ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৪ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৯ ||  ২২ শাওয়াল ১৪৪৩

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে স্থান সংকট, ভোগান্তিতে আড়তদার-পাইকাররা 

ইমরান হোসেন, বরগুনা  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০০, ২৬ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৩:০৩, ২৬ জানুয়ারি ২০২২
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে স্থান সংকট, ভোগান্তিতে আড়তদার-পাইকাররা 

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটার ‘বিএফডিসি’ ঘাটে স্থান সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন আড়তদার-পাইকাররা। কেউ কেউ তীব্র শীতে কুয়াশায় ভিজে আবার কেউ রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে মাছ কেনা-বেচা ও প্যাকেজিং করছেন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দীর্ঘদিন এমন ভোগান্তিতে ব্যবসা করে সরকারকে রাজস্ব দিলেও স্থান সংকট দূর করতে কোনো পদক্ষেপ নেয় না কর্তৃপক্ষ। 

জেলেরা বলছেন, প্রতিদিনই বাড়ছে ট্রলার, বাড়ছে জেলের সংখ্যাও। মাছভর্তি ট্রলার ঘাটে ভিরতে ও আনলোড করতে তাদেরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে এক থেকে দুইদিন। কখনো পচে যাচ্ছে মাছ, আবার পচার হাত থেকে রক্ষা করতে কিনতে হচ্ছে বাড়তি বরফ।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য মতে, উপকূলীয় জেলেদের মাছ বিক্রি সহজ করতে ১৯৮১ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশের দ্বিতীয় এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করে তৎকালীন সরকার। উপকূলীয় এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এখন আড়তদার রয়েছেন ২৬৭ জন। পাইকারের সংখ্যাও প্রায় ২ শতাধিক।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের ভবনে আড়তদার রয়েছেন ৩৭ জন। সামনের দুটি টলঘরে মাছ কেনা-বেচা করছেন আরও ১২ জন পাইকার। বাকি অন্তত ৪ শতাধিক আড়তদার-পাইকার মাছ কেনা-বেচা ও প্যাকেজিং করছেন খোলা আকাশের নিচে।

আড়তদার সাইফুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘১৯৮২ সাল থেকে এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ মাছের ব্যবসা করি। আড়তদারদের থেকে ইলিশ মাছ কিনে ঢাকা, রাজশাহী, কুমিল্লা, রংপুরে পাঠাই। ব্যবসার শুরুতে পাইকার-আড়তদার কম থাকায় কেন্দ্রের ভবনে একটু জায়গা পেতাম। দিনের পর দিন ব্যবসার পরিধি বেড়ে যায়, বেড়ে যায় ব্যবসায়ীর সংখ্যাও। যখন আমার আরও বেশি জায়গা দরকার, তখন ঘাট কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে দাবি করে আমাকে আরও জায়গা কমিয়ে নিতে বলে। পরে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ভবনের বাইরে জায়গা নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই মাছ কেনা-বেচা করছি।’

বাইরের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, বৃষ্টির মৌসুমে ভিজে আর শীতের সকালে খোলা আকাশের নিচে কুয়াশায় ভিজে মাছ কেনা-বেচা করছি। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ শুধু রাজস্বের টাকাটাই নিয়ে যান, আমাদের ভোগান্তি দূর করতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইলিশ-চিংড়িসহ বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেদের শিকার করা মাছ কিনে বিক্রি করি আমরা।

আড়তদার সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজস্ব নিতে তারা ভুল করে না। কিন্তু একাধিকবার লিখিতভাবে অবতরণ কেন্দ্রের কর্তাদের কাছে স্থান নির্ধারণ ও ভবন তৈরি করে দিতে আবেদন করলেও কর্মকর্তার পর কর্মকর্তার বদলী হয়ে যায়, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।’

পাইকারি ব্যবসায়ী সুলতান ফরাজী বলেন, ‘আড়তদারদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে দেশের অন্তত ৪০টি জেলায় মাছ বিক্রি করি। স্থান সংকটের কারণে মাছ কিনে মাপতে, বরফ দিয়ে আবার প্যাকেট করতে প্রচুর জায়গার দরকার হয়। এরপর সেসব মাছ ট্রাকে উঠাতেও প্রচুর স্থান দরকার। কিন্তু স্থান সংকটে এখন চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। তাই ভবন দিতে দেরি হলেও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি দূর করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে ১০টি টলঘর নির্মাণ করে দিলে উপকৃত হবে ব্যবসায়ীরা।’

বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধূরী বলেন, ‘নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট, ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন জেলার জেলেরা মাছ শিকার করে বিক্রি করতে আসেন এই ঘাটে। আগের তুলনায় দিন দিন ট্রলারের সংখ্যা বেড়েছে ৫ গুণ বেশি। সপ্তাহে গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মাছ বোঝাই ট্রলার আসে এখানে। একটি ট্রলার থেকে মাছ নামাতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগে। একই সাথে ১৪-১৬টি ট্রলার ঘাটের পন্টুনে অবতরণ করে। যখন সাগরে মাছ বেশি হয়, তখন ঘাটে আনলোড করতে আসা মাছ বোঝাই ট্রলারগুলো এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এ কারণে অনেক মাছ ট্রলারেই পচে যায়। ’

‘আবার অনেক ট্রলারে নতুন করে বরফ কিনে মাছ পচার হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এতে খরচ হয় বেশি। যে কারণে মাত্রাতিরিক্ত দামে মাছ বিক্রি করতে হয় তাদের। তাই এই পন্টুনের পাশাপাশি যদি নতুন করে আরও একটি যুক্ত করা হয়, তাহলে ভোগান্তি কমে যাবে’, বলেন তিনি। 

পাথরঘাটা মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক লে. লুৎফর রহমান বলেন, ‘তিনি যোগদানের পর ব্যবসায়ীদের ভোগান্তির বিষয়টি জানতে পেরে নতুন করে টলঘর নির্মাণ, ট্রলার ভেড়ানোর জন্য নতুন আরও একটি পন্টুন স্থাপন করার বিষয়ে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন থেকে বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী খুব কাছাকাছি হওয়ায় বেশিরভাগ জেলে মাছ শিকার করে পাথরঘাটা আসেন। তালতলীর ফকিরহাট নতুন করে আরও একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপনের আবেদনও করা হয়েছে। সেটিও অনুমোদন হয়েছে। খুব শিগগিরই সেখানে কাজ শুরু হবে। সেই অবতরণ কেন্দ্রটি চালু হলে একদিকে যেমন জেলেরা উপকৃত হবেন, একইভাবে সরকারও রাজস্ব পাবে’।

প্রসঙ্গত, পাথরঘাটার এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জেলেদের বিক্রি করা মাছের প্রতি ১০০ টাকায় ১.২৫ পয়সা রাজস্ব পায় সরকার।

/মাহি/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়