ঢাকা     শুক্রবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৮ ১৪২৯ ||  ০৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

আচরণবিধি ভেঙে আ.লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চলছেই

রাজশাহী সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ১ অক্টোবর ২০২২  
আচরণবিধি ভেঙে আ.লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চলছেই

জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মীর ইকবালের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন।

আসন্ন রাজশাহী জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবালের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে একের পর এক আচরণবিধি ভাঙার ঘটনা ঘটছে। নজরে এলে চিঠি দিয়ে এ ব্যাপারে সতর্ক করছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

ইতোমধ্যে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং দুই সংসদ সদস্যকে সতর্ক করা হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার (১ অক্টোবর) রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল।

আচরণবিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। তবে গত শুক্রবার দুপুরে রাজশাহী নগরীর চৈতির বাগানে পবা উপজেলার ভোটারদের সঙ্গে ভুড়িভোজে অংশ নেন সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন। সেখানে চেয়ারম্যান প্রার্থী মীর ইকবালও উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে মীর ইকবালের জন্য ভোট চান আয়েন।

আয়েন উদ্দিন বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে জেলা পরিষদের টাকা ছাড়া কোনো প্রকল্প বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। নেতাকর্মীরা অসম্মানিত হয়েছেন। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে টাকা ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া গেছে। গতবার ভোটাররা ভুল করে দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেননি। এবার এই ভুল করা যাবে না। ভুল শুধরে নিতে হবে। আদর্শের মানুষকে আনতে হবে।’

এমপি আয়েন এর আগেও মীর ইকবালের প্রচারণায় অংশ নেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি মোহনপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় প্রার্থী মীর ইকবালকে জেতাতে সবার সমর্থন চান। সে সভায় মীর ইকবালও উপস্থিত ছিলেন। 

শুক্রবারের প্রচারণা নজরে এলে তাকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। 

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তবে ওই নির্বাচনী সভায় দুপুরে খাওয়ার কথা স্বীকার করে চেয়ারম্যান প্রার্থী মীর ইকবাল বলেন, ‘আমাকে ডেকেছে, তাই গিয়েছি। কে বা কারা আয়োজন করেছে এসব কিছু আমি জানি না।’ 

সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি না মানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মীর ইকবাল ৫৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি। আমার কোনো এমপিকে দরকার নেই।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে একাধিক প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন সংসদ সংসদ্যরা। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই তারা এসব প্রচারণায় অংশ নেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা বারবার সতর্ক করলেও তারা নিষেধ অমান্য করেই প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই প্রার্থীর পক্ষে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন অন্য চেযারম্যান প্রার্থীরা। তারা বলছেন, নিয়ম নীতি না মেনেই এমপিরা দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। প্রাকাশ্যে তারা বিভিন্ন সভায় অংশ নিচ্ছেন। ভোটারদের ভোট দিতে চাপ দিচ্ছেন। ফলে প্রচারণায় গিয়ে বেকায়দায় পড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আখতারুজ্জামান আক্তারের প্রচারণায় বাধা দেওয়ারও ঘটনা ঘটেছে। সেদিন দুপুরে রাজশাহীর দুর্গাপুর পৌরসভার কার্যালয়ে ভোটরদের সাথে দেখা করতে যান তিনি। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে বাঁধা দেন বলে অভিযোগ করেন আখতারুজ্জামান। দুই পক্ষের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।

ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ এমপি আয়েনের এসব অসম্মানজনক কাজ থেকে বের হয়ে আসা উচিত।’ 

এমপি আয়েন ছাড়াও মীর ইকবালের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) অসনের সংসদ সদস্য ডা. মনসুর রহমান এবং দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি কররপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন । তাদেরও সতর্ক করা হয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টম্বর রাচশাহী নগরীর কুমারপাড়ায় নগর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে মেয়র লিটন নির্বাচনি সভায় অংশ নেন। তিনি বলেন, ‘প্রার্থী মীর ইকবালের পক্ষে ভোটারদের যেভাবে সমর্থন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে তাতে আমাদের প্রার্থী অতি সহসাই বিজয়ী হবে। তবে এক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে জেতাতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বানও জানান সিটি মেয়র।

এই ঘটনার পরপরই গত ২৮ সেপ্টেম্বর নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার জন্য তাঁকে সতর্ক করে মেয়রের দপ্তরে চিঠি পাঠান রিটার্নিং কর্মকর্তা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে সংসদ সদস্য মনসুর রহমান তার নির্বাচনী এলাকা দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ হলরুমে এক নির্বাচনী মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এর আগে গত শুক্রবার পুঠিয়া উপজেলা পরিষদ হলরুমে এক নির্বাচনি সভায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এমপি ডা. মনসুর রহমান। এসব সভায় তিনি মীর ইকবালকে জেতাতে বক্তব্য দেন। বিষয়টি নজরে এলে ২৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে সংসদ সদস্য মনসুরকেও চিঠি পাঠানো হয়।

নিজ দলের প্রার্থীর হয়ে প্রচার প্রচারণা চালানোর কথা স্বীকার করেছেন ডা. মনসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকতা আমাকে চিঠি পাঠানোর পর কোনো সভায় আমি অংশ নেইনি। তবে দলীয় প্রার্থী আমাদের। তাই তার পক্ষে আকার-ইঙ্গিতে হলেও কাজ করতে হচ্ছে।’

ভোটের সার্বিক বিষয় নিয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম প্রামানিক বলেন, ‘চৈতির বাগানে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমরা জানতে পেরেছি। তাই আজ সকাল ১০টার দিকে এমপি আয়েন উদ্দিনকে সর্তক করে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। এর আগে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও এমপি ডা. মনসুর রহমানকেও সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি অনুযায়ী যারা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না অথচ অংশ নিচ্ছেন, এমন কারও বিষয় নজরে এলে তাকেও সতর্ক করা হবে।’

আগামী ১৭ অক্টোবর রাজশাহী জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল ছাড়াও তিন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। স্বতন্ত্র তিন প্রার্থীর মধ্যে আখতারুজ্জামান আক্তার আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। অন্য দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন বীর মুক্তযোদ্ধা আনোয়ার ইকবাল ও আফজাল হোসেন।

শিরিন সুলতানা/ মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়