ঢাকা     শনিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৯

চ্যালেঞ্জের মুখে কুমিল্লায় প্রকাশনা শিল্প

রুবেল মজুমদার, কুমিল্লা সংবাদদাতা  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০২, ২১ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১১:১৫, ২১ নভেম্বর ২০২২
চ্যালেঞ্জের মুখে কুমিল্লায় প্রকাশনা শিল্প

কাগজ ও কালির দাম বাড়ায় স্থানীয় সংবাদপত্র প্রকাশে বেগ পেতে হচ্ছে কুমিল্লার প্রকাশকদের।

করোনার কারণে প্রায় তিন বছর ধরে সৃষ্ট সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কাগজের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে কুমিল্লার প্রকাশনা শিল্প। বিশেষ করে কাগজের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় কুমিল্লার স্থানীয় পত্রিকার প্রকাশকরা বেকায়দায় পড়েছেন। শুধু কাগজ নয়, কালি ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক জিনিসের দামও বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হরে।

কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত স্থানীয় পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদকরা জানিয়েছেন, কাগজের দাম বেড়েছে। কিন্তু পত্রিকার দাম বাড়েনি। প্রিন্ট পত্রিকা এমন একটি দলিল যা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণ রাখা যায়। কাগজের দাম বাড়ায় বর্তমানে প্রিন্ট পত্রিকা প্রকাশনা হুমকির মুখে পড়েছে।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রিন্ট পত্রিকার জায়গা বর্তমানে দখল করে নিচ্ছে অনলাইন পত্রিকা। এতে পাঠক হারাতে বসেছে প্রিন্ট পত্রিকা। একদিকে পাঠক সংকট, অন্যদিকে কাগজের দাম বৃদ্ধি। এই দু’য়ের যাতাকলে পড়েছে প্রিন্ট পত্রিকার প্রকাশনারা। স্বল্প মূল্যের পত্রিকার যেখানে পাঠক দিন দিন কমছে, সেই ক্ষেত্রে কাগজের দামের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পত্রিকার দাম বাড়াতে গেলে পাঠক খুঁজে পাওয়াটা কষ্টকর হয়ে পড়ছে প্রকাশকদের জন্য।

স্থানীয় পত্রিকার কয়েকজন সম্পাদক বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধ ও ডলারের দাম বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কাগজের এতটা বাড়ার কথা নয়। এখানে এক শ্রেণির মানুষ সিন্ডিকেট করে কাগজের দাম বাড়িয়েছেন। অপরদিকে কালির দাম বৃদ্ধির কারণে বাড়ানো হয়েছে ছাপা খরচ। তাই পত্রিকা প্রকাশে সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

কুমিল্লা নগরীর নিউমার্কেট এলাকার চান্দিনা পেপার হাউসের মালিক জাহিদুর হোসেন বলেন, ‘নির্দিষ্ট চাহিদার কারণে খাতার কাগজের বিক্রি ঠিক আছে। তবে মুদ্রণের কাজে ৮০ শতাংশ কাগজ ব্যবহার হওয়ায় আমাদের গড় বিক্রি কমে গেছে। এছাড়া নিউজপ্রিন্টের কাগজের দাম বেড়েছে অধিক হারে। ঢাকার পাইকারি মার্কেটগুলোতে চাহিদার তুলনা কম থাকায় স্থানীয় বাজারে কাগজ পেতে কষ্ট হচ্ছে। প্রয়োজন থাকলে অধিক দামে কাগজ কিনতে আমাদের ভয় হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে মুদ্রণ ব্যবসা অনেক কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে।’ 

কাগজ ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সাপ্তাহ ধরে কাগজের দাম শুধু বেড়েছে। যে খাতা কিছুদিন আগে ৪০-৪৫ টাকায় কেনা যেতো সেই খাতার দাম এখন বেড়ে হয়েছে ৭০ থেকে ৭৬ টাকা। ২৭০ টাকার রিম এখন প্রায় ৪২০ টাকা। এছাড়া বেড়েছে নিউজপ্রিন্ট ও লজার কাগজের দাম। তবে এ সাপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে লেজার কাগজের দাম। প্রতি টনের দাম ৩০ হাজার টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। প্রতি টন নিউজপ্রিন্ট কাগজের দাম ৬৫ হাজার থেকে বেড়ে ৮৭ হাজার টাকা হয়েছে। কম দামি এ কাগজের দাম গত সপ্তাহ তুলনায় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ।

এক মাস আগে এক রিম (৮০ গ্রাম) প্রিন্টিং কাগজের দাম ছিল ১ হাজার ২৫০ টাকা। বর্তমানে সেই কাগজের দাম বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। পত্রিকার প্লেট প্রতি সিঙ্গেল ১৭৫  টাকার স্থলে এখন ১৯০ থেকে ২২০ টাকা। ছাপা খরচ ২০০ টাকার স্থলে এখন ২৫০ টাকা। এছাড়া ৬৫ গ্রামের কাগজ ছিল ১ হাজার ১৫০ টাকা , বর্তমানে তা  বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬৮০ টাকায়।

নগরীর চান্দিনা প্লাজার উদয়ন প্রিন্টার্সের মালিক রহমান মিয়া বলেন, ‘গত এক সপ্তাহে প্রতি ১০০টি মলাটের কাগজের দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে। একই পরিমাণ আর্ট কার্ডের দামও এখন ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি। ১০০টি আর্ট কার্ড মিলছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। এক রিম রঙিন কাগজের দাম ৮৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়।’

কুমিল্লা পের্পাসের ম্যানেজার মো. সুমন বলেন, ‘খাতার মতো কাগজের উপকরণের দাম গত এক সপ্তাহে নতুন করে ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মাঝারি আকারের ১০০টি খাকি খামের দাম ২৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা। সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঢাকার বাজারে দাম বাড়ায় আমাদের স্থানীয় বাজারেও দাম বেড়েছে।’

বাহার প্রিন্টার্সে প্রোপ্রাইটর মো. বাহার উদ্দিন বলেন, ‘প্রকাশনা শিল্প পুরোপুরি কাগজের ওপর নির্ভরশীল। প্রকাশনা সংস্থাকে মার্কেট থেকে কাগজ কিনতে হয়। কিন্তু এভাবে কাগজের দাম বেড়ে যাওয়াটা প্রকাশনা শিল্পে একটা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সাপ্তাহ পর সাপ্তাহ কাগজ দাম যে হারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে তাতে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত ট্যাক্স কমিয়ে বিষয়টিকে তদারকির মধ্যে আনা। আর তা নাহলে প্রকাশনা শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।’

দৈনিক শিরোনাম পত্রিকার সম্পাদক নীতিশ সাহা বলেন, ‘এক সময় সরকার স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোকে কাগজে ভর্তুকি দিতো। এটি এখন বন্ধ করে দিয়েছে তারা। যে হারে কাগজ ও ছাপার খরচ বেড়েছে তাতে আমাদের নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। নিউজপ্রিন্ট কাগজগুলোর দামও বেড়ে গেছে। এভাবে পত্রিকা বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের উচিত সংবাদপত্রের পাশে দাঁড়ানো। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কুমিল্লায় দৈনিকগুলোর উচিত হবে অফসেট কাগজের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে নিউজপ্রিন্টে চলে আসা। এতে করে আমাদের এ অঞ্চলের  সংবাদপত্র দীর্ঘসময় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।’

মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়