ঢাকা     রোববার   ০২ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ১৭ ১৪২৯ ||  ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

সিরাজগঞ্জে তাঁত শিল্পে ধস 

অদিত্য রাসেল, সিরাজগঞ্জ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:১২, ১৭ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১২:১৮, ১৭ আগস্ট ২০২২
সিরাজগঞ্জে তাঁত শিল্পে ধস 

কাজ না থাকায় গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন তাঁত শ্রমিকরা

তাঁত পল্লী হিসেবে পরিচিত যমুনা পাড়ের জেলা সিরাজগঞ্জ। এ জেলায় চাহিদা মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেলার তাঁত শিল্পে উৎপাদন কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। কারখানার মালিকরা ডিজেল-চালিত জেনারেটরের সাহায্যে কারখানা সচল রাখার চেষ্টাও করছেন। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানা সচল রাখতে পারছেন না মালিকরা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার তাঁত রয়েছে। এই তাঁত কারখানায় সুতা তৈরি, সুতায় রং দেওয়া, সুতা শুকানো ও কাপড় উৎপাদনের জন্য প্রতি তাঁতে ২-৩ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। এতে মালিক ও শ্রমিক মিলে প্রায়
সাড়ে ৩ লাখ মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সিরাজগঞ্জ জেলার উৎপাদিত থ্রি-পিচ, গামছা, লুঙ্গি ও শাড়ি দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হয়। 

সিরাজগঞ্জের একটি তাঁত কারখানা

সপ্তাহে দুইদিন জেলার উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর ও পাঁচিল বাজারে তাঁত কাপড়ের  হাট বসে। এই হাটে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা আসেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে তাঁতে তৈরি কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হয়। কিন্তু তাঁত পল্লী হিসেবে পরিচিত এই
জেলায় চাহিদা মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে আগে যেখানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করতো বর্তমানে ৩ জন শ্রমিক কাজ করছে। এতে উৎপাদন কম হচ্ছে। আবার যতটুকু উৎপাদিত হচ্ছে, সেগুলো হাট-বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। যে কারণে বাধ্য হয়ে অনেক মালিকই কারখানা বন্ধ রাখছেন।

শাহজাদপুরের দ্বারিয়াপুর এলাকার শাড়ি তৈরীর শ্রমিক জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘আগে দিনে তিন-চারটি শাড়ি তৈরি করা যেতো। লোডশেডিংয়ের কারণে এখন সারা দিনে দুটি শাড়ি তৈরি করা যায় না।’

বেলকুচির মুকন্দগাতী গ্রামের তাঁত শ্রমিক, সুমন, আসলাম ও পলাশ সরকার বলেন, আগে একজন শ্রমিক সপ্তাহে তিন-চার হাজার টাকার কাজ করতো। এখন ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার কাজ করা হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে দিনে ও রাতে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের।’

চন্দনগাঁতি গ্রামের পাওয়ারলুম শ্রমিক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁতের শ্রমিক হিসাবে কাজ করে ৭ জনের সংসার চালিয়ে আসছি।  কাজ যতোই কম থাকুক না কেন প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা কামাই করি। বর্তমানে কারেন্টে ডিস্টার্ব থাকায় ঠিক মতো কাজ হচ্ছে না। যার কারণে কামাইও কমে গেছে। কারেন্ট যেভাবে আসা-যাওয়া করছে এতে আমার মতো সবারই কামাই কমে গেছে। এতে সংসার চালাতে বিপাকে পড়েছি।’

বেলকুচির রায় প্রডাক্টসের মালিক রিপন সাহা বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালু রাখা হতো। কিন্তু হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা জেনারেটর চালু রাখলে
পাঁচ-সাত লিটার তেল প্রয়োজন হচ্ছে। এই কয়েক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে অনেক বেশি।’

সদর উপজেলার সয়দাবাদ এলাকার বিসমিল্লাহ সুতার দোকানের মালিক বিদ্যুৎ সরকার বলেন, ‘লোডশেডিং, অন্যদিকে সুতার মূল্য বৃদ্ধি। এতে তাঁতিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ৫০ কাউন্টের এক বস্তা সুতা এক বছর আগেও ছিল ১৪ হাজার ৫০০ টাকা, এখন সেই সুতার বস্তা ২২ হাজার ২০০ টাকা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সিরাজগঞ্জ বড় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক শফিকুল ইসলাম জিন্না বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। তাঁত মালিকদের গুনতে হচ্ছে লোকসান। এই শিল্প টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।’ জেলার তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ পাওয়ালুম অ্যান্ড হ্যান্ডলুম অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বদিউজ্জামান বলেন, ‘লোডশেডিং এবং তেলের দাম বাড়ায় অধিকাংশ সময় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। শ্রমিকরাও কাজ করতে পারছেন না।  তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সুতার দামও বেড়েছে। আর যতটুকু কাপড় তৈরি করা হচ্ছে, তা বিক্রি করা যাচ্ছে না। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের।

তিনি আর বলেন, ‘জেলায় প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার তাঁতকল রয়েছে। এসব কারখানার অর্ধেকেরও বেশি যন্ত্র বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকেরাও বেকার হয়ে যাচ্ছেন। তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে কারখানা চালানো যাচ্ছে না। তাঁত মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আর তাঁতের ব্যবসা টিকে না থাকলে জেলার লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবে।

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়