ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৯ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৬ ১৪৩৩ || ২৩ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

নরসিংদীতে বৃদ্ধা মাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগ সন্তানদের বিরুদ্ধে

নরসিংদী প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৩, ৯ জুন ২০২৬   আপডেট: ১৬:৩৮, ৯ জুন ২০২৬
নরসিংদীতে বৃদ্ধা মাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার অভিযোগ সন্তানদের বিরুদ্ধে

ছবি: রাইজিংবিডি

জন্মদাত্রী মায়ের চেয়ে পৃথিবীতে আপন আর কেউ নেই। সেই মাকে ঘিরেই সন্তানের পৃথিবীর সমস্ত সুখ আবর্তিত হওয়ার কথা। কিন্তু কলিযুগের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় তিলে তিলে বড় করা আদরের সন্তানেরাই যখন বৃদ্ধা ও অসুস্থ মাকে ঘর থেকে বের করে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তখন মানবতার মাথা হেট হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এমনই এক বুকফাটা ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল নরসিংদী শহর।

আরো পড়ুন:

৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা আমেনা বেগম। এই বয়সে যখন তার থাকার কথা ছিল সন্তানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, নাতি-নাতনিদের কোলাহলে; তখন তার ঠিকানা হয়েছে নরসিংদী শহরের সাতিরপাড়া মাঠের পাশের এক ভাগাড়ে। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে ভরা রাস্তার পাশে একটি পলিথিন ও বাঁশের তৈরি ভাঙা ঝুপড়ি ঘরে কোনোমতে বেঁচে আছেন এই জননী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আমিনা বেগমের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের নাম রুবেল এবং মেয়ের নাম রোকসানা। জীবনের সমস্ত প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন এই মা। ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। কিন্তু সন্তানরা নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতেই ভুলে গেছেন মায়ের ঋণ।

ছেলে রুবেল বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে বর্তমানে থাকেন রাজধানী ঢাকায়। অন্যদিকে মেয়ে রোকসানারও বিয়ে হয়ে গেছে, তিনি ব্যস্ত নিজের সংসার নিয়ে। মা যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন এবং নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন, ঠিক তখনই তার কপালে জুটেছে চরম অবহেলা ও নিষ্ঠুরতা। অভিযোগ উঠেছে, নিজের আপন সন্তানরাই এই ৭০ বছরের বৃদ্ধা অসুস্থ মাকে ঘরে ঠাঁই দেননি। আশ্রয়হীন আমিনা বেগম নিরুপায় হয়ে নরসিংদীর সাতিরপাড়া এলাকায় এসে এই ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ঠাঁই নিয়েছেন।

আমেনা বেগম বলেন, “পৃথিবীতে সন্তান থেকেও আজকে তারা কেউ নেই আমার পাশে। আমাকে তারা সরিয়ে দিয়েছে। আমার খুব কষ্ট হয় রাস্তায় থাকতে।” 

সাঠিরপাড়া মাঠের পাশের এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় পথচারী এবং এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সমাজ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় এক বাসিন্দা রুবেল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে দেখি এই বৃদ্ধা মা প্রচণ্ড গরমে আর দুর্গন্ধে ছটফট করছেন। যে সন্তানকে এত কষ্ট করে বড় করলেন, সে কীভাবে নিজের মাকে এভাবে ডাস্টবিনের পাশে ফেলে রেখে ঢাকায় বউ নিয়ে ফুর্তি করে? এদের কি বিচার হবে না?”

মাঠের পাশে দোকানদার মো. ফরিদ মিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মাঝেমধ্যেই উনি অসুস্থতায় গোঙাতে থাকেন। আমরা এলাকাবাসী যতটুকু পারি ওনাকে একটু-আধটু খাবার বা পানি দিয়ে সাহায্য করি। কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষের কি এভাবে রাস্তায় থাকা সম্ভব? এটা কোনো সন্তানের কাজ হতে পারে না। আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি, এই কুলাঙ্গার সন্তানদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”

এই অমানবিক ঘটনার বিষয়ে আমিনা বেগমের ছেলে রুবেল এবং মেয়ে রোকসানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। মায়ের এই করুণ দশা এবং বাসা থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হয়। কিন্তু বারবার চেষ্টা করার পরেও তাদের কাউকেই ফোনে পাওয়া যায়নি এবং তারা কল রিসিভ করেননি। ফলে এই বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বৃদ্ধা আমিনা বেগম এখন সাতিরপাড়ার সেই ঝুপড়ি ঘরে শুয়ে দিন গুনছেন শেষ পরিণতির। তার চোখে এখন আর সন্তানদের জন্য ক্ষোভ নেই, আছে কেবলই এক বুক শূন্যতা আর জলভারাক্রান্ত দৃষ্টি।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল আইনের ভয় দেখিয়ে নয়, বরং নৈতিক অবক্ষয় রোধে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা জরুরি। একইসঙ্গে, অসহায় এই মায়ের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং বিত্তবানদের দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নরসিংদীবাসী।

ঢাকা/হৃদয়/ফিরোজ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়