ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১১ আগস্ট ২০২২ ||  শ্রাবণ ২৭ ১৪২৯ ||  ১২ মহরম ১৪৪৪

মন্ত্রীর আশ্বাসের পরও দুশ্চিন্তায় লঞ্চ ও স্পিডবোট শ্রমিকরা

শেখ মোহাম্মদ রতন, মুন্সীগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১৫, ১২ জুন ২০২২   আপডেট: ১৩:১৩, ১২ জুন ২০২২
মন্ত্রীর আশ্বাসের পরও দুশ্চিন্তায় লঞ্চ ও স্পিডবোট শ্রমিকরা

মাওয়া ঘাটে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে লঞ্চ

কিস্তিতে টাকা তুলে স্পিডবোট কিনেছি। এরপর লাইসেন্স করতে বাকি সঞ্চয়ের টাকাও খরচ হয়েছে। এখন পদ্মা সেতু চালুর পরে যদি স্পিডবোট বন্ধ হয়, তাহলে কিস্তি চালাবো কীভাবে। সংসার চালাবো কীভাবে। পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে আমাকে। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন পদ্মার স্পিডবোটচালক আব্দুল রহিম।

শুধু রহিমই নন, পদ্মা সেতু চালুর পরে নদী পারাপারে নৌপথে যাত্রী কমার শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের কাওড়াকান্দি নৌরুটের লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোট চালক ও মালিক শ্রমিকসহ ঘাট সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা।

তবে গত শনিবার (১১ জুন) নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলেও শিমুলিয়া নৌবন্দর থাকবে। এ কারণে ফেরি চলাচল অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক চালকরা নৌরুটটি ব্যবহার করবেন। এ বছর বহরে আরো ১২টি ফেরি যুক্ত হবে। ফলে ফেরি সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। 

সময় বাঁচাতে অনেক যাত্রী স্পিডবোটে পদ্মানদী পার হন

আব্দুল মালেক নামে এক স্পিডবোট চালন বলেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে ঘাট থেকে কী হবে। অনেকেই সচরাচর এখানে আসবে না। তখন আমাদের স্পিডবোট চলবে কি না জানি না। সবাই বলছে, পদ্মায় নদীশাসনের জন্য সব স্পিডবোট বন্ধ হয়ে যাবে। আবার কেউ বলছে থাকবে। এসব চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’

শিমুলিয়া ঘাটে মালেকের মতো অধিকাংশ স্পিডবোট চালক তাদের শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার এ নৌপথ পদ্মা সেতু চালুর পরে জনশূন্য হয়ে পড়বে। ঘাট চালু থাকলেও কমে যাবে গুরুত্ব। টান পড়বে রুটি-রুজিতে।

সেতু নেভিগেশন কোম্পানির এম এল লঞ্চের মালিক মাসুদ খান বলেন, ‘এখনো জানতে পারিনি এ ঘাটগুলো থাকবে কি না। থাকলেও তখন যাত্রী হবে না। তখন এতো লঞ্চ দিয়ে কী হবে। যাত্রী না হলে লোকসানে চালাতে হবে। তখন পথে বসতে হবে আমাদের।’

আহনাফ লঞ্চের মাস্টার সফিউল্লা বলেন, ‘একেকটি লঞ্চে পাঁচ-ছয়জন স্টাফ। এ ঘাট থেকে কয়েকটি রুটে ৮৭টি লঞ্চ চলাচল করছে প্রতিদিন। প্রতিটি ঘাটে শত শত মানুষ আছে যারা লঞ্চ, ফেরিকেন্দ্রিক পেশায় নিযুক্ত। প্রয়োজন কমে গেলে অনেককে ছাঁটাই করবে মালিক। তখন তাদের রুজির যোগান হবে কিভাবে?’

স্পিডবোট চালক বাবুল হোসেন বলেন, ‘সরকার আমাদের নিয়ে মোটেও ভাবছে না। শুধু সেতু নিয়ে ব্যস্ত সবাই। আমাদের বিকল্প ব্যবস্থার কথা কেউ বলছে না।’

অপর চালক রহমতউল্লাহ্ বলেন, ‘শিমুলিয়া ঘাট থেকে কয়েকটি রুটে দেড়শতাধিক স্পিডবোট চলে। সেতু চালু হওয়ার পর স্পিডবোটের যাত্রী পাওয়া যাবে না। যাত্রীর জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকা ছাড়া আমাদের আর অন্য কোনো উপায় নেই।’ 

শিমুলিয়া ফেরিঘাট

স্পিডবোট চালকরা জানান, তারা প্রতিটি বোটের জন্য চার থেকে ১০ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেছেন। শিমুলিয়া ঘাটে একটি মালিকানাধীন ইয়োটও রয়েছে, যার দাম কোটি টাকার কাছাকাছি। এসব বোট নদীশাসনের কারণে চলাচল বন্ধ হলে ব্যাপক আর্থিক সংকটে পড়বেন তারা।

ঘাটের স্পিডবোটের ইজারাদারের প্রতিনিধি শফিকুল বলেন, ‘সেতু চালু হলে এই ঘাট আর সেভাবে চলবে না শুধু সেটাই জানি। সবাইকে সংসার চালানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ অন্য রুটে যাবে। এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাইনি আমরা।‘

এদিকে মাওয়া ঘাট থেকে প্রায় ৩০টি পর্যটক ইঞ্জিন চালিত ট্রলার চলছে সেতু এলাকায়। বর্তমানে এগুলো পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়া দর্শনাথীদের নিয়ে দারুণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু এটা আর কতোদিন চালানো যাবে সেই দুশ্চিন্তা পিছু ধরেছে তাদেরও।

ট্রলারচালক রিয়াজুল মোল্লা বলেন, ‘এখন সেতু চালু হয়নি বলে পর্যটকরা এসে ট্রলারে ঘুরে সেতু দেখছেন। চালু হওয়ার পরে আর কেউ এখানে আসবে না। সেতুর ওপরই যাবে। তখন আমাদের কি হবে সেটা আল্লাহ ভালো জানেন।’ 

তবে কয়েকজন ট্রলারচালক জানান, স্থানীয় প্রতিনিধিরা তাদের জানিয়েছেন মাওয়া ঘাটে পর্যটনকেন্দ্র চালু থাকবে।

লাইনে দাঁড়িয়ে স্পিডবোটে উঠছেন যাত্রীরা

পদ্মার নৌপথে পেশাজীবী এসব মানুষ বলছেন, পানি আর নদীর সঙ্গে আবহমান কাল থেকেই আত্মিক সম্পর্ক তাদের। ফলে ঘাট বন্ধ হলেও দ্রুত পেশা পরিবর্তন সম্ভব নয়। চালু থাকলেও লোকসান দিয়ে তাদের পেশা ধরে রাখতে হবে বাধ্য হয়েই। সেজন্য তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা দরকার ছিল সরকারের। ঘাটগুলোরই বা পরিণতি কী হবে সেটা পরিষ্কার করা দরকার।

যদিও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলেই যে নৌপথ বন্ধ হয়ে যাবে তা নয়। নৌপথের প্রয়োজনীয়তা থাকবে। তবে যাত্রী কমার কারণে হয়তো এতো পরিবহনের প্রয়োজন থাকবে না। তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি ঘাটে ফেরিও সচল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি নিবন্ধিত যেসব স্পিডবোট ও লঞ্চ আছে সেগুলোও চালু থাকবে। যতোদিন মানুষের চাহিদা থাকবে, ততোদিন রাখা হবে। কোনো সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।

আরো পড়ুন: পদ্মা সেতু চালু হলেও শিমুলিয়া নৌবন্দর বন্ধ হবে না

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়