ঢাকা     সোমবার   ০৪ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২০ ১৪২৯ ||  ০৪ জিলহজ ১৪৪৩

আলু কুড়িয়ে জীবিকা ওদের

মনজুর রহমান, ভোলা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৫, ২০ এপ্রিল ২০২২   আপডেট: ১৬:৪৬, ২০ এপ্রিল ২০২২
আলু কুড়িয়ে জীবিকা ওদের

গ্রামের পাশ দিয়ে হাঁটছি। মাঠে তাকিয়ে দেখি মাত্র কৈশোরে পা দেওয়া তিনজন উপুড় হয়ে কিছু একটা করছে। কাছে গেলাম। দেখি, খালি মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে আলু কুড়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো দিয়ে কী হবে? বললো, আমরা আলু টোকাই, সারাবছর আমাদের আর আলু কিনতে হয় না। অন্যজন বললো, বেশি কুড়াতে পারলে বিক্রি করি, এই টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। এমনটি দেখা যায়, ভোলার লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়ন জাহাজমারা গ্রামে।    

সেখানে কৃষকেরা আলু তোলার পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট কিছু আলু তুলতে দেখা যায় রিফাত হোসেনকে (৮)। সে বলে, এই গ্রামে আমাদের বাড়ি। বাবার নাম মো. সেলিম। তিনি ঢাকার কাওরানবাজারের ভ্যানচালক। বাবার স্বল্প আয় দিয়ে মা ও তিন ভাই-বোনের সংসার চালায়। আর আমি পড়ালেখা করি স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে। স্কুল ছুটির পরে বিকালে কৃষকেরা আলু তোলার পরে আমরা অবশিষ্ট কিছু আলু কুড়িয়ে পাই। এ আলু দিয়ে আমাদের সংসারের সবজির বাড়তি যোগান দিয়ে থাকি। বেশি পেলে বিক্রি করি।  

সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠ থেকে আলু তুলে বস্তা ভর্তি করতে ব্যস্ত কৃষক-শ্রমিকেরা। অপরদিকে রিফাত, আপন মজুমদার ও ফজলে রাব্বির মতো একদল শিশু কোদাল আর ব্যাগ নিয়ে ক্ষেতের আইলে বসে আছে। জমি থেকে আলু ওঠানো শেষ হইতে না হইতে হুমড়ি খেয়ে মাটি খুঁড়ে কৃষকের এড়িয়ে যাওয়া আলু বের করছে তারা। সেই আলু নিজ ব্যাগে ভর্তি করছে। অভাবের সময় পরিবারে সবজির যোগান ও বাড়তি আয়ের জন্য আলু সংগ্রহে নেমেছে এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র পরিবারের স্কুল পড়ুয়া শিশুরা।

আলু চাষিদের সাথে কথা হলে তারা জানান, সাধারণত খেতের আলু শ্রমিক দিয়ে তুলে থাকেন। আলু তোলার সময় অসতর্কতার কারণে কিছু কিছু আলু মাটিতে চাপা পড়ে যায়। এদের মূল টার্গেট হলো এসব আলু সংগ্রহ করা। আলু তোলার আগে এসব গরিব ও অভাবী পরিবারের ছেলেমেয়েরা ক্ষেতে প্রবেশ করতে পারে না। কৃষকরা আলু নিয়ে যাওয়ার পর জমি তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তারা কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলু বের করে আনে এবং পাশে থাকা ব্যাগে রাখে।মাঝেমধ্যে জমির মালিকের বকাঝকাও তাদের কপালে জোটে। জমিজমা নেই, কেনার সামর্থও নেই, কেবল তাদের পরিবারের সন্তানরা এ কাজ করে।

উপজেলার পাংগাশিয়া গ্রামের শিশু ফজলে রাব্বির (১০) সঙ্গে কথা হয়। সে বলে, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। বাবা রাজ মিস্ত্রীর কাজ করেন। স্কুল ছুটির পরে বিকালে কোদাল আর ব্যাগ নিয়ে আলু টোগাইতে আসি। এক বিকাল আলু টোগাইলে ৪/৫ কেজি পাই।সব আলু যোগার করে আমাগো এক বছের খাওয়ার আলু হয়ে যায়। আমাগো আর আলু কিনা লাগে না।

জাহাজমারা গ্রামের কমলা রানী জানান, আপন মজুমদার ও কার্তিক মজুমদার দুজনেই তার সন্তান। সারাদিন আলু তুলে তিনি মজুরি হিসেবে পান ২৫০ টাকা। কাজে আসার সময় সঙ্গে সন্তানদের নিয়ে এসেছেন। যাতে সারাদিন তারা আলু কুড়াতে পারে। তিনিও কাজ শেষে সন্তানদের সঙ্গে আলু কুড়িয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। কুড়ানো আলু দিয়ে সারাবছর পার হয় বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এমাজউদ্দীন বলেন, উপজেলায় এবছর ৩৬৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে বেশি ভাগ আলু চাষ হয় পশ্চিম চর উমেদ ইউনিয়নে। কৃষকেরা ক্ষেত থেকে আলু তুলে নেওয়ার পরে অবশিষ্ট কিছু আলু থেকে যায়। এই সমস্ত শিশু কোদাল দিয়ে এ আলু কুড়িয়ে অনেকেই পরিবারের সবজির চাহিদা পূরণ করে।

/মাহি/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়