ঢাকা     শনিবার   ২১ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪২৯ ||  ১৮ শাওয়াল ১৪৪৩

‘৩ কালিমা পড়ে পাকবাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম’

এইচ মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:২৬, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১  
‘৩ কালিমা পড়ে পাকবাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম’

মুক্তিযোদ্ধা প্রীতিরঞ্জন সাহা

প্রীতি রঞ্জন সাহা। ’৭১-এ রণাঙ্গণের বীর যোদ্ধা। পাকবাহিনীকে হটাতে বাংলার এ দামাল ছেলে দেশপ্রেম আর অসীম সাহসিকতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে। দেশ মাতৃকার ডাকে সারা দিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে অংশ নিয়েছেন বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে। 

সেসব যুদ্ধের স্মৃতি তিনি রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য বর্ণনা করেছেন। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিগঞ্জ ইউনিয়নের রহিমাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এ বীর মুক্তিযোদ্ধা।

তিনি দুই ছেলে এক মেয়ের জনক। তার সহধর্মীনি সরকারী আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের একজন শিক্ষিকা। একমাত্র মেয়ে সহপরিবারে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন। তাছাড়াও তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্তসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

প্রীতিরঞ্জন সাহা বলেন, ‘‘১৯৬৯ সালে আমি তখন সাধারচর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেখানে এক বছর শিক্ষকতার পর ১৯৭০ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে ঢাকা এস এ মজুমদার নামে এক ইনকাম ট্রেক্সের আইনজীবীর সহকারী হিসেবে যোগ দিই। ঢাকার টিকাতলীতে একটি বাসা নিয়ে থাকি। ২৩ মার্চ তখন আমাদের গ্রামে থিয়েটার হয়। আমি থিয়েটার দেখার জন্য ঢাকা থেকে রায়পুরার রহিমারবাদ আমার গ্রামের বাড়ি আসি। ২৫ মার্চ ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় জ্বালাও পোড়াও। আমি বাড়িতে আটকা পড়ি। 

‘মে মাসে প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক রনেশ দাস গুপ্ত, কৃষক নেতা জিতেন ঘোষ, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক জ্ঞান চক্রবর্তীসহ কয়েক ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে হেঁটে আমাদের গ্রামের ওপর দিয়ে ভারত যাচ্ছেন। পথে রাত হওয়ায় আমাদের বাড়িতে ওই রাতে অবস্থান করেন তারা। তখন জ্ঞান চক্রবর্তী আমাকে বলেন, দেশের অবস্থা যে হয়েছে, তোমাদের এখন আর বসে থাকা ঠিক হবে না। যদি দেরি কর তাহলে ভারতে যাওয়ার সুযোগও পাবা না। 

‘আমি তার কথা শুনে ২৭ মার্চ টিকাতলীর বাসা থেকে আমার সার্টিফিকেটগুলো আনার জন্য বাড়ি থেকে একটি লুঙ্গি, পাঞ্জাবি ও টুপি পরে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম। নরসিংদী এসে মোমেন কোম্পানির বাসে উঠে তারাব গিয়ে নামি। সেখান থেকে নদী পার হয়ে হেঁটে টিকাতলী আমার বাসায় পৌঁছাই। তখন আমার বন্ধু খাদ্য পরির্দশক লিহাজ উদ্দিন ভূইয়া আমাকে দেখে চমকে ওঠে। সে আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। 

‘তখন সে আমাকে একটি কাগজে পাঁচটি কালেমা লিখে সেগুলো মুখস্ত করে ঢাকা থেকে রওনা দিতে বলে। আমি কালেমাগুলো মুখস্ত করে ফেলি। তারাব এসে মোমেন কোম্পানির বাসে উঠলাম। কিছুদূর যাওয়ার দেখি রাস্তায় পাকবাহিনীরা এলএমজি তাক করে প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে। বাসে তখন ১৭ জন যাত্রী। সবাই নরসিংদী যাবে। পাকবাহিনীরা বাসটিকে থামাতে বলে।

‘একজন পাক অফিসার হুকুম দেয়- হিন্দু দাঁড়াও, মুসলিম থেরযাও। বাসের সবাই তখন ভয়ে একটি লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। আমি তখন ভয়ে কাঁপতে থাকি। মনে মনে ভগবানকে ডাকতে থাকি। ভাবতে থাকি আমার পকেটে ইংরেজিতে খেলা সার্টিফিকেট রয়েছে। সেগুলো দেখেই চিনে ফেলবে যে আমি হিন্দু। এরমধ্যে একজন আমার মাথায় টুপি দেখে বলে, তুম মুসলমান- কালিমা পাড়। আমি তখন তিনটি কালিমা পড়ি। তখন অফিসার পিঠে ধাক্কা দিয়ে বলে ঠিকহ্যায় তুম পাক্কা মুসলিমহে, থেরযাও।

‘আবার বাসে উঠলাম। তবে বাসের লোক জানিয়ে দেয় তারা আর নরসিংদীতে যাবে না। পরে হেঁটে হেঁটে নরসিংদী পৌঁছাই। নরসিংদীর পুরানপাড়া গিয়ে দেখি নদী পার হওয়ার নৌকা নেই। পরে লুঙ্গি ও সার্টিফিকেট মাথায় বেঁধে সাঁতারকেটে নদী পার হই। সামনে বাদুয়াচর গিয়ে দেখি একই অবস্থা। পরে আড়িয়াল খাঁ নদী সাতাঁরকেটে পার হয়ে রাত ১২টায় বাড়ি পৌঁছি। বাড়ি গিয়ে দেখি আমার বাবা-মা ও স্বজনেরা আমার জন্য চরম উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছেন।
‘আমি একজন হিন্দু পরিবারের সন্তান হয়েও তিন কালিমা পড়ে সেদিন পাকবাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম। পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। আমার সামনে পাকবাহিনী অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করেছে। যে স্মৃতি মনে হলে আজও সিউরে উঠি।”

প্রীতিরঞ্জন সাহা বলেন, “১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। ২৩মে তৎকালীন পাকিস্তানি শোষণের নানা প্রতিবাদ করেছি। তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে নরসিংদীতে ইপিআর, আনসার ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা তাদের স্বাগত জানায়। 

‘তখন তারা নরসিংদী জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলে শত শত যুবককে প্রশিক্ষণ দেয়। নরসিংদীর স্বপন সাহার মাধ্যমে কান্দাপাড়ার পুকুর পাড় থেকে রাইফেল নিয়ে সেনাসদস্য জালাল উদ্দিন ভূইয়ার নেতৃত্বে এলাকার ১০/১২ জন যুবকসহ প্রশিক্ষণে অংশ নেই। তখন দেশের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। 

‘৫ জুন নৌকায় করে আমরা ভারতের উদ্দ্যেশে রওনা হলাম। বক্সনগর এলাকায় দেখা পাই তাজ উদ্দিন সাহেব এবং জোহরা তাজ উদ্দিনের সঙ্গে। তারাও ভারত যাচ্ছেন। ভারতে গিয়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠি। সেখান থেকে অক্সফার্ম নামে একটি সেবা সংস্থায় যোগ দিলাম। অক্সফার্মের দায়িত্ব ছিল শরনার্থী ক্যাম্পগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার। 

‘এর মধ্যে খবর পেলাম আগতলা জিবি হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওখানে গিয়ে লাল ব্যানারে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত দিয়ে সাহায্য করুন’এই লেখা দেখতে পেলাম। আমিসহ সঙ্গে থাকা সবাই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পড়ি। দেশ মাতৃকার জন‌্য যারা যুদ্ধ করছেন তাদের বাঁচানোর জন‌্য সেদিন রক্ত দিলাম।

‘একদিন জানতে পারি শরনার্থী স্কুলে শিক্ষক পদে লোক নিয়োগ দেবে। আমি ইন্টারভিউতে অংশ নেই। তখন বিজয় বাবু নামে যে ব্যক্তি আমার ইন্টারভিউ নিলেন তিনি বলেন, আপনার মতো যুবকরা শিক্ষকতায় চলে এলে দেশটা স্বাধীন করবে কে? তার কথা শুনে আগরতলা ক্যাম্প হোস্টেলে চলে যাই। ওই হোস্টেলের নেতৃত্ব ছিলেন পংকজ ভট্টাচার্য। আগস্ট মাসে ১০/১২দিন সেখানে থাকার পর মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে আমাকেসহ প্রায় ৫০ জনকে ত্রিপুরার চড়িলাম প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হলো। 

‘সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে নভেম্বর মাসে আমার নেতৃত্বে ২৯ জনের একটি দল রায়পুরা উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধের জন্য পাঠানো হলো। পথে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় মুকন্দপুরে পাকবাহিনীর সঙ্গে সামনা সামনি যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে আমার সহকর্মী মোহাম্মদ আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রায়পুরা আসি। 

‘পরে আমাদের দলটি নরসিংদীতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও পাকবাহিনীর ওপর চোরাগুপ্তা হামলা শুরু করে। স্থল পথে মুক্তিবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৭১ সালে ৪ এপ্রিল পাকবাহিনীর বোমারু বিমান নরসিংদী শহরে বোমাবর্ষণ শুরু করে। তখন গোটা শহরে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। বোমা বর্ষণে শহীদ হন আব্দুল হক ও নারায়ণ চন্দ্র সাহাসহ আরও ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। ২৩ মে তৎকালীন মুসলীম লীগ নেতা মিয়া আব্দুল মজিদ মুক্তি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। এর পরেই পাকবাহিনী নরসিংদী টেলিফোন ভবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। স্থানীয় টাউট, দালাল, রাজাকারদের যোগসাজসে হানাদার বাহিনীরা প্রতিদিন চালায় ধর্ষণ, নরহত্যা, লুটতরাজ। তখন আমরা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিই এবং শত্রু শিবিরে আঘাত হানি।

‘নরসিংদী সদর উপজেলায় নেভাল সিরাজের নেতৃত্বে হানাদার প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তোলা হয়। ওই স্থান থেকে সমস্ত জেলায় মুক্তিযোদ্ধারা নিরলসভাবে তৎপরতা অব্যাহত রাখে। মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা ছিল ২নং সেক্টরের অধীনে, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ। নরসিংদীকে পরে ৩নং সেক্টরের অধীনে নেওয়া হলে কামান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন মো. নূরুজ্জামান। আমি সে সেক্টরের অধীনেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।”

দেশের স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বিএডিসিতে হিসাব রক্ষক পদে চাকরি নেন এই মুক্তিযোদ্ধা। পদায়ন হয় চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় তখন তিনি সেই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন।

নরসিংদী/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়