ঢাকা     সোমবার   ০৩ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ১৮ ১৪২৯ ||  ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

ব্যাপক লোকসানের শঙ্কায় আলু চাষি-ব্যবসায়ীরা

মো. শামীম কাদির, জয়পুরহাট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৬, ১৪ আগস্ট ২০২২  
ব্যাপক লোকসানের শঙ্কায় আলু চাষি-ব্যবসায়ীরা

জয়পুরহাটের হিমাগারে প্রকারভেদে প্রতিকেজি আলু ১৬ থেকে ১৭ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে তা প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে খুচরা, পাইকার ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও আলু সংরক্ষণ করে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী, হিমাগার মালিক ও চাষিরা। মোটা অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে ভালো দাম পেয়ে চাষিরা আলু চাষে ঝুঁকে পড়ে। অনেক ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতে হিমাগার মালিকদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আলু কিনে জেলার ২০টি হিমাগারে ভরে রাখেন। মৌসুমের শুরুতে এসব হিমাগারে আলু সংরক্ষণ হয় (৬৫ কেজি ওজনে) ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ২৫৩ বস্তা। আলু উত্তোলনের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ নভেম্বর। অথচ এ সব হিমাগারে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ১৫৩ বস্তা আলু মজুত রয়েছে। গত বছর এই সময়ে মজুতের বেশিভাগ আলু বিক্রি হয়ে যায়।

চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় আলুর উৎপাদন ভালো হয়। উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং এর আগের বছর দাম ভালো পাওয়ার কারণে মৌসুমের শুরুতে বিক্রি না করে হিমাগারে আলু মজুদ বেশি করেন। তাতে হিমাগারের খরচসহ প্রতি বস্তায় খরচ পড়েছে ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকা। বর্তমান বাজারে আলু প্রতি বস্তা ১০২০ থেকে ১০৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে বস্তা প্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৫০ টাকা। বেশিরভাগ আলু এখনো হিমাগারে থাকায় মোটা অংকের লোকসান গুনতে হবে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। আলু কিনতে ব্যবসায়ীদের দেওয়া ঋণের টাকা এবং আলু রাখার ভাড়ার টাকা ওঠাতে বেকায়দায় পড়েছে হিমাগার মালিকরা। লোকসান ঠেকাতে আলু রফতানির দাবি জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

হাট-বাজার ও হিমাগারগুলোতে সরেজমিন দেখা গেছে, ৬৫ কেজি ওজনের কার্ডিনাল (লাল) জাতের আলু প্রতি বস্তা ১০১০ টাকায়, ডাইমন্ড (সাদা) জাতের আলু ১০৬০ টাকায়, দেশি পাকরি (লাল) জাতের আলু ১১৫০ টাকায় এবং রুমানা (পাকরি) জাতের আলু ১১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের এই সময়ে দাম ভালো থাকায় প্রতিটি হিমাগারে সংরক্ষণকৃত আলু বের করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় শ্রমিক ও কর্মচারীদের। অথচ এ বছরের চিত্র উল্টো। আলু সংরক্ষণকারীদের উপস্থিতি এবার নেই বললেই চলে। এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত আলুর তিন ভাগের এক ভাগও বের করা হয়নি।

এম ইসরাত কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণকৃত ১ লাখ ৪৪ হাজার বস্তা আলুর মধ্যে রোববার (১৪ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত বের হয়েছে ৩৪ হাজার বস্তা। একইচিত্র পুনট কোল্ড স্টোরেজ, আর. বি স্পেশালাইস্ট, নরওয়েস্ট, নর্থপোল, সাউথপোল, পল্লী হিমাগার, সালামিন ফুডস, মোল্লা, হিমাদ্রী, মান্নান এন্ড সন্সসহ জেলার ২০টি হিমাগারের।  

এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার জানান, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশে সব কিছুর দাম হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ আলুর দাম দিন দিন কমেই যাচ্ছে। এ কারণে চাষি ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি লোকসান গুনতে হচ্ছে হিমাগার মালিকদের। বর্তমানে হিমাগারে থাকা লাখ লাখ বস্তা আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। আর আলু মজুতের সময় হিমাগার মালিকরা কোটি কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীদের।

গুনীমঙ্গল বাজারের ব্যবসায়ী মোজাফর হোসেন জানান, গত বছর আলুর দাম বেশি পাওয়ায় লাভ হয়। এ বছর ঋণ নিয়ে দেশি পাকরি লাল জাতের আলু সাড়ে ৩ হাজার বস্তা, স্টিক লাল জাতের ১১ হাজার বস্তা এলাকার কয়েকটি হিমাগারে রেখেছেন। বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা তাতে এই মহূর্তে আলু বিক্রি করলে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা লোকসান হবে।

সড়াইল গ্রামের কৃষক সুজাউল ইসলাম বলেন, `এবার আলু নিয়ে বড় বিপদে আছি। মৌসুমের শুরুতে আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রেখেছিলাম। নিজের ভূলের খেশারত বড় করেই গুনতে হচ্ছে। লাভের আশায় আলু রাখলাম, এখন লাভ তো দূরের কথা উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে। আলুর বিকল্প ফসল ফলানোর চিন্তা না করে আর উপায় নেই।`

জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আলুর দরপতন নিয়ে এবার সবাই চিন্তিত। যেসব কোম্পানি আলু বিদেশে রফতানি করে তাদের সঙ্গে আমরা দফায় দফায় আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। দেখা যাক কি হয়। তবে আমরা বাজার মনিটরিং অব্যাহত রেখেছি।’

/বকুল/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়