়িত্বে থাকা আনসার ও এপিবিএন এর লোকদের বলে এখানে বেঁধে দিই।’

একটু দূরে ৭/৮টি ছাগল ঘাস খাচ্ছে বিমানবন্দর সীমানার ভেতর। পাশে রয়েছে মালিক শাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের সবুজ ঘাসগুলো ছাগল বেশি খায়। তাই কাঁটা তারের বেড়া ফাঁকা পেয়ে ছাগল এখানে চরাতে নিয়ে এসেছি। কেউ বাধা দেয়নি। বাঁধা দিলে আসবো না।’ 

বিমানবন্দরের পশ্চিমে অবস্থিত উত্তর কুতুবদিয়াপাড়ার বাসিন্দা রোজিনা আক্তার বলেন, ‘ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে দূরের পথ দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করতে বেশি কষ্ট হয় বলে এয়ারপোর্টের পথ ব্যবহার করি।’

উত্তর নুনিয়ারছড়া বিমানবন্দর সীমানার অভ্যন্তরে গরু-ছাগল তাড়া করছেন নাইম নামের এক আনসার সদস্য। কাঁটা তারের বেড়া ছেদ করে গরু-ছাগলগুলো বিমানবন্দরের মাঠে ঢুকেছে এমনটাই বলেছেন তিনি। টাকার বিনিময়ে গরু-ছাগল ঢুকতে দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আনসার সদস‌্যরা এ ধরনের কাজ করে না।’

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘বিমানবন্দরে ১২৯ জন আনসার সদস্য ও ৩৪ জন এপিবিএন সদস্য নিয়োজিত। এর মধ্যে দুই জন এপিবিএন রানওয়েতে দায়িত্ব পালন করেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর আগে ছোট ছিলো। এখন দেশের সর্ববৃহৎ দীর্ঘতম রানওয়ের বিমানবন্দর করা হচ্ছে। ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট থেকে ৯ হাজার ফুট এবং আরও ১ হাজার ৭০০ ফুট উন্নীতকরণের মাধ্যমে এ রানওয়ে হবে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। সংস্কার কাজ চলাকালে কিছু কিছু মানুষ চলাচল ও গবাদিপশু ঢুকে যায়। নিরাপত্তাকর্মী কম হওয়ায় সবকিছু দেখতে পারেন না তারা। যদি নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো যায় তবে ভবিষ্যতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না।’

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পুলিশ সুপার নাইমুল হক বলেন, ‘বিমানবন্দরে কাঁটাতারের বেড়া অনেক জায়গায় ফাঁকা। ফলে অনায়সে মানুষ চলাচল ও গরু-ছাগল ঢুকতে পারে। পাশাপাশি সীমানার অনেক জায়গায় এখনো দেয়াল দেওয়া হয়নি। আমি শুনেছি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয়দের জায়গা নিয়ে ঝামেলা চলতেছে। যদি সীমানা দেয়াল ভালো করে দেওয়া হয় এবং নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানো হয় তবে এই রকম দুর্ঘটনা হবে না বলে মনে করছি।’

বিমানবন্দরের সংস্কার কাজের প্রকল্প কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউনুস ভূইয়া বলেন, ‘বিমানবন্দর উন্নীতকরণে প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। বিমানবন্দরের চারপাশেই কাজ চলছে। এজন্য চারপাশের দেয়াল পুরোপুরি দেওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। বিমানবন্দরের এক জায়গায় ২৫০ ফুট এবং আরেক জায়গায় ১৫০ ফুট খোলা রয়েছে। যার কারণে বিমানবন্দরের দু পাশের লোকজন চলাচল করতে পারেন এবং অনায়সে গরু-ছাগল ঢুকে রানওয়ের দিকে চলে আসে। যখন চারপাশের সীমানা বেষ্টনীর কাজ শেষ হবে তখন বাইরের কোনো কিছু বিমানবন্দর এলাকায় ঢুকতে পারবে না।’

আরও পড়ুন : বিমানের ধাক্কায় প্রাণ গেল ২ গরুর, বাঁচলেন ৯৪ আরোহী

রানওয়েতে বিমান-গরু সংঘর্ষ: ৪ আনসার প্রত্যাহার 

ঢাকা/ইভা  

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়