ঢাকা     শনিবার   ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২৫ ১৪২৯

সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজের বাগেরহাট

আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০০, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১২:৪৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজের বাগেরহাট

ষাটগম্বুজ মসজিদ

দেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মধ্যে দুটির অবস্থান বাগেরহাট জেলায়। একটি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন অপরটি মধ্যযুগের মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ। অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা এই বাগেরহাট। 

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার সড়ক পথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্য এলাকার দূরত্ব কমে আসায় এখন দিন যতো যাচ্ছে বাগেরহাটে ততই বাড়তে শুরু করেছে পযটকের সংখ্যা। পর্যটকদের আকৃষ্টি করতে সুন্দরবনে আরও নতুন করে চারটি ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া দেশি বিদেশি পযটকদের থাকা-খাওয়াসহ আরো সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দর্শনার্থীদের।

পর্যটন শিল্পের অপার দুই সম্ভাবনা বাগেরহাট জেলাতে থাকলেও দীর্ঘদিন এখানে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। তবে সংকটের মধ্যেও দুই বিশ্ব ঐতিহ্যেকে ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের। সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ মসজিদকে পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারিভাবে নেওয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ। 

সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কালাবগী এবং শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্ধা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এলাকায় ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। দর্শনার্থীদের দাবি, মানসম্মত খাবার, থাকার জন্য হোটেল-মোটেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে ষাটগম্বুজ ও  সুন্দরবনের পাশাপাশি ঐতিহাসিক নিদর্শণগুলো ভালভাবে দেখার সুযোগ পাবেন তারা।

প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে খানজাহান আমলে নির্মিত ইসলামী স্থাপত্য রীতির মসজিদগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৫ সালে বাগেরহাটকে মসজিদের শহর হিসেবে ঘোষনা করা হয়। একই সঙ্গে  বাগেরহাটের ১৭টি স্থাপনাকে ৩২১ তম বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে ইউনেস্কো। তালিকাভুক্ত ওই স্থাপনা ছাড়াও বাগেরহাটে আরও অনেক পুরাকীর্তি ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা রয়েছে। সম্প্রতি বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১৬৩টি প্রত্নস্থান (সাইট) শনাক্ত করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে সুন্দরবনের বাগেরহাট অংশে পর্যটক এসেছেন ১ লাখ ২০ হাজার জন। অন্যদিকে বাগেরহাটের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ষাটগম্বুজ মসজিদে এসেছেন ১ লাখ ৮০ হাজার দর্শনার্থী। বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদের আশেপাশের ৫ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ইউনেস্কো ঘোষিত ১৭টি স্থাপনা। তবে ষাট গম্বুজ মসজিদ ছাড়া জেলা শহরের মধ্যে থাকা অন্যান্য স্থাপনাগুলো পড়ে রয়েছে অযত্ন আর অবহেলায়। 

বাঘ, কুমির, হরিণ ও সাপসহ বিভিন্ন প্রকার প্রাণী ও পাখির আবাসস্থল সুন্দরবন

সরেজমিনে স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হলেও অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে স্থাপনাগুলো। সবকিছু মিলিয়ে সংষ্কার ও সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এসব স্থাপনা। 

ষাটগম্বুজ-সুন্দরবন ট্যুরিজম ট্যুর অপারেটরের পরিচালক মীর ফজলে সাঈদ ডাবলু বলেন, ‘বাগেরহাটে অনেক পর্যটন স্পট থাকলেও সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয়দের আচার-ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ষাটগম্বুজ, মোংলাসহ বিভিন্ন স্থানের হোটেল-রেস্টুরেন্টের কর্মচারীদেরকেও প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন।’

সদর উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া পারভীন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর ফলে বাগেরহাটের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। জেলার প্রবেশপথে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যানার বা বিলবোর্ড এর মাধ্যমে যদি এক নজরে বাগেরহাটের দর্শনীয় স্থাপনার বর্ণনা, যাতায়াত ব্যবস্থা, খাবার ও থাকার হোটেল লিখে রাখা যায় তবে দর্শনার্থীদের জেলায় ভ্রমণ আরও সহজতর হবে।’ 

বাগেরহাট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টোডিয়ান মো. যায়েদ বলেন, ‘পর্যটন নগরী বাগেরহাটে আগত দর্শনার্থীদের জন্য লোকালয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা (হোম স্টে) করতে পারলে স্থানীয়রা বেশ লাভবান হবেন। এছাড়া দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ষাটগম্বুজের সামনের বিশ্রামাগার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি মসজিদ সংলগ্ন ঘোড়াদিঘিকে নান্দনিক করতে ওয়াক ওয়ে তৈরী করা হয়েছে।’

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘সুন্দরবনে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজম সুবিধা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরও চারটি ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। নতুন করে তৈরি হতে যাওয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রগুলো হচ্ছে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কালাবগী এবং শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্ধা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক।’

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘এই জেলাকে পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার নানা উদ্যেগ নিয়েছে। প্রত্যেকটি পর্যটন কেন্দ্রের শোভা বর্ধন, আবাসন ব্যবস্থা, মানসম্মত খাবার, বিপনন কেন্দ্র, সহজ যাতায়াত, সার্বিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা  নেওয়া হচ্ছে।’ 

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়