ঢাকা     বুধবার   ১৭ আগস্ট ২০২২ ||  ভাদ্র ২ ১৪২৯ ||  ১৮ মহরম ১৪৪৪

মিনার সংগ্রামী জীবন

এনাম আহমেদ, বগুড়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৬, ৩ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১২:৪৩, ৩ জুলাই ২০২২
মিনার সংগ্রামী জীবন

একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে বগুড়া শহরের রাস্তায় ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মিনা চৌধুরী

সংগ্রামী নারী বগুড়ার মিনা চৌধুরী। বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলার মাটিডালিতে। বেঁচে থাকার তাগিদে শিশু বয়স থেকেই জীবনের কঠিন যুদ্ধের ময়দানে নেমেছেন তিনি। 

মিনার বয়স যখন ৭ বছর তখন থেকেই তিনি অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। তবে কাজ করতে গিয়ে অবহেলা আর নির্যাতনের শিকার হন। যে কারণে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে ১৪ বছর বয়সে ঢাকায় চলে আসেন। এরপর বিভিন্ন বাড়িঘরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। পরে সেখানে রিকশা চালানোর কাজকে পেশা হিসেবে নেন। এর মধ্যে জীবনে স্বামী সন্তানের অভাব দূর হলেও দূর হয়নি আর্থিক অভাব অনটন। ফলে নিজ এলাকা বগুড়ায় ফিরে ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন তিনি। দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শহরের অলিগলি। 

এদিকে মফস্বল শহরের নারী হয়েও মিনার এভাবে ইজিবাইক চালানোকে সাহসী উদ্যোগ বলে মনে করছেন বগুড়ার সুধী মহল।

মিনা জানান, ছোটবেলায় তার মা তাকে রেখে অন্যত্র চলে যান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সৎ মা এসে তাকে মেনে নিতে পারেননি। যে কারণে ৭ বছর বয়সেই তাকে গৃহকর্মী হিসেবে অন্যের বাড়িতে কাজে যেতে হয়। সেখানে গিয়েও তাকে সইতে হয়েছে বৈষম্য মারধর অত্যাচার। যে বাড়িতে তিনি কাজ করতেন সেই বাড়ির লোকজন কখনো তাকে পেটপুরে ভাত খেতে দেতো না না। জামাকাপড় দিলেও টেট্রোন কাপড়ের কিনে দিতো। মূলত টেট্রোন কাপড়ের পোশাক ছিড়ে যাবে না বলেই এই কাপড় পরতে দেওয়া হতো।

মিনা বলেন, ‘মানুষের লাথিগুতো খেয়েই আমার বয়স বেড়েছে। যখন আমার বয়স ১৪ বছর তখন প্রথম রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামি। ঢাকার শ্যামলীতে ২০ বছর রিকশা চালিয়ে জীবিকা অর্জন করি। আদাবর বাজারের মেহেদীবাগে ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমার স্বামী চুক্তিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরি করতেন। সংসার চালানো দায়। যে কারণে বিয়ের পরেও রিকশা চালানো ছেড়ে দেইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে উপার্জন করার টাকা দিয়ে কখনও কাঁচামালের ব্যবসা করেছি। আবার কখনও ফেরি করে পাড়া মহল্লায় ঘুরে বিক্রি করেছি কসমেটিক্স। সর্বশেষ গত ৬ বছর আগে সরকারিভাবে সৌদি আরবে যাই। সেখানে চুক্তি অনুযায়ী ৩ বছর থাকার পর  ফিরে এসেছি দেশে। সৌদি থেকে উপার্জনের টাকায় বগুড়া শহরের কালিবালা এলাকায় নিজের বাড়ি তৈরির জন্য জায়গায় কিনেছি। তবে জায়গা কিনেও স্বস্তিতে নেই। কারণ জায়গা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। জমির দালালরা জমি দেখিয়েছে একটা আর দলিল করে দিয়েছে আরেক জমির। জমির যিনি মূল মালিক তিনি বলেছেন, জমি তোমাকেই দেবো। তবে জমির মালিকদের মধ্যেও সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা চলছে যে কারণে জমির দলিলও করে দিচ্ছে না।’

মিনা আরো বলেন, ‘বাড়িতে তার মা এবং ১০ বছর বয়সী একটি বাচ্চা রয়েছে। স্বামী স্বপন মন্ডল ঢাকাতে চাকরি করেন। বিদেশ থেকে ফিরে গত তিন বছর যাবৎ তিনি বগুড়ায় রয়েছেন। গত ৬ বছর তিনি রিকশা চালাননি। কিন্তু তার স্বামীর উপার্জিত টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। যে কারণে গত ক’দিন হলো বগুড়াতে আমি ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। বগুড়ায় ইজিবাইক চালাতে গিয়ে অনেক ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেকে খারাপ চোখে দেখে। অনেকে গাড়িতে উঠতে চায় না। অনেকে বলে মহিলা মানুষ কেন গাড়ি চালায়। টিপ্পনি কাটে।’

মিনা বলেন, ‘টিপ্পনি ধরে রাখলে তো আমার চলবে না। কারণ আমার পেটে ক্ষুধা। রাস্তায় নামতেই হবে। যে কারণে সেসব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে রাস্তায় নেমেছি। এরপরেও লোকজন উঠছে। যারা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন তারাই আমার রিকশায় উঠছেন। দিনে রিকশা চালিয়ে ৫০০ টাকার বেশি ভাড়া উঠানোর লক্ষ্য নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা ভাড়া উঠাতে ইজিবাইকের মালিককে ভাড়া পরিশোধ করে দিনশেষে ২০০ টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারি।’

মিনা প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪ টা থেকে সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বগুড়া শহরে ইজিবাইক চালান।

মিনা বলেন, ‘মানুষের বাসায় সারাদিন বাসন মাজলেও তো ২০০ টাকা পাওয়া যায় না। সেখানে অনায়াসে ইজিবাইক চালিয়ে দিনে অন্তত ২০০ টাকা উপার্জন করা সম্ভব। মাসে ৬ হাজার টাকা সংসারে দিতে পারলে অনেকটা অভাব দূর হয়ে যায়। আবার ইজিবাইক চালিয়ে ঘরের কাজকর্মও ঠিকমত করা যায়।’

বগুড়ার দর্গাহাট ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক মেহেদী আল শিবলী লেনিন জানান, মিনা তার বাসাতে কিছুদিন ভাড়া থেকেছেন। খুব সংগ্রামী নারী তিনি। স্বচ্ছলভাবে চলার জন্য অনেক কষ্ট করে যাচ্ছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় একটি ব্যাপার। কারণ একজন মহিলা হয়ে তিনি ইজিবাইক চালিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করছেন। এটা আমাদের অ্যাপ্রিসিয়েট করা উচিত।

বগুড়া জজকোর্টের আইনজীবী এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম’র জেলা সভাপতি দিলরুবা নূরী বলেন, ‘বগুড়াতে একজন নারী ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক চালাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি সাহসিকতার একটি পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সব প্রতিকূলতাকে পাশ কেটেই তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে মোকাবেলা করার জন্য তার যে মানসিক প্রস্তুতি এটা আসলে অন্যান্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমি মনে করি।  এখানে এই নারীর ভূমিকাটা খুব ভালো লেগেছে। তবে নারীরা যাতে সব ক্ষেত্রেই তাদের কাজকর্ম করে যেতে পারে এজন্য রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা আরো জোরদার করা উচিত।’

মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়