ঢাকা     রোববার   ২৪ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪৩৩ || ৭ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ডিএসসিসির পশুর হাট ইজারা

কেউ দিল কোটি টাকা বেশি, কেউ পেল সরকারি দরেই

আসাদ আল মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:০৪, ২৪ মে ২০২৬   আপডেট: ০৯:০৫, ২৪ মে ২০২৬
কেউ দিল কোটি টাকা বেশি, কেউ পেল সরকারি দরেই

রাজধানীর একটি পশুর হাট। ফাইল ফটো।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীতে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীন বিভিন্ন হাটের ইজারা চূড়ান্ত হলেও পুরো প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন। কোথাও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কয়েক কোটি টাকা বেশি দামে হাট ইজারা হয়েছে। আবার কিছু হাট একেবারে সরকারি দরেই বা নামমাত্র অতিরিক্ত মূল্যে বরাদ্দ পাওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কৌতূহল ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন পশুর হাট। সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যাপক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে হাটটির ইজারা শেষ পর্যন্ত ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় পান কাজী মাহবুব আলম হিমেল। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা বেশি দর ওঠায় বিষয়টি ব্যাপকভাবে নজর কাড়ে।

আরো পড়ুন:

একই ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠের হাটে। এক কোটি ১২ লাখ টাকা সরকারি মূল্যের এই হাটের ইজারা গিয়ে ঠেকেছে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। হাটটি পেয়েছেন আমিনুর রহমান টিটু। অর্থাৎ সরকারি মূল্যের প্রায় তিন গুণ বেশি দর উঠেছে সেখানে। 

এছাড়া, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব মাঠের হাট ৩ কোটি ১ লাখ টাকা এবং আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার হাট ২ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে, যা নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি। 

কিছু হাটের ইজারা নিয়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন। ডিএসসির একাধিক কর্মকর্তা ও দুইজন হাটের সাবেক ইজারাদার জানান, যেসব হাটে সাধারণত তীব্র প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা, সেখানে অবাক করার মতোভাবে সরকারি মূল্যেই ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। ওয়ারী রেজিস্ট্রি অফিসের পশ্চিম পাশের হাটটি মো. হাসান খান ৫০ লাখ টাকার সরকারি দরেই পেয়েছেন। সেখানে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ নেয়নি বলে জানা গেছে। একইভাবে মোহাম্মদী মোড় ও শিকদার রেজিস্ট্রি সংলগ্ন দুটি হাটও মাত্র কয়েক হাজার টাকা বেশি মূল্যে ইজারা হয়েছে।

গত ৩ বছর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হাতে থাকা শাহজাহানপুর, পোস্তগোলা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের হাট এবার হাতবদল হয়েছে।  

ডিএসিসি সূত্র বলছে, তিনটি হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা বাদ পড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে- মূল পে-অর্ডার জমা না দেওয়া।

২০২৬ সালের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১১টি হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে।

হাটগুলোর সরকারি মূল্য, ইজারা মূল্য ও ইজারাদারের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড় 
ইজারাদার: কাজী মাহাবুব মাওলা হিমেল (শ্যামপুর)
সরকারি মূল্য: ২ কোটি ৭১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৭ টাকা
ইজারা মূল্য: ৪ কোটি ১ লাখ টাকা।

২. উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব
ইজারাদার: আনিসুর রহমান টিপু (শান্তিনগর)
সরকারি মূল্য: ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা
ইজারা মূল্য: ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

৩. আমুলিয়া মডেল টাউন
ইজারাদার: মো. জয়নাল আবেদীন (ডেমরা)
সরকারি মূল্য: ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা
ইজারা মূল্য: ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

৪. শিকদার মেডিকেল সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ
ইজারাদার: মেসার্স সাফি এন্টারপ্রাইজ (গ্রীন রোড)
সরকারি মূল্য: ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ৪ কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার টাকা।

৫. কাজলা ব্রীজ হতে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পাম্প পর্যন্ত
ইজারাদার: কে. বি. ট্রেড, প্রো. মো. শামীম খান (যাত্রাবাড়ী)
সরকারি মূল্য: ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

৬. মোস্তমাঝি মোড় সংলগ্ন গ্রীন বনশ্রী হাউজিং
ইজারাদার: মো. গোলাম হোসেন (বাসাবো)
সরকারি মূল্য: ৭০ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকা।

৭. ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ
ইজারাদার: মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন (কমলাপুর)
সরকারি মূল্য: ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ৩ কোটি ১ লাখ টাকা।

৮. গোলাপবাগস্থ আউটফল স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশ
ইজারাদার: বারাকা এন্টারপ্রাইজ, প্রো. মো. আমির হোসেন
সরকারি মূল্য: ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৪ টাকা
ইজারা মূল্য: ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

৯. রহমতগঞ্জ ক্লাব
ইজারাদার: রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি (লালবাগ)
সরকারি মূল্য: ৬৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৭ টাকা
ইজারা মূল্য: ৭৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা।

১০. সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশ
ইজারাদার: কাজী ইমরান হোসেন (ওয়ারী)
সরকারি মূল্য: ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

১১. লালবাগ ২৪ নম্বর ওয়ার্ড বেড়ীবাঁধ সংলগ্ন শহীদ নগর কমিউনিটি সেন্টার
ইজারাদার: মনির খান হৃদয় (লালবাগ কেল্লার মোড়)
সরকারি মূল্য: ৫০ লাখ টাকা
ইজারা মূল্য: ৫০ লাখ টাকা।

মোট সরকারি মূল্য ছিল ১৮ কোটি ৫৭ লাখ ১৭ হাজার টাকা। মোট ইজারা আদায় হয়েছে ২৮ কোটি ৫৪ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অতিরিক্ত আয় হয়েছে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক দখল আর তদারকির অভাবে কোরবানির হাট এখন জনদুর্ভোগ। সমাধান একটাই স্বচ্ছ ইজারা, ডিজিটাল নিলাম আর কঠোর মনিটরিং।

ডিএসসিসি থেকে জানা গেছে, অনুমোদিত তালিকার বাইরে রাজধানীতে কোনো অবৈধ পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। এ জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি হাটে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইজারাদারদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, রাজধানীর বিভিন্ন হাটে ইতোমধ্যে দেশের নানা জেলা থেকে ট্রাকে করে গরু আসতে শুরু করেছে। যদিও এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বেচাকেনা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতারা আপাতত হাট ঘুরে পশুর দাম যাচাই করছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মূল বেচাকেনা শুরু হবে এবং হাটে ভিড় বাড়বে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। কোরবানির পশুর হাট ইজারার ক্ষেত্রেও যদি আগের মতো একই ধরনের প্রভাব ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সুবিধা চলতে থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রশ্ন থেকেই যায়।” 

তার মতে, অধিকাংশ হাট ঘুরেফিরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের লোকজনের হাতে যাওয়ার অভিযোগ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।

জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে পাঁচ দিনের জন্য অস্থায়ী পশুর হাট বসে। রবিবার (২৪ মে) থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির নির্ধারিত হাটগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পশু কেনাবেচা শুরু হবে। ঈদের দিন পর্যন্ত এসব হাট চালু থাকবে। এরই মধ্যে কয়েকটি হাটে পশু ওঠা শুরু হয়েছে।

কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) একটি সমন্বয় সভা করেছে। সভায় সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ছাড়াও বিভিন্ন হাটের ইজারাদার ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আর্থিক লেনদেন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পশু পাচার রোধের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

সভা শেষে ডিএমপির পক্ষ থেকে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগে হাট বসানো যাবে না এবং হাটের সীমানা বাড়ানোও নিষিদ্ধ। প্রতিটি হাটে কন্ট্রোল রুম, ওয়াচ টাওয়ার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা, জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন এবং ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

ডিএমপি জানিয়েছে, ব্যবসায়ীরা কোন হাটে পশু আনবেন তা তারাই নির্ধারণ করবেন। তবে, এক হাটের পশু অন্য হাটে জোর করে নামানো যাবে না। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা ও অবৈধ প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে হাট এলাকায় পুলিশের নজরদারি জোরদার থাকবে।

সাধারণত পশুর হাটের ইজারাদারদের জন্য বেশ কিছু শর্ত থাকে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক এলাকায় হাট না বসানো, প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল না করা, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করা এবং নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট সম্প্রসারণ না করা। পাশাপাশি পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের নির্দেশনাও থাকে। তবে, বাস্তবে প্রায় প্রতি বছরই দেখা যায়, অনেক হাট সড়ক ও ফুটপাত দখল করে আশপাশের আবাসিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে যানজট বাড়ে এবং ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেছেন, “কেউ শর্ত ভঙ্গ করে হাট পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের চলাচল ও যানজট যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সে জন্য পুলিশকে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়