ঢাকা     বুধবার   ২৫ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৯ ||  ২৩ শাওয়াল ১৪৪৩

কাজে আসছে না কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার 

মঈনুদ্দীন তালুকদার হিমেল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৯, ১৭ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১০:৫১, ১৭ জানুয়ারি ২০২২
কাজে আসছে না কোটি টাকার বর্জ্য শোধনাগার 

ঠাকুরগাঁও চিনিকলের তরল বর্জ্য পদার্থ শোধন করার লক্ষ্যে ইটিপি প্লান্ট নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য করপোরেশন(বিএসএফআইসি)।
 
কিন্তু চিনিকলে চলতি মৌসুমের আখ মাড়াই চললেও পরিবেশ দূষণ রক্ষায় কোন কাজে আসছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি)। শোধনাগারটি মাসের পর মাস ধরে অকেজো পড়ে আছে।

অথচ নবনির্মিত বর্জ্য শোধনাগারের পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে চিনিকল থেকে নির্গত দূর্গন্ধ যুক্ত তরল বর্জ্য পদার্থ। যা নদী নালা খাল বিলে গিয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, পরিবেশে দূষণ করছে। এতে নানারকম দুর্ভোগসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এমন মন্তব্য স্থানীয়দের।

চিনি কলের বর্জ্য শোধনাগারটিতে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টাঙ্গানো সাইনবোর্ড। সেখানকার তথ্যমতে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের ১৪টি চিনিকলে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) প্রকল্প ২০২০ সালের ৩০ জুন বাস্তবায়ন হয়েছে।  আর এ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৫১০.৩১ লক্ষ টাকা। গড় হিসেবে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের বর্জ্য শোধনাগারটি নির্মাণ কাজে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৭ লক্ষ ৮ হাজার টাকা। 

দেখা যায়, বর্জ্য শোধনাগারটিতে কিছু পানি জমে আছে। সে জমানো পানির রঙ পরিবর্তন হয়েছে এবং সেখানে স্কুল বাচ্চাদের ব্যবহৃত নানা পানীয়র বোতল ও ময়লা আবর্জনা ভেসে আছে।

কথা হয় ঠাকুরগাঁও শুক নদীর পাড়ের স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব আল হাসান বাদলের সঙ্গে। তিনি  বলেন, চিনিকলের সমস্ত তরল বর্জ্য নদীতে এসে মিশছে। এতে করে নদীর পানি দুর্গন্ধ হচ্ছে। পরিবেশ এতটাই দূষিত হচ্ছে যে, নদীর  আশেপাশে থাকা যাচ্ছেনা। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এমন পরিবেশ পুরোপুরিভাবে অনিরাপদ। 

স্থানীয় জেলে খাজির উদ্দীন মিয়া বলেন, সুগারমিলের দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি যখন আসে তখন পানিতে নেমে মাছ শিকার করা যায়না। শরীর চুলকায়। এতে করে চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি আমরা। জীবিকার তাগিদে তবুও জেনে বুঝেই পানিতে নামতে হচ্ছে। 

কৃষক চৈতু মোহম্মদ বলেন, নদী সংলগ্ন কৃষি জমিতে আমি কৃষি পণ্য উৎপাদন করি। চিনিকলের তরল বর্জ্যে আমাদের কৃষিকাজ ও উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। এ বিষাক্ত পানির কারণে আমাদের ফসল হচ্ছেনা।

কাপড় ব্যবসায়ী খাদেমুল ইসলাম বলেন, ঢিলেঢালাভাবে জেলার একমাত্র এই ভারি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা হচ্ছে। তা না হলে এত দূর্ভোগ সৃষ্টি হতোনা।  চিনিকলের ছাই ও দুর্গন্ধ যুক্ত তরল বর্জ্য পদার্থ নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। এতটাকা খরচ করে সরকারের বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করেও কোন লাভ হয়নি। আমি বুঝতে পারছিনা বর্জ্য শোধনাগারটি নির্মাণ হওয়ার পরেও কেন চালু হয়নি?

ঠাকুরগাঁও সুগারমিল স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাসেল মাহমুদ বলেন, স্কুলের দক্ষিণের দুটি রাস্তা দিয়ে আমরা প্রতিদিন শত শত ছাত্র ছাত্রী যাতায়াত করি। এপাশে স্কুলে যাওয়ার দুটি রাস্তা। পশ্চিমের রাস্তার পাশে বর্জ্য শোধনাগারটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেটি চালু না হওয়ায় ওদিক থেকে ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি পূর্বের দিকে আসে। দুই দিক দিয়েই আমাদের নাক চেপে ধরে স্কুলে যেতে হয়।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা মামুনুর রশিদ বলেন, প্রতিবছর ঠাকুরগাঁও চিনিকল থেকে ৮-১০ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য নির্গত হয়। বর্জ্য শোধনাগারটি চালু না হওয়ায় যে শুধু পরিবেশ দূষণ হচ্ছে তা নয়। এটি এখন পুরোটাই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ শোধনাগারটি এখন দর্শনীয় স্থানে রুপ নিয়েছে। স্কুলের প্রাথমিকের ছেলে-মেয়েরা এখানে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঘুরাফেরা করছে ও দৌড়ঝাপ করছে। যে কোন সময় পা পিছলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবেশ দূষণ রক্ষায় এটা চালু হওয়াটা যেমন জরুরি। তেমনই জরুরি এখানে নিরাপত্তা দেওয়া। কারণ শোধনাগারটি একদম উন্মুক্ত। চারপাশে কোন প্রাচীর নেই। 

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ইঞ্জিনিয়ার কামরুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার কারণে বর্জ্য শোধনাগারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। আমরা বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে ইলেক্ট্রিক তারসহ আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র ক্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে টাকা চেয়েছি।

ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজটি করা হয়েছে। এটি এখনো চিনিকলের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করা হয়নি। তবে শিশুদের  নিরাপত্তার জন্য আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

ঠাকুরগাঁও/টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়