ঢাকা     শনিবার   ১৩ আগস্ট ২০২২ ||  শ্রাবণ ২৯ ১৪২৯ ||  ১৪ মহরম ১৪৪৪

অবৈধ চুল্লিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা, হুমকির মুখে সুন্দরবন

ইমরান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৩, ৮ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ০৯:৪৭, ৮ ডিসেম্বর ২০২১
অবৈধ চুল্লিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা, হুমকির মুখে সুন্দরবন

অবৈধভাবে সংগ্রহ করা সুন্দরবনের কাঠ

বলেশ্বর নদীর ওপাড়ে সুন্দরবন, এপাড়ে নদীর পাড়ের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বিশাল বণাঞ্চল। এই প্রাকৃতিক বনের জমি দখল করে অবৈধভাবে মাটির তৈরি চুল্লিতে সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনের কাঠ পুড়িয়ে কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে কয়লা তৈরি করছে এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য। 

দিনরাত এই কারখানার ধোঁয়ায় অনেকটাই হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা বনাঞ্চল। অনবরত জ্বলতে থাকা কাঠের ধোয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগছেন কাঠালতলী এলাকার বাসিন্দারা। কয়লা তৈরির এমন চুল্লি পরিদর্শন করে প্রাকৃতিক ও সামাজিক বন রক্ষা কমিটির নেতারা বলছেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন কয়লা তৈরির চুল্লি বছরের পর বছর চললেও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হুমকিতে পরবে সুন্দরবন।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ কাঠালতলী ইউনিয়নের বলেশ্বর নদীর পাড়ের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের মধ্যেই এই অবৈধ কাজটি করে যাচ্ছেন ওই এলাকার বর্তমান ইউপি সদস্য (৩ নম্বর ওয়ার্ডের) জাহাঙ্গীর হোসেন।

অবৈধ চুল্লিতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ

সোমবার (৮ ডিসেম্বর) দক্ষিণ কাঠালতলী এলাকার বলেশ্বর নদী পাড়ের প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের মধ্যের কয়লা তৈরির কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবনের অর্জুন, করমজা আকাশমনিসহ সামাজিক বনাঞ্চলের অন্তত ৫ প্রজাতির গাছের কাঠ ৮টি মাটির তৈরি চুল্লিতে পুড়িয়ে  তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। কারখানার আশপাশে বিশাল আকৃতির কাঠ স্তূপ করে রাখা আছে। ৮টি চুল্লিতে ৮ শ্রমিক কাঠ পোড়ানোর কাজ করছেন। চুল্লির ধোঁয়ায় পুরো বনসহ আশপাশের এলাকা কখনো কালো আবার কখনো সাদা ধোঁয়ায় ভরে আছে। ধোঁয়ার কারণে চোখ খুলতেও কষ্ট হয়। গাছের সবুজ পাতা বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।

সাংবাদিকদের ‍উপস্থিতি টের পেয়েই সটকে পরেন ৬ শ্রমিক। পালাতে না পারা শ্রমিক সিরাজ মিয়া (৬৮) রাইজিংবিডিকে জানান, এই চুল্লির মালিক স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন। প্রশাসন-সাংবাদিকদের ম্যানেজ করে তিন বছর ধরে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা করছেন তারা। কেউ কখনো বাঁধা দেয়নি তাদের।

আরেক শ্রমিক শহিদুল ইসলাম (৫০) রাইজিংবিডিকে জানান, দিন-রাত কাঠ থেকে কয়লা পুড়িয়ে ৮০০ টাকা মজুরি পান তারা। কিছু কাঠ ব্যবসায়ীর সঙ্গে তারা চুক্তি করে নিয়েছেন। তারা গ্রাম অঞ্চল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করেন।

কথা প্রসঙ্গে ওই শ্রমিক আরও জানান, এখানে প্রায়ই সাংবাদিকরা এসে মালিকের থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। আপনারাও মালিককে ফোন করুন আপনাদেরও ম্যানেজ করে ফেলবে।
তবে, সংরক্ষিত বনের করমজা, আকাশমনি অর্জুন গাছের কাঠ কোথা থেকে সংগ্রহ করেন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেয়নি তিনি।

ওই এলাকার বাসিন্দা মো. নাসিম রাইজিংবিডিকে জানান, দিনরাত এসব চুলা থেকে নির্গত ধোঁয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে এসব এলাকার শিশু, বৃদ্ধ, গবাদি পশু-পাখিসহ ফসলও নানা রোগে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে সামাজিক বনায়ন ও সংরক্ষিত বন। কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আর স্থানীয়ভাবে তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেও তার বিপদ।

এ বিষয়ে চুল্লির মালিক ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন দাবি করে বলেন, ‘আপনারা বরগুনা চলে যান, আমি বৃহস্পতিবার আপনাদের সঙ্গে দেখা করবো।’

টানা তিন বছর কিভাবে তিনি এমন অবৈধ কাজ একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে করে যাচ্ছেন এবং পরিবেশের ক্ষতি করছেন জানতে চাইলে, রোববার দেখা করার কথা বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

প্রাকৃতিক ও সামাজিক বনায়ন রক্ষা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ রফিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রাইজিংবিডিকে বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকলসহ বন ও পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো কারখানা গড়ে তোলার সুযোগ নেই। সেখানে সুন্দরবনের কাছেই এই কয়লা পোড়ানো চুলা। উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারলো না। প্রকাশ্যে সবুজ বন ধ্বংস করা হচ্ছে, অক্সিজেনের সঙ্গে বিষ ঢেলে দিচ্ছে অথচ সবাই চুপচাপ। এমন করে কাঠ পুড়তে থাকলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। সুন্দরবনের কয়েক প্রজাতির কাঠ এখানে পুড়ছে। অবশ্যই এসব কাঠ সুন্দরবন থেকে চুরি করেছে। আমরা অচিরেই এটা নিয়ে আন্দোলনে যাব। যে কোনো উপায়ে এসব অবৈধ চুল্লি বন্ধ করতে হবে।

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মুহাম্মদ আল-মুজাহিদ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এমন কোনো চুল্লির বিষয় আমার জানা ছিলো না। আমি শিগগিরই অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনবো।’

বরগুনা/বুলাকী

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়