ঢাকা     শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৭ ১৪২৯ ||  ০১ জিলহজ ১৪৪৩

স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন জুলহাস শেখ

পাবনা প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০১:৩২, ২১ মে ২০২২   আপডেট: ০৯:২৪, ২১ মে ২০২২
স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন জুলহাস শেখ

বকুল ফুলের মালা বিক্রি করে জীবন যুদ্ধ লড়ছেন জুলহাস শেখ

বয়স ৮০ বছর পেরিয়েছে। দুই হাতে লাঠি ভর করে ফুলের মালা বিক্রি করছেন। হাত-পা কাঁপছিল, ঠিকমতো যেন হাঁটতেও পারছিলেন না। এই বয়সেও জীবিকার তাগিদে নামতে হয়েছে পথে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরে না আসায়, জোটেনি কোনো ভাতা। 

বলছিলাম জুলহাস শেখের কথা। তিনি নিজেও জানেন না বয়স্ক ভাতা পেতে হলে আর কত বয়স হতে হবে। ছেলে মেয়েরাও দরিদ্র হওয়ায় বাবা-মাকে ভরণপোষণ দিতে পারেন না তারা। জীবন সংসার চালাতে তাই বাধ্য হয়ে পথে ঘাটে ফুলের মালা বিক্রি করছেন জুলহাস শেখ। মালা বিক্রি করে যে টাকা পান তাই দিয়েই চলে নিজের ও স্ত্রীর খাবার।

পাবনার বেড়া উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের বকচর গ্রামে বাড়ি প্রবীণ জুলহাস শেখের। এই বয়সে ভিক্ষার পথ বেছে না নিয়ে, সৎ পথে জীবন চালানোর সিদ্ধান্তে ফুলের মালা বিক্রি করছেন তিনি।

সম্প্রতি কথা হয় জুলহাস শেখের সঙ্গে। তিনি জানান, তার একটি মাত্র ছেলে। তার সংসারেও টানাপোড়েন। চার মেয়ের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে। যেহেতু দরিদ্র পরিবারের মেয়ে তাই দরিদ্র পরিবারেই বিয়ে হয়েছে।, মেয়েরাও তাই বাবা-মায়ের ভরণপোষণ দিতে অক্ষম। আর এ কারণেই জুলহাস শেখ প্রতিদিন সকাল হলে বকুল ফুলের মালা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। প্রতিটি মালা ২০ টাকা করে বিক্রি করে যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে জীবনযাপন করছেন স্বামী-স্ত্রী।

পাঁচ সন্তান-সন্ততির জনক জুলহাস শেখ কাজ করে খাবেন, কিন্তু হাত পাতবেন না। ভিক্ষাবৃত্তি তার চরম অপছন্দ। তাই যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, ততক্ষণ কাজ করেই স্ত্রীকে নিয়ে বাঁচতে চান তিনি।

জুলহাস শেখ বলেন, ‘আমার স্ত্রী জহিরুন নেছার বয়স ৬০ বছরের বেশি। সেই আমাকে বকুল ফুলের মালা গেঁথে দেয়। আমি বাজারে কিংবা স্কুল-কলেজের রাস্তায় কখনো বসে বা কখনও হেঁটে মালাগুলো বিক্রি করি। যা আয় হয় তা দিয়ে ঠেলেঠুলে দু’জনের চলে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বয়সের চাপে দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে। শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগের মতো চলাফেরা করতে পারি না। বৃদ্ধ বয়সে এসে জীবনের মূল্য দিতে হচ্ছে। বেঁচে থাকার রসদ নেই, তবু বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তাই বাঁচার লড়াইটা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।’

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আলাউল হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা ও বাস্তবতার নিরিখে প্রবীণ মানেই সব কিছু জানা ও বোঝার পর পরাজিত একজন মানুষ। যে বয়সে একটু ভালোবাসা, সান্নিধ্য কিংবা ছেলেমেয়েদের পরম যত্মে থাকার কথা, সেই বয়সে নিঃগৃহিত হওয়া ছাড়া কিছুই মিলছে না। জুলহাস শেখ যেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ বলেন, ‘জুলহাস শেখ সম্পর্কে জেনেছি। এতদিন কেন তার কোনো ভাতা হয়নি সেটাই ভাবার বিষয়। আমি নতুন নির্বাচিত হয়েছি। তার ভাতার ব্যবস্থা করার সহ যে কোনো উপকারে পাশে থাকার চেষ্টা করবো।’

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুর আলী বলেন, ‘ওই প্রবীণ ব্যক্তি সম্পর্কে শুনেছি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা তার পাশে দাঁড়াবো। খাবারের ব্যবস্থা, ভাতার ব্যবস্থাসহ তার জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তাকে আর এ বয়সে পথে পথে ঘুরতে না হয়।’

শাহীন/ মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়