ঢাকা     শুক্রবার   ২১ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৭ ১৪২৮ ||  ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঐতিহাসিক স্বাক্ষী কপিলমুনি 

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০০, ৯ ডিসেম্বর ২০২১  
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঐতিহাসিক স্বাক্ষী কপিলমুনি 

বিনোদ বিহারী সাধুর এই বাড়িটি ছিল রাজাকারদের ঘাঁটি

৪ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্ত হয় খুলনার কপিলমুনি। পরে সহচরী বিদ্যা মন্দিরের মাঠে জনতার দাবির মুখে দেড় শতাধিক যুদ্ধাপরাধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এর মধ্য দিয়েই পতন হয় দক্ষিণ খুলনার অন্যতম প্রধান রাজাকার ঘাঁটির। 

দিনটি ছিল ৯ ডিসেম্বর। যেটি ঐতিহাসিক কপিলমুনির হানাদার মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। 

যুদ্ধকালীণ সময়ে (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, খুলনার চুকনগরে অল্প সময়ে অধিক মানুষকে হত্যা করার ঘটনা ঘটে। এরপর কপিলমুনিতেও ঘটে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের ঘটনা। সর্বশেষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর করার ঐতিহাসিক ঘটনাটিও ঘটে এই কপিলমুনিতেই। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সম্ভবত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার ঘটনা এটাই একক উদাহরণ।

৭১-এ কপিলমুনি ছিল রাজাকারদের দখলে

মুক্তিযুদ্ধের সময় কপিলমুনির রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর সুরম্য বাড়িটিকে দখল করে রাজাকাররা। সেখানে তারা শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করে। খুলনাঞ্চলের মধ্যে এই রাজাকার ঘাঁটিটি ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। কয়েক শ’ রাজাকার এখান থেকেই আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই ঘাঁটিটি দখলে মুক্তিযোদ্ধারা একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু ঘাঁটিটির অবস্থানগত সুবিধা, রাজাকারদের কাছে থাকা অস্ত্র ও সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকায় অভিযানগুলো সফল হয়নি। প্রতিবারের যুদ্ধেই রাজাকাররা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। 

ঘাঁটিতে নিয়মিত ২০০ বেশি রাজাকার সশস্ত্র অবস্থান করতো। কপিলমুনি অঞ্চলে রাজাকারদের তান্ডবের খবর প্রচার হলে মুক্তিযোদ্ধারা এই রাজাকার ঘাঁটিটি দখল করার উদ্যোগ নেন। ডিসেম্বরের আগে কপিলমুনির এই রাজাকার ঘাঁটিতে অন্তত দু’বার আক্রমণের ঘটনা ঘটে।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ কামরুজ্জামান টুকু বলেন, ‘১১ জুলাই আক্রমণে নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট আরেফিন। এই যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন লতিফ, সরদার ফারুক আহমেদ, মনোরঞ্জন, রহমত আলী, মাহাতাব, দীদার, আবদুর রহিম, আনোয়ারুজ্জামান বাবলু ও জাহান আলী। তাঁরা তালা উপজেলার জালালপুর থেকে গভীর রাতে রওনা দিয়ে শেষ রাতে কপিলমুনি এসে পৌঁছান।

মুক্তিযোদ্ধারা বাজারের দক্ষিণ দিক থেকে রাজাকার ঘাঁটিতে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। কপিলমুনিতে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় আক্রমণ শুরুর কিছু পরেই ভোর হয়ে যায়। দিনের আলোয় অল্প মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এত বড় ঘাঁটি দখল সম্ভব হবে না বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধারা তালার জালালপুরে ফিরে যান।

এদিকে সুযোগ বুঝে রাজাকাররা শক্তি বৃদ্ধি করে জালালপুরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং বেশ কিছু অস্ত্র হাতছাড়া হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তখন ঘাঁটি ছেড়ে আরো পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন। এবার আরো সতর্কতার সাথে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা শুরু করে রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণে। অনেক বেশী সময় নিয়ে তাঁরা রীতিমত এই যুদ্ধের ছক তৈরি করে এগুতে থাকেন। 

যুদ্ধের পরিকল্পনা

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এই রাজাকার ঘাঁটি ধ্বংস করার জন্য তালা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের প্রধান ইউনুস আলী ইনু ঘাঁটিটি দখল করার শপথ করেছিলেন। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে রাজাকার ক্যাম্পটি সহযোদ্ধাদের নিয়ে রেকি করেন ইউনুস আলী। এই রেকি করার একদিন পর তালা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে। আক্রমণকারীরা মুক্তিযোদ্ধা ইনুকে না পাওয়ায় সেদিন মাগুরা গ্রামের ৩৫ জনকে হত্যা করে।

এতে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করেন। এতে অংশ নেন ইউনুস আলী ইনু, স ম বাবর আলী, গাজী রহমতউল্লাহ, লেফটেন্যান্ট সামসুল আরেফিনসহ প্রমুখ।

৪ ডিসেম্বর রাত ৩টায় রাজাকার ক্যাম্পের তিনদিক থেকে একসঙ্গে আক্রমণ করা হবে। মাদ্রা গ্রাম থেকে কপিলমুনির উত্তর ও পূর্ব অংশে আক্রমণ করার দায়িত্ব ছিল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইনুর ওপর। দক্ষিণ এবং পশ্চিম অংশে আক্রমণ করার দায়িত্ব পড়ে স.ম বাবর আলী, রহমতউল্লাহ দাদু এবং লেফটেন্যান্ট আরেফিনের ওপর।

মুক্তিযোদ্ধারা শপথ নিয়েছিলেন রাজাকার ঘাঁটির পতন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। মুক্তিযোদ্ধা স.ম বাবর আলী ও আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বাধীন ৫০ জনের মুক্তিসেনার দলটি নাসিরপুর ব্রিজ পার হয়ে কপিলমুনি বালিকা বিদ্যালয়ে অবস্থান নেন। 

রহমতউল্লাহ ও ওমর ফারুক তাঁদের বিস্ফোরক দল নিয়ে রাজাকার শিবিরের দু’ পাশে পৌঁছান। আবু ওবায়দার দলটি আরসিএল নিয়ে কানাইদিয়ার পাড় থেকে ক্যাম্পে আক্রমণ করার জন্য তৈরি হন। ইঞ্জিনিয়ার মুজিবরের নেতৃত্বে একদল অবস্থান নেন আরসনগর। সেখানকার কালভার্ট উড়িয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাঁদের।

নৌ-কমান্ডো বজলুর রহমান ও হুমায়ুনের নেতৃত্বে একটি দল রাজাকার ক্যাম্পের পাঁচিল ও মূল ঘাঁটিতে বিস্ফোরক লাগানোর দায়িত্বে ছিলেন। মোড়ল আবদুস সালামের নেতৃত্বে রশীদ, মকবুল হোসেন, সামাদ মাস্টার, জিল্লুর রহমানসহ ২০ জনের একটি দল রাজাকার ঘাঁটির ২৫-৩০ গজ দূরে অবস্থান নেয়; যাতে তাঁরা রাজাকার ঘাঁটির বাঙ্কারে গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে পারেন। 

এছাড়া আজিজুল হকের নেতৃত্বে ১০ জনের অপর একটি দল একটু দূরের পাইকগাছার শিববাটি নদীর মোহনায় অবস্থান করতে থাকেন। ভাসমান মাইন নিয়ে তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন যাতে নৌপথে রাজাকারদের সহায়তায় কোনো গানবোট আসার চেষ্টা করলে সেগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায়।

শুরু হয় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ 

৪ ডিসেম্বর রাতে সবাই নির্দিষ্ট পজিশনে চলে যান, শুরু হয় আক্রমণ। রাজাকাররাও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। রাত শেষ হয়ে ভোর হয়, নতুন দিনের সূচনা হয়। কিন্তু যুদ্ধ থেমে থাকে না। দু’ পক্ষের মধ্যেই গোলাগুলি চলতে থাকে। সূর্যের আলোর তেজের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণও বাড়তে থাকে। রাজাকাররা তিন দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়লেও প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। 

ওই রাতে মুক্তিযোদ্ধারা আরসিএলের সাহায্যে রাজাকার ক্যাম্পের ছাদের বাঙ্কার উড়িয়ে দেন। পাঁচিলের অংশবিশেষও ধ্বংস হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এবার রাজাকারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে রাজাকাররা আলোচনার প্রস্তাব দেয়। 

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা কেউই তাদের এই প্রস্তাবে আস্থা রাখতে পারেননি। এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ওমর ফারুককে রাজাকারদের সঙ্গে কথা বলতে পাঠান। এ সময় রাজাকাররা তাদের নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দাবি করায় আলোচনা ভেঙ্গে যায়। 

শুরু হয় আবারও তুমুল লড়াই। এক সময় রাজাকাররা আত্মসমর্পন করলে ৯ ডিসেম্বর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। 

মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আলী ইনুর মতে, ধৃত রাজাকারদের সংখ্যা ছিল ১৭৭। 

জনতার আদালতে রাজাকারদের বিচার

জনতার চাপের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেপ্তারকৃত রাজাকারদের বিচার কপিলমুনিতেই করার সিদ্ধান্ত নেন। আদালত বসিয়ে রাজাকারদের বিচার করা হবে। প্রত্যেক রাজাকারের বিরুদ্ধে আলাদা ভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ চাওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলেই শুধু সেই রাজাকারকে দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হবে। 

আট মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। তাঁরা হলেন, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, ইউনুস আলী ইনু, স ম বাবর আলী, গাজী রহমতউল্লাহ, স ম আলাউদ্দিন, মোড়ল আব্দুস সালাম, আবুল কালাম আজাদ ও শেখ আব্দুল কাইয়ুম। 

জনগণ প্রত্যেক রাজাকারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ। জনতা সাক্ষ্য-প্রমাণও হাজির করেন। 

এক পযায়ে সেখানে জড়ো হওয়া ২০ থেকে ৩০ হাজারের মতো মানুষ যে যেভাবে পেরেছিল রাজাকারদের ওপর হামলে পড়েন এবং অনেক রাজাকারের  মৃত্যু নিশ্চিত করে।

মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুল কাইয়ুমের মতে, মানুষের সব রোষ রাজাকারদের সাজা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়। রাজাকারদের ১৫৬ জনকে দড়ি দিয়ে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। মতান্তরে ১৫১ জন।

এছাড়া জনগণের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত রাজাকারদের মধ্যে সাধারণ জনতা বেছে বেছে ১১ রাজাকারকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে। এই ১১ রাজাকার অতিনির্মম অত্যাচারী ছিল। জনতা এদেরকে গুলি করে হত্যা করার পরিবর্তে কষ্ট দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার দাবি তোলে এবং এক পর্যায়ে নিজেরাই এদের ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনিতে মৃত্যু নিশ্চিত করে। 

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স  

গত বছর ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি মুক্ত দিবসের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক। তিনি কপিলমুনিতে সরকারি জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডার হলেও নির্ধারিত জায়গাটি নিজেদের দাবি করে তা দখলে নিয়ে সেখানে পাকা ইমারত নির্মাণের কাজ করছে একটি পক্ষ। 

এ ব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, নির্ধারিত স্থানেই মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ হবে। তবে কিছু অংশ ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ায় সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। অচিরেই সব সমস্যার সমাধান হবে বলেও মনে করেন তিনি।

নূরুজ্জামান/ মাসুদ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়