ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

তৈমুর রেজার মুভিরিভিয়্যু

‘মনের মানুষ’: ভদ্রলোকের বাউলিয়ানা

তৈমুর রেজা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:০২, ১৮ নভেম্বর ২০১২  

বাউল সাধনা কী পদার্থ? এই প্রশ্নের বিচিত্র সব উত্তর ভদ্রলোক সমাজে এতদিনে চালু হয়েছে। একদম গোড়ার দিকে এর একটা জবাব দেবার চেষ্টা করেছেন অক্ষয় কুমার দত্ত। ১৮৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়-এর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ঘরানা হিসেবে বাউলদের কথা এসেছে। বাউলদের সাধন-ভজনের প্রণালী কেমন? অক্ষয় কুমার জানাচ্ছেন:

প্রকৃতি-সাধনই ইহাদের প্রধান সাধন। ইহারা একটি প্রকৃতি লইয়া বসবাস করে এবং সেই প্রকৃতির সাধনাতেই চিরদিন প্রবৃত্ত থাকে। ঐ সাধন-পদ্ধতি অতীব গুহ্য ব্যাপার। উহা অন্যের জানিবার উপায় নাই। জানিলেও পুস্তকে সবিশেষ বিবরণ করা সঙ্গত নহে। কামরিপুর উপভোগের প্রকরণবিশেষ দ্বারা উহার শান্তি সাধন করিয়া চরমে পরম পবিত্র প্রেম মাত্র অবলম্বন করা ঐ সাধনের উদ্দেশ্য।

অক্ষয় কুমার বাউলদের এই গুহ্য সাধনার ‘চারিচন্দ্র ভেদে’র দিকটিতে মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর বরাতে পাওয়া সবচে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ‘শুনিতে পাই, এ সম্প্রদায়ের মধ্যে নর-মাংস-ভোজন ও শবের বস্ত্র সংগ্রহ করিয়া পরিধান করা প্রচলিত আছে।’ তবে নরঘাতক হিসেবে বাউল সমাজকে দাগিয়ে রাখতে তাঁর মতি হয়নি। তাই ফুটনোটে জানিয়ে রাখছেন, ‘ইহারা নরবধ করে না, মনুষ্যের মৃত দেহ পাইলে ভক্ষণ করিয়া থাকে।’

বাউলিয়ানার ওপর প্রথম ‘সরেজমিন প্রতিবেদন’ রচনার কৃতিত্ব মৌলবী আবদুল ওয়ালীর। ১৮৯৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সভায় বাউলদের নিয়ে তিনি এই বিখ্যাত প্রবন্ধটি পড়ে শোনান। লেখক জানাচ্ছেন, বাউলদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ, না-ছাঁটা চুল-দাড়ি, বীভৎস জীবনযাপন’ নিয়ে তাঁর অনেক দিনের কৌতূহল। নানারকম তত্ত্বতালাশ করেও ওদের ‘ঘৃণ্য জীবন ও চরিত্র সম্পর্কে’ বেশি কিছু জানার সুযোগ হয় নাই তাঁর। এরপর ঘটনাচক্রে তিনি এদের গুহ্য-সাধনা বিষয়ক একটি বই হাতে পান। এই বই পড়তে গিয়েই বাউলদের একটি ‘ভয়ানক’ দিক সম্পর্কে তিনি চেতন হয়ে ওঠেন। লেখকের ভাষ্যে:

রোগ সারানোর মতা, মধুর গান, অদ্ভুত অভ্যাস এবং সাময়িক উৎসব— এসবের মাধ্যমেই তারা অন্যদের কাছে পরিচিত। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবার উদ্দেশ্যেই তারা গোপনে অনেক পুরুষ ধরে ঘৃণা, অপরাধ, লজ্জা ও নোংরামির জীবন যাপন করে চলেছে— এমন সন্দেহ সাধারণত কেউই করে না।

বাউলদের এই ‘ঘৃণা, অপরাধ, লজ্জা ও নোংরামি’র গোপনীয় জীবন বহুকাল ভদ্রলোকদের তাড়া করে ফিরেছে। এই তাড়া খাওয়া ভদ্রলোকদের মধ্যে সবার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম করা দরকার। রবীন্দ্রনাথ বাউল অনুরাগী বলে প্রসিদ্ধ হয়েছেন, দুবার বক্তৃতা দিতে গিয়ে ঘটা করে বাউল দর্শনের সুখ্যাতি করেছেন। বাউল সাধনা সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস— ‘ওদের গানই হলো...ওদের সাধনার একমাত্র রূপ’। ফলে, এই সাধনার যে দিকটা ‘অসাঙ্গীতিক’, এবং যে ভাগটা ‘লজ্জা ও নোংরামি’র— রবীন্দ্রনাথ সেদিকে ঘুণাক্ষরেও মাড়াননি। এই ভাগটা সম্পর্কে আন্তরিক ঘৃণা ও সন্দিগ্ধতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

একদা পাড়াগাঁয়ে যখন বাস করতুম তখন সাধু সাধকের বেশধারী কেউ কেউ আমার কাছে আসতো; তারা সাধনার নামে উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয়চর্চার সংবাদ আমাকে জানিয়েছে। তাতে ধর্মের প্রশ্রয় ছিলো। তাদেরই কাছে শুনেছি এই প্রশ্রয় সুরঙ্গপথে শহর পর্যন্ত গোপনে শিষ্যে প্রশিষ্যে শাখায়িত। এই পৌরুষনাশী ধর্মনামধারী লালসার
লোলতা ব্যাপ্ত হবার প্রধান কারণ এই যে, আমাদের সাহিত্যে সমাজে সেই-সমস্ত উপাদানের অভাব যাতে বড়ো বড়ো চিন্তাকে, বুদ্ধির সাধনাকে, আশ্রয় করে কঠিন গবেষণার দিকে মনের ঔৎসুক্য জাগিয়ে রাখতে পারে।

ফলে, এই ‘পৌরুষনাশী ধর্মনামধারী লালসার লোলতা’র ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রশ্রয় ছিলো না। কিন্তু বেগতিক ব্যাপার হলো, এই লোলুপ-শ্রেণীর বাউল গাতকেরা অপূর্ব কিছু গান লিখেছেন। এসব গান কিছুতেই ফেলে দেওয়া যায় না। এই ‘বিপরীতের টান’ সামলাতে রবীন্দ্রনাথ বাউলদের দুই শ্রেণীতে ভাগ করছেন— খাঁটি বাউল আর শখের বাউল। ফলে দুরকম বাউল গানও পাওয়া গেল— অমূল্য ও সস্তা। শখের বাউল বেশধারী, অকম্মার ধাড়ি। আর খাঁটি বাউলের লক্ষণ হলো, অসাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কারবিরোধিতা, অহিংসা— এসব ভালো ভালো গুণ। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের লেখালেখিতে ‘চারিচন্দ্রের ভেদ’-এর মতো ‘বীভৎস ব্যাপার’ পুরোপুরি অনুপস্থিত।

রবীন্দ্রনাথের এই ভাগজোকের ফলে ভদ্রলোকের জগতে ‘বাউলিয়ানা’ একটি বিশেষ গড়ন লাভ করলো। এই বাউল খৎনা করা নতুন বাউল। রবি-রশ্মির আলোকে অনেক ভদ্রলোক ঠিক করলেন, বাউলদের যৌন জীবনে যে একটা লজ্জা ও নোংরামির দিক আছে সেই পাপ থেকে ওদের রেহাই দিতে হবে। পাশাপাশি ‘সাচ্চা সেক্যুলার’ হিসেবে গড়ে-পিটে নেওয়া লাগবে। এই রবীন্দ্রপথের কীর্তিমান পথিক ক্ষিতিমোহন সেন। তিনি অবশ্য লজ্জার মাথা খেয়ে কবুল করছেন যে, এদের দেহসাধনায় ‘চারিচন্দ্রের ভেদ অতি গোপন ব্যাপার এবং তাহা অতি বীভৎস’। তবে তাঁর ক্ষরিত হৃদয়ের সান্ত্বনা হলো, ‘চার চন্দ্রভেদও কায়িক ব্যাপার। তাহা হইতেও উচ্চতর ভাব-সাধনাওয়ালা বাউল আছেন।’ এই উচ্চতর ভাব-সাধনওয়ালা বাউলরা জরুর জানেন যে:

চারিচন্দ্রের ভেদ প্রভৃতি স্থুল কায়াসাধনও সেই চিন্ময় পথ তো নহে। আসলে আপনার মধ্যে বিশ্বের পরিচয় এবং যোগও এক চিন্ময় ব্যাপার। ইহাকে বাহ্যরূপে পরিণত করিতে গেলেই বিপদ। চারিচন্দ্রের ভেদ হইলো তন্ত্রের ও যোগশাস্ত্রের দাসত্ব।

চারিচন্দ্র ভেদের মাথা মুড়িয়েই তিনি ক্ষ্যান্ত হন নাই। বাউল সাধনার মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের যুক্ত সাধনার একটি অপূর্বও মূর্তিও দেখতে পেয়েছেন। এসব ঘটনা ঘটছে দেশভাগের ঠিক আগে-আগে, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি যখন একেবারে তলানিতে নেমে গেছে। এই নিদানকালে বাউল দর্শনের মধ্যে সেকুলার ভাবকল্প আবিষ্কার করার মাধ্যমে তিনি খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি সদর্থক চর্চাকে উস্কে দিলেন।

বাউলিয়ানার ডিসকোর্সে এই অদল-বদলটুকু বেশ ভালো করে খেয়াল করা দরকার। প্রথম পর্যায়ে অক্ষয় কুমার ও আবদুল ওয়ালির মতো গবেষকরা বাউল সাধনা সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে তত্ত্ব-তালাশ নিতে শুরু করলেন। দেখা গেল, এই তরিকার সাধুরা উত্তম গান করেন বটে, কিন্তু এঁদের যৌন-রুচি অতি বীভৎস। তাই যৌনরুচি কিছুটা গড়ে-পিটে নেওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর ছাহাবিদের হাতে এই রূপান্তর শুরু হলো। ‘চারিচন্দ্র ভেদ’ ধুয়ে-মুছে তাঁদের সেক্যুলার ভাবমূর্তিকে দেবালয়ের প্রদীপ হিসেবে তুলে ধরা হলো।

২.
গৌতম ঘোষের বানানো মনের মানুষ (২০১০) ছবিতে বাউলিয়ানার যে পরিবেশন হচ্ছে তাতে বেশ মোটা হরফেই এই নির্মিতির ছিলছিলা পাওয়া যাবে। বাউলিয়ানার পরিবেশনে দুটো দিকের প্রতি এই সিনেমা মনোযোগ দিয়েছে: এক, বাউলের যৌনজীবন; দুই, সেক্যুলার দর্শন। রবীন্দ্রনাথ ও ক্ষিতিমোহনের হাতে সেকুলার ভাবাদর্শ ও ভদ্রলোকী যৌন নৈতিকতার আদলে বাউলের যে মনপসন্দ প্রতিমা গড়া হয়েছিল তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে এই ছবিতে। আমাদের বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, মনের মানুষ ছবিতে বাউলিয়ানার যে ভদ্রলোকী ডিসকোর্স উৎপাদিত হচ্ছে তাকে একবার পরখ করে দেখা। এই ডিসকোর্স কী অর্থ উৎপাদন করে? প্রচলিত ডিসকোর্সের সঙ্গে এর ঐক্য ও ভেদের জায়গাটি কোথায়? বলে রাখা দরকার, বাউলিয়ানার ভদ্রলোকী ডিসকোর্সের কোনো সামগ্রিক পর্যালোচনা হাজির করা এখানে আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কেবল মনের মানুষ ছবির ভাষ্যটি বুঝতে গেলে যেটুকু আলোচনা করে নেওয়া প্রাসঙ্গিক তার মধ্যেই আগ্রহ সীমিত রেখেছি।

৩.
বাউল দর্শনে কায়া-সাধনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অন্তত বাউল তরিকার যেসব গান আমাদের হাতে রয়েছে তাতে অনায়াসে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। রবীন্দ্রনাথ এই কায়া-সাধনার ব্যাপারটি পুরোপুরি চেপে গেছিলেন— ইতোমধ্যেই সেকথা আমরা বলেছি। মনের মানুষ ছবিতে এই ‘লজ্জা ও নোংরামি’র অধ্যায়টা একেবারে বাদ পড়েনি। ছবির শুরুর আধ ঘণ্টার মধ্যেই দেহ-সাধনার প্রথম ইঙ্গিত পেয়ে যাচ্ছি আমরা। লালন গুরুবাক্য অমান্য করে নিজের বাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু জাত খোয়ানোর অপরাধে বাড়িতে তার জায়গা হচ্ছে না। সে বার-বাড়িতে একটা গাছের তলায় বসে জিরাচ্ছে। লালনের প্রথম জন্মের বউ এসেছে সানকিতে করে ভাত নিয়ে। গোগ্রাসে ভাত খেতে খেতে লালন এতকাল অজ্ঞাত থাকার কৈফিয়ত এবং নতুন ফুসলানি দিচ্ছে বউকে:

লালন: আমারে মাফ করে দে। আমার কিছু মনে ছিলো না রে বউ। যখন মনের কপাট খুললো ফকিরি নিলাম। আমার গুরু গোসাইয়ের মানা ছিলো। অতীতে ফিরিস না লালন। কিন্তু কী করি। বড় সাধ জাগলো যে তোরে দেখার। আমার সাধনসঙ্গিনী হবি? যাবি আমার সাথে? এমন এক দেশে যাব যেথা হিন্দু-যবন বিচার নাই। যেথা এক চাঁদে হয় জগত আলো...।

কায়া-সাধনার ইঙ্গিত এখানে মোটামুটি স্পষ্ট। বাউলতত্ত্বে যুগল সাধনার রীতি। সেই রীতি অনুসারে লালন নিজের সাধনসঙ্গিনী হতে বউকে অনুরোধ করছে। বউ এ-কথার উত্তরে ‘ভয় করে’ জানালেও তার নিমরাজি ভাবটা চাপা থাকে না। কিন্তু অকস্মাৎ লালনের মা এসে পড়ায় ষড়যন্ত্র পণ্ড হয়ে যায়। বিফল মনোরথ লালন সিরাজ সাঁইয়ের আখড়ায় ফিরে আসে। হতোদ্যম লালন বাড়ি ফেরার পর কায়া-সাধনার দ্বিতীয় উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। এই উল্লেখ আগের তুলনায় বেশ স্পষ্ট, খোলামেলা। বাড়ি ও বউয়ের জন্য লালনের বেচইন দশা দেখে সিরাজ সাঁই বুঝে ফেলেছে, লালনের এখন একটা কায়াসঙ্গিনী লাগে। সে ময়ূর বলে একটি মেয়েকে ডাক দেয়। ময়ূরের যে দার্শনিক ভেদ সিরাজ সাঁইয়ের মুখে শোনা গেল সেটা এরকম: ময়ূরের রঙ হলো গিয়ে নীল। আর ঠোঁট দুইটা লাল। নীল মানে ইর্ষা, আর লাল মানে কামনা। নারীর অন্তরে থাকে ইর্ষা আর চক্ষুতে কামনা।

ময়ূরের অভিব্যক্তির মধ্যে আমরা কায়াসাধনার প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছি। গুরুর আদেশে ময়ূর এসেছে— কায়াসঙ্গিনী হবে। তার দেহ-ভাষা ও মুখের অভিব্যক্তি তার ‘কামাতুরা’ দশার জানান দিচ্ছে। ফলে, কায়াসাধনার জন্য ময়ূরের প্রস্তুতির মধ্যেই কায়াসাধনা কী বস্তু তার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। গুরুর হুকুম পাওয়ামাত্র ময়ূর লালনকে বাহু-পাশে গ্রেফতার করে হাঁটা দেয়। গুরু তখন লালনকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেবে বলে পিছু ডাকে। তার উপদেশের সারার্থ মোটামুটি এরকম: ‘যে কর্মে লিপ্ত হতে চলেছিস তার পরিণাম কিন্তু ভয়ঙ্কর। তোর সাধনা এই ভয়ঙ্কর থেকে পরমানন্দ হয়ে সংগ্রহ করা’। নারী সংসর্গের বিপদ সম্পর্কে তার মতামত: নারী ‘সৃষ্টি ও স্থিতির জননী। আবার লয় বিলয়ের মহা শক্তি স্বরূপিনী।’ এই কারণেই ‘নারীর সঙ্গে লীলা সহজ কাম নয়’। সিরাজের সর্বশেষ উপদেশ হচ্ছে, ‘বিন্দু সাধনই প্রেম সাধন’। এরপর সিরাজ ময়ূরের দেহভঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা ইঙ্গিত করলে লালন ময়ূরের বাহুবন্ধনে টলতে টলতে শোবার ঘরের দিকে যেতে থাকে।

এই দৃশ্য থেকে কায়াসাধনার ওপর বেশ মালমশলা পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার বিবরণে কয়েকটা বিষয় বেশ স্বচ্ছভাবে নজরে এসে যায়। প্রথমত, সাধনা এখানে একতরফাভাবে পুরুষের। নারী এই সাধনার ক্ষেত্রে ‘অবজেক্ট’ হিসাবে ভূমিকা পালন করে; বলা যায়, যোগালি দেয় মাত্র। ফলে, সাধনার কঠিন সোপান নারীর জন্য পুষ্পশয্যা মাত্র। সাধিকা হিসেবে যথেষ্ট মাত্রায় কামাতুরা হওয়া এবং সাধককে চার্জ করতে পারাটাই তার সঙ্গত ভূমিকা— ছবির রেপ্রিজেন্টেশনে সাধনা ও নারীর এমন একটি সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়।

পরবর্তী দৃশ্যগুলোতে অবশ্য কায়াসাধনার প্রসঙ্গটি বেশ ভিন্ন চেহারায় হাজির হবে। এই পরিবর্তিত রূপটিকে অনায়াসে ‘মেজর শিফট’ হিসাবে দাগিয়ে রাখা যায়। এক চন্দ্রালোকিত রাত্রে কমলি এসে লালনের ঘরে ঢোকে। এসময় তাদের মধ্যে যে বাতচিৎ ঘটে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ছবির কায়াসাধনার ডিসকোর্সটি বোঝার জন্য। কমলি পুছ করছে লালনকে:

‘আমার গান শুনতি আসরে আইলা না ক্যান?’
‘শুনছি তো দূর থেইকা। গানডা ভুলি গেছিলাম। প্রেমপিরিতির গান। কাম থেকে নিষ্কাম প্রেম।’
‘প্রেম কেমনে নিষ্কাম হয় সাঁই? তুমিই তো কইছো, প্রেম সাগরে ফাপরে ওঠে কাম নদীর তুফান।’
লালন এর উত্তর দিচ্ছে এই বলে: ‘কাশেম কই?’

এখানে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য বলে নেওয়া দরকার। লালন যে নতুন আশ্রম খুলেছে আনন্দবাজার নামে তার একঘর বসতি হচ্ছে কমলি। কমলির খসম কাশেম তুলনামূলক বয়স্ক, রোগা, নির্জীব ধরনের মানুষ। কমলি রূপবতী, এবং লক্ষণীয়ভাবে যৌনআবেদনময়ী। কমলির প্রশ্নের উত্তরে লালন যেভাবে কাশেমের খোঁজ নিতে ব্যাগ্র হয়ে ওঠে তাতে নিশ্চয়ই মনে হয় যে, এই জটিল ও দূরারোগ্য সওয়ালের উত্তর বাউল দর্শনে নাই। কিন্তু বাউল দর্শনে নিষ্কাম প্রেম একটি বহুলচর্চিত সমস্যা। আর এর সুনির্দিষ্ট উত্তরও আছে বাউল কাল্টে। মনের মানুষ সেই উত্তরকে এড়িয়ে নিষ্কাম প্রেমকে একটি ‘অমীমাংসিত সমস্যা’ হিসেবে পরিবেশন করে। এই পরিবেশনা বাউল দর্শনের একটি ভ্যালিড ক্রিটিসিজম হিসেবে দর্শকের সামনে হাজির হয়।

এই বাতচিতের পরবর্তী অংশটুকু আরো বেশি তাৎপর্যমূলক। লালনের ‘কাশেম কই?’ প্রশ্নে দারুণ অনুপ্রাণিত কমলি ফুঁসে ওঠে:
‘সে ঘুমায়। অজ্ঞানের মতো। আর আমি, আমি জ্বলি মরি। আমার জ্বালা মিটাও সাঁই।’ বলতে বলতে কমলি লালনকে জ্বালা মেটানোর কর্তা-জ্ঞান করে আকুল জড়িয়ে ধরে। কিন্তু যথোচিত সাড়া না পেয়ে ব্যথা ও বিস্ময়ের সঙ্গে পুছ করে: ‘তুমি কি পাথর? তোমার কামনা বাসনা নাই?’
‘থাকবে না ক্যান? সব মানুষের যেমন থাকে।’ লালন দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দেয়। কমলি তখন লালনের নিম্নাঙ্গের দিকে মনোযোগী হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে লালনের উত্থিত শিশ্ন উপলব্ধি করে হেসে ওঠে: ‘এই তো, তোমার কাম জাগছে। তোমার বাসনা আছে ষোল আনা। তুমি ভাবের ঘরে চুরি করো সাঁই। আমারে শান্ত করো।’
লালন বেশ দাঁত চেপে এর উত্তরে বলছে: ‘শরীর জাগে শরীরের নিয়মে। মন যদি না জাগে?’
শরীর ও মনের যে পার্থক্যের কথা লালন এখানে কমলিকে শোনাচ্ছে বাউল দর্শনে সেরকম কোনো পার্থক্যের অস্তিত্ব নাই। দেহ ও মনকে আলাদা সত্তা বলে ভাবার যে কার্তেসীয় প্রচল পশ্চিমা দর্শনে আছে বাউল দর্শনে সেই মাল পুরোপুরি অনুপস্থিত। ভদ্রলোকের বাউলিয়ানা বলে কী বস্তু বুঝতে হবে ছবির এই অংশটি তার জন্য বেশ দরকারি কাঁচামাল। নর-নারীর সংসর্গের সঙ্গে নিষ্কাম সাধনার কোনো সম্পর্ক নাই। বরং নিষ্কাম সাধনা ব্যাপারটাই একটা দুর্বল চিন্তা। সংসর্গ এখানে জ্বালা মেটানোর একটা সিদ্ধ পদ্ধতি। বাউল-সাধক লালন এই ধরনের সংসর্গের ব্যাপারে আর আগ্রহী না। এমনকি প্রাণপণে এরকম সাধনার থেকে জান-মাল রক্ষা করতে ইচ্ছুক। ফলে ‘কাম জাগা’র পরেও লালন দাঁতে দাঁত চেপে মন না জাগার অজুহাত দেয়। বলা বাহুল্য যে, বাউল-সাহিত্যে কায়াসাধনা প্রসঙ্গে যেসব ধ্যানধারণা বিরাজিত আছে তার সঙ্গে এই বাদবিসম্বাদের কোনো সম্বন্ধই নাই। কমলি-লালনের এই বাতচিৎ তাহলে সম্ভব হচ্ছে কী করে?

বাউলদের যৌনজীবন নিয়ে বহুকাল ধরেই ভদ্রসমাজে নানারকম ফ্যান্টাসি প্রচলিত আছে। এরকম একটি ফ্যান্টাসির কড়া সাবুদ পাওয়া যাচ্ছে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বিরচিত মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থে। লেখক বাউলদের সাধনপ্রণালী সম্পর্কে জানাচ্ছেন, ‘এই সমস্ত সাধনের প্রকৃতি এতো কদর্য্য ও অশ্লীল যে, আমরা এখানে তাহার কোনও একটি উদাহরণ পর্যন্ত উল্লেখ করিতে লজ্জাবোধ করিতেছি।’ এরপর তাঁর কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে বাউলদের ‘বীভৎস’ যৌন-জীবনের সম্পূর্ণ অজানা এক অধ্যায়। লেখক জানাচ্ছেন:

এই মুছলিম ভিক্ষোপজীবী নেড়ার-ফকির দলের পুরোহিত বা পীরেরা শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক গোপিনীদের বস্ত্র হরণের অনুরূপ এক অভিনয়ের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে। যখন পীর তাহার মুরিদানের গ্রামে তশরিফ আনেন, তখন গ্রামের সকল যুবতী ও কুমারী উত্তম বসনে সজ্জিতা হইয়া বৃন্দাবনের গোপিনীদের অনুকরণে একটি গৃহকে পীরের সহিত মিলিত হয়। ...এই সমস্ত নারীরা তাহাদের গাত্রাবরণ খুলিয়া ফেলিয়া সম্পূর্ণ উলঙ্গ হইয়া পড়ে  এবং ঘুরিয়া ঘুরিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে থাকে। পীর এখানে কৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং শ্রীকৃষ্ণ যেমন গোপিনীদের বস্ত্র হরণ করিয়া বৃক্ষে আরোহণ করিয়াছিলেন, তিনিও তদ্রূপ এই সমস্ত উলঙ্গ নারীর পরিত্যক্ত বস্ত্র তুলিয়া লইয়া
গৃহের একটি উঁচু তাকে রক্ষা করেন। ...কোনওরূপ সঙ্কোচ বোধ না করিয়া পীরের যৌন লালসা পরিতৃপ্ত করাই ইহাদের প্রধান ধর্মীয় কর্তব্য, তাহা বলাই বাহুল্য।

তাঁর লেখা থেকে আরো জানা যাচ্ছে, এসব ফকিরদের মধ্যে ‘ইচ্ছা পূরণ ভজন’ নামে ‘এক বিশেষ প্রকারের গোপন সাধন-রীতি’র কথা। আর এই সাধনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে:

ইহাতে কোন পুরুষ বা নারী তাহার নিজেদের বা দলের অপর কাহারো যৌন আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত করিতে ইতস্ততঃ বা কোনওরূপ লজ্জাবোধ করিবে না। এই উদ্দেশ্যে হতভাগ্য এই ফকির দলের নারী-পুরুষ সকল ভক্ত ‘আখড়া’ নামে একটি বিচ্ছিন্ন স্থানে আসিয়া মিলিত হইয়া নানা দ্রব্য সেবন করে এবং যাহাকে যাহার ইচ্ছা তাহার সহিত যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হইয়া তাহাদের নিগুঢ় সাধনা চালাইয়া যায়।১০

এই ফ্যান্টাসি নানা রূপে পল্লবিত হয়েছিলো। বাউল সাধকরা পরস্পর পরস্পরের স্ত্রীকে ব্যবহার করে— এমন একটা দৃঢ় প্রত্যয় দাঁড়িয়ে গেছিলো তখনকার ভদ্রসমাজে। আরেকটা যুক্তি তখন বেশ চাউর হয়েছিল যে ‘গাছ পুঁতে ফল খেতে হয়’। অর্থাৎ আপন কন্যা সঙ্গমে দোষের কিছু নেই। এরকম নানা ফ্যান্টাসি গত কয়েকশো বছরে যে কল্পতরু হিসাবে বিকশিত হয়েছে মনের মানুষ ছবিতে তার একটি প্রস্ফূটিত ছবি পাওয়া যাচ্ছে। ভদ্রলোকী পঠনে বাউলের কায়াসাধনা দেহের জ্বালা মেটানোরই একটা বর্বর পদ্ধতি। একে ‘নিষ্কাম প্রেম’ জাতীয় ভুগিজুগির মধ্য দিয়ে একটা ভাবাশ্রয়ী রূপ দেবার চেষ্টা হলেও সেই আস্তরণ ভারি ঠুনকো। আসল কথা হলো, নির্বিচার কামাচার। ভদ্রলোকের ‘প্রিয় গীতিকবি’ লালন এই কামাচারের মচ্ছব থেকে দূর অস্ত। সে শরীরের উত্থানের পাশাপাশি মনকে নিভিয়ে রাখতে সম, ফলে উঁচুদরের সাধক। কমলির ‘ইনডিসেন্ট প্রপোজাল’ ফিরিয়ে দেবার মাধ্যমে লালন গড় পুরুষ থেকে মহাপুরুষের স্তরে উন্নীত হলো।

যৌনতা ও কায়াসাধনা প্রসঙ্গে লালনের এই নতুন প্রণালীর দর্শনে ভাবনার অনেক খোরাক আছে। প্রথম জীবনের বউ ও ময়ূরের সঙ্গে কায়াসাধনার যে কল্পনা লালনের মনে পল্লবিত হচ্ছিলো সেটা কমলির যুগে এসে পুরোপুরি উপড়ে নেওয়া হয়েছে। লালন আর যুগল আরাধনা বা নিষ্কাম প্রেমের কঠিন সাধনে মনোযোগী না। এসবের অসারতা সম্পর্কে সে পুরোদমে হুঁশিয়ার। সে বরং কৃচ্ছতার একটি নতুন প্রণালী আবিষ্কার করেছে। শরীর এবং মনের মধ্যে একটি নতুন পার্থক্য আবিষ্কার করে নারীদেহের যৌন আবেদন তুচ্ছ জ্ঞান করাটাই এই সাধনার সাফল্য।

বাউল সাধনার মধ্যে এই ধরনের সাধন-ভজনের কোনো প্রণালীর ইঙ্গিত নাই। লালন ফকির তবে এই সাধনার উৎসাহ পাচ্ছে কোত্থেকে? এর উত্তর হিসাবে আমরা মহাত্মা গান্ধীর নাম করবো। যৌনতা ও নারীসঙ্গ বিষয়ক দুশ্চিন্তা গান্ধীর দর্শনের একটি মৌলিক দিক। গান্ধী যৌনতাকে একটি সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করেছেন, এবং এর নিদান হিসাবে ব্রহ্মচর্যকে ব্রত হিসাবে নিয়েছেন। ব্রহ্মচর্য বলতে গান্ধী কী বোঝেন তার একটা সদুত্তর মিলছে তাঁরই লেখা চিঠিতে। গান্ধীর আচার-বিচার সম্পর্কে যেসব অদ্ভুত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে তাতে ভারি উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর এক বয়স্য শিষ্যা গান্ধীকে এক পত্র দেন। এর জবাবে গান্ধী তাঁকে শোনাচ্ছেন:

আমার কাছে ব্রহ্মচর্য মানে হলো এই... যার কখনও কোনো যৌনলালসা নেই, যিনি ঈশ্বরের রাহে নিজেকে অবিরত সমর্পিত রাখার কারণে নির্বিঘ্নে নগ্ন হয়ে নগ্ন নারীর সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারেন, তাঁর মধ্যে কোনো অর্থেই
কাম-বাসনা জাগ্রত হয় না, সে নারী যতো রূপবতীই হোক না কেন। এরকম একজন ব্যক্তি মিথ্যা বলতে অক্ষম, অক্ষম যে কোনো পুরুষ বা নারীর ক্ষতি সাধনেও, তিনি নিরাসক্ত, তিনি মুক্ত ক্রোধ এবং বিদ্বেষ থেকেও।১১
(My meaning of brahmacharya is this...one who never has lustful intention, who by constant attendance upon God, has become capable of lying naked with naked women, however beautiful they may be, without being in any manner whatsoever sexually excited. Such a person should be incapable of lying, incapable of intending doing harm to a single man or woman, free from anger and malice and detached.)

বুঝতে তেমন অসুবিধা হবার কথা নয় যে, লালন আসলে ব্রহ্মচর্য লাভ করেছে। মহাত্মা গান্ধীর যৌনতার বিশ্বাস এখানে ছেঁউড়ের লালন ফকিরের ওপর সওয়ার হয়েছে। আমরা মনের মানুষ ছবিতে একজন গান্ধীবাদী লালনকে খুঁজে পাচ্ছি। তবে এমন নবরূপে লালনকে আবিষ্কারের পুরো কৃতিত্ব মনের মানুষ ছবিকে দিয়ে ফেলাটা একপেশে হবে। লালনকে ব্রহ্মচারী হিসাবে প্রথম দেখতে পেয়েছেন সম্ভবত লুৎফর রহমান। তাঁর লালন-জিজ্ঞাসা (১৯৮৪) বইতে লালনকে অবিবাহিত ব্রহ্মচারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।১২

ছবিতে আরো কয়েকবার কায়াসাধনার প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে এসেছে। এই আগে-পরের দৃশ্যগুলো থেকে কায়াসাধনার একটি সঙ্গতিপূর্ণ চিত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যেমন একটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, কমলির কামার্ত চাউনিতে অভিভূত হয়ে কালুয়া পাগলামি করছে। এই পাগলামি ঠেকাতে লালন গিয়ে কমলিকে কালুয়ার ‘নারীসঙ্গ’ মেটানোর বুদ্ধি দিচ্ছে। কিছুটা দোনোমোনো করলেও কমলি এতে রাজি হয়।

কালুয়ার নারীসঙ্গ লাগে— লালনের এই সিদ্ধান্ত ঠিক কায়া-সাধনার দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়। কমলির দেহের জ্বালা এখানে কালুয়ার দেহের জ্বালা হিসাবে পরিণতি পেয়েছে। লালন এই দেহের জ্বালা মেটানোর একটা উপায় হিসাবে কমলিকে সেবায়েত হিসাবে নিয়োগ দিচ্ছে। এই সংসর্গ যে কোনোভাবেই সাধনমূলক নয় তার সাবুদ আমরা পাচ্ছি কমলির জবানিতেই। নৌকা-ঘাটে একদিন লালনকে তীব্র অভিমান নিয়ে সে পুছ করে: ‘আমারে দীক্ষা দেওনি কেন? ক্যান দেওনি একজন সাধনসঙ্গী?’ কমলির মনে এই অভিমান উথলে উঠছে ভান্তির জন্য সাধনসঙ্গী জুটে যাবার পর। লালন ভান্তিকে নির্দেশ দিয়েছে: ‘যখন মন চায় সাজবা। আর করবা কামের সাধন। আমি তোমারে এক সাধক দেবো, যার তুমি সাধনসঙ্গিনী হবা।’ এবং প্রতিশ্রুতি মতো দুদ্দু শাহকে সাধনসঙ্গী হিসাবে লাভ করে ভান্তি। ভান্তির জন্য সাধনসঙ্গী জুটে যাওয়াতে কমলির মধ্যে বঞ্চনার বোধ তৈরি হয়েছে। নিজের জন্য সাধন-সঙ্গী না থাকার ব্যাপারে লালনকে অনুযোগ করার মাধ্যমেই কমলি নিজের এই ব্যাথা জানান দিয়ে ফেলছে। কিন্তু লালন তাতে সম্মত নয়। সে কমলিকে অভিমানের জন্য নিন্দা করে এবং শিমুলতলির মা জননী অভিধাতে ভূষিত করে।

ভান্তি ও দুদ্দু শাহ— এই সাধক-যুগলের সাধনার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। ছবিতে এদের দুজনকে সাধনার উপযুক্ত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হয়ে চিন্তিত-মুখে যুগল-সাধন করতে দেখা যায়। ছবিতে যেসব যৌন সম্পর্কের উল্লেখ নানাভাবে এসেছে তার মধ্যে এই যুগলের চর্চার সঙ্গেই কায়া-সাধনার সাদৃশ্য সবচে বেশি। ফলে, বাউল সমাজের কায়াসাধনা বলতে কী বুঝবো— তার নানারকম উত্তর হচ্ছে এই ছবি। এতে সন্দেহের মোটেই অবকাশ নেই যে, যৌনচর্চার ব্যাপারে কমলি, ভান্তি ও লালনের অবস্থান পৃথক। কমলির সাধনসঙ্গী পাওয়ার আশা নেই, ফলে কায়াসাধনা তার বেলাতে খাটছে না। কিন্তু তার জীবন অযৌন নয়, কালুয়ার নারীসঙ্গ মেটানোর ভার নেবার মাধ্যমে নিজের একটি যৌনজীবন সে তৈরি করে ফেলেছে। লালন প্রথম পর্যায়ে ময়ূরের সঙ্গে কায়াসাধনা করলেও পরের দিকে আর কায়াসাধক নয়। সে যৌনজীবনকে ছুটি দিয়ে ব্রহ্মচর্য বেছে নিয়েছে। আর ভান্তির প্রসঙ্গে ইঙ্গিত যতটুকু পাওয়া গেছে তাতে বাউল ঘরানার কায়াসাধিকা হিসাবে তাকে মোটামুটি শনাক্ত করা যায়।

এই ছবি তাই কায়াসাধনার সঙ্গতিপূর্ণ কোনো ভাষ্য হাজির করছে না। নানারকম চর্চা এবং অবস্থানের মাধ্যমে একটি জটিল ম্যাট্রিক্স তৈরি করে নিচ্ছে। এখানে সাধনার এজমালি পাটাতনের বাইরে কিছু ব্যক্তিক কুরছি তৈরি হতে দেখছি আমরা। যেমন, লালন বাদবাকি সাধকদের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করেছে। কমলি শিমুলতলির জননী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান পাচ্ছে। ফলে, গৌতম ঘোষের বিনির্মাণে বাউলের যৌনজীবন বহুত্ব ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লাভ করছে।

৪.
গত কয়েক দশক ধরে ভদ্রলোকী পরিসরে লালন ফকিরের রেপ্রিজেন্টেশনে একটা দিক বেশ লক্ষণীয়। প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে সেকুলার ভাবাদর্শের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন লালন। জাতীয় সংহতি জোরালো করার মাধ্যমে সেকুলার মতাদর্শ জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপারেটাস হিসেবে কাজ করে। ভদ্রসমাজে লালনের মহাত্মা হয়ে উঠবার পেছনে এই সেকুলার রাজনীতিই সম্ভবত প্রধান প্রেরণা। মনের মানুষ ছবিতে আমরা এই ডিসকোর্সের প্রতিফলন দেখতে পাবো। এ প্রসঙ্গে ছবির নির্মাতা গৌতম ঘোষের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন পিকক জেতার পর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গৌতম জানাচ্ছেন:

আমি আসলে প্রথম লালনের কথা ভাবি, বা গৌণধর্মীদের নিয়ে কাজ করার কথা ভাবি বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পর এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগার পর। আমার তখন মনে হচ্ছিলো, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে কী ছবি
করবো— রক্তাক্ত, বিচ্ছিরি, মারামারি, কাটাকাটি। এমন কিছু নিয়ে ছবি করবো যে মানুষকে দেখানো আমাদের একটা কম্পোজিট কালচার। তখন আমার লালনের কথা মাথায় আসে। আমি লালনকে নিয়ে কিছু গবেষণা করি। তখন এটা নিয়ে কিছু করা হয়নি। তারপরে ২০০৮ সালে সুনীলদা লিখলে একটা প্লট পেয়ে গেলাম। মনে হলো এখনকার সময়টাতে লালন আরো প্রাসঙ্গিক। কারণ সমস্ত পৃথিবী জুড়ে একটা অসহিষ্ণুতা, ইনটলারেন্স দেখতে পাচ্ছি আমরা। রিলিজিয়াস ইনটলারেন্স, পলিটিক্যাল ইনটলারেন্স।১৩

এই বক্তব্যে কয়েকটি দিক বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার। লালনকে নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছেন গৌতম অনেককাল আগে— বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার ফলে যে ভয়াবহ দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল তারই পটভূমিতে এই ছবি নিয়ে ভাবাভাবি শুরু হচ্ছে। দাঙ্গার মতো একটা ‘রক্তাক্ত, বিচ্ছিরি, মারামারি, কাটাকাটি’র বিষয় নিয়ে ছবি না করে তিনি বরং দেখাতে চান আমাদের একটা ‘কম্পোজিট কালচার’। তখনই লালনের কথা মনে আসছে তাঁর। যে বিভক্তির পটভূমিতে দাঙ্গার রক্তাক্ত পরিস্থিতির সূচনা তার মোকাবিলা করতে হলে লালন ফকির বেশ ভালো আইকন হতে পারেন। দাঙ্গার বিরুদ্ধে এমন একটি ছবি তৈরির বাসনা তাঁর যা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির অসারতাকে স্পষ্ট করে তুলবে।

২০০৮ সালে এসে তাঁর হাতে পড়ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনের মানুষ উপন্যাসটি। মনে রাখতে হবে, উপন্যাস হাতে আসার অনেক আগেই কিন্তু ছবির থিম ঠিক হয়ে আছে। শুধু প্লটটা নেওয়া হচ্ছে সুনীলের বই থেকে। গৌতম বিস্মিত হয়ে দেখছেন, দাঙ্গা হয়তো থেমে গেছে অনেককাল আগেই, কিন্তু এখনকার পৃথিবীতে এই ছবির প্রাসঙ্গিকতা বরং আরো বেড়েছে। যে ইনটলারেন্সের বাতাবরণ আমাদের জীবনের বিচিত্র ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে লালনকে স্মরণ করা বেশ কাজের কথা হয়।

এখানে গৌতমের লালন-বীক্ষা বেশ ঘনিষ্ঠভাবেই রবীন্দ্রনাথ বা ক্ষিতিমোহনের টীকা-ভাষ্য দ্বারা অনুপ্রাণিত। কম-বেশি একশ বছরের এই ডিসকার্সিভ নির্মিতির মধ্য দিয়েই বাউলিয়ানার এই সেকুলার কল্পতরু এখনকার জাতীয়তাবাদী ন্যারেশনের১৪ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে, ভদ্রলোকী ডিসকোর্সে বাউলিয়ানার সেকুলার রেপ্রিজেন্টেশনের একটি হালফিল নমুনা হিসেবে এই ছবিটাকে পাঠ করা উচিৎ। সেই দিকে আমরা কিছুটা মনোযোগ দিচ্ছি।

মনের মানুষ ছবির গোড়া থেকেই জাত-পাত নিয়ে খুচরা-খাচরা আলাপের ভাপ উঠতে শুরু করে। তরুণ লালন কব্‌রেজের সঙ্গে তীর্থে যাবার পথে জলবসন্তে আক্রান্ত হলো। আশা নাই ভেবে মৃতপ্রায় লালনকে কলার ভেলায় করে জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়। মুসলমান রমণী রাবেয়া তাকে খুঁজে পেয়ে সেবাযত্ন করে প্রাণ বাঁচাচ্ছে। এসময় ‘বেজেতে লালন’কে যবনের ঘরের অন্ন খাওয়ানো উচিৎ হবে কিনা— এই সূত্রে প্রথম জাতের প্রশ্ন সামনে এলো। এর ঠিক পর পরই লালন ফকিরের মুখে আমরা শুনছি:

আছে হিন্দু মুসলমান দুই ভাগে
বেহেস্তের আশায় মুমিনগণ
হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন
ভেস্ত-স্বর্গ দুই-ই সমান।

সিরাজের এই গান স্মরণ করার পর লালন জাত প্রসঙ্গে নিজের ধারণাটি খোলাসা করে বলছে, ‘এই দুনিয়ায় দুইটাই জাত। পুরুষ আর নারী। বাকি সব মানুষের অনাসৃষ্টি। আমার গুরু শিখাইছিলেন। সিরাজ সাঁই। আমার প্রাণের মুর্শিদ।’ এরপর সিরাজ সাঁই স্বয়ং তাঁর গানের মধ্যে জাত-পাতকে আরো হাল-ফ্যাশনের প্রশ্ন দিয়ে বিদ্ধ করছেন:

বোল খোদা বোল খোদা বোল
জলের উপর পানি না পানির উপর জল
জমির পরে আসমান নাকি আসমান জমিন সব বরাবর
হিঁদুর মরা শ্মশান না মিয়ার গোরস্তান

এভাবে ছবির শুরুর দিকেই জাত-পাত-বিষয়ক হিন্দুয়ানি গোঁড়ামি ও হিন্দু-মুসলমানের ঠোরাঠুরির একটি কড়া পর্যালোচনা হাজির হয়ে যায়। কিন্তু জাত-পাতের সওয়াল কী করে লালন ফকিরের দর্শন-জিজ্ঞাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো তার সংবাদ পাচ্ছি আরো একটু পরে, যখন লালন গুরুর আদেশ অমান্য করে নিজের গাঁয়ে ফিরে আসছে। কিন্তু জাত গেছে বলে তার ঘরে ঠাঁই হয় না। শোকাভিভূত মাকে লালন ছুঁয়ে দেবার উদ্যোগ করতেই মা হাহাকার করে ওঠে, ‘ওরে আমারে ছুঁস নে। তোর জাত গেছে। তুই যবনের হাতে অন্ন খেয়েছিস।’

এরপর পাড়া-পড়শির ভাষ্যে জানা যায়, জাত খোয়ানোর থেকে জান খুইয়ে ফেলাটা লালনের পক্ষে বেহ্তর হতো। কিন্তু এই সারবত্তাহীন আফসোসে বিক্ষুব্ধ লালন একটা দার্শনিক প্রশ্ন তোলে রাগী গলায়, ‘কেমনে জাত যায়? সে কি শরীর থেকে ফুছ কইরা বাহির হয়ে যায়?’ এবং তার পরেই লালনের ক্রোধান্বিত ঘোষণা: ‘জাত হাতে পালি পোড়াতাম আগুন দিয়া’।

এই সেই বিখ্যাত মুহূর্ত যা লালনের বাকি জীবনের সংগ্রামকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এখন থেকে লালনের জীবনের লক্ষ্য হবে জাত-পাতের মুখে আগুন দেওয়ার চেষ্টা। এর অব্যবহিত পরেই জাত মারার একটি বেশ খোলতাই বাসনা লালনের কৃতকর্মে টের হয়। সে নিজের বউকে তার সাধনসঙ্গিনী হয়ে ‘সাধবাজারে’ ছুটে যাওয়ার জন্য ফুসলাতে থাকে। কিন্তু এই কুকর্মের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে লালনের মা। সে আপন পুত্রবধূর দ্বিধা-থরথর মানসকে গঞ্জনা করে বলছে, ‘ও পোড়াকপালি তোরে যবনে ধরেছে। তুই না হিঁদু বাড়ির বউ। মোসলমানের সঙ্গ নিবি। ও না যবনের হাতে অন্ন খেয়েছে।’

তখন পুনর্বার লালনের রাগ ধরে যায়। সে ‘থাকো তোমাদের জাতধম্ম নিয়ে’ বলে গোস্বা করে চলে যায়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় প্রশ্নে একটি বড় মিমাংসাতে পৌঁছে যাচ্ছে লালন, যার সংবাদ একটু পরেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি লালন আর কালুয়ার বাতচিতের মাধ্যমে। জঙ্গলে আকস্মিকভাবে লালনের মুখোমুখি হয়ে হতচকিত কালুয়া প্রশ্ন করছে:
‘তোমার নামটা কি কও তো?’
‘লালন’। (লক্ষণীয় যে, লালনচন্দ্র কর সে আর বলছে না। কিন্তু আগে যে খুব বলতো সেটা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবার মতো। এই প্রসঙ্গে পরে আসছি।)
‘মোসলমান না হিঁদু?’
‘মানুষ। পাগল।’
লালনচন্দ্র করের মৃত্যু হয়েছে। পৃথিবীতে আর কেউ কোনোদিন জানবে না যে-মানুষটি জাত খোয়ানোর পাপে নিজের বাড়িতে ঠাঁই পায়নি, এককালে তার নাম ছিল লালনচন্দ্র কর। এই নতুন লালন নানাভাবে জাতপাতের বিরুদ্ধে নিজের আপসহীন অবস্থান জানান দিতে থাকে। জঙ্গলের মধ্যে গড়ে ওঠা আনন্দবাজারে সবার জন্য ভাত রান্না করে কমলি। কিন্তু কালুয়া সে-ভাত মুখে তুলতে কবুল হয় না। সে ‘বামনির পাক’ খায় না। এতে তার জাত যায়। কমলি তখন বেশ কায়দা করে লালনকে পুছ করে, ‘আপনারও কি আমার ছোঁয়া খালি জাত যাবে নাকি?’
‘হাতে বুঝি জাত থাকে?’ এই মোম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ‘পোনা মাছের ঝাঁক’ এসে পড়ায় ছুট মারে লালন। এবং তৎক্ষণাৎ জাতধর্ম-বিদ্বেষী জাতীয় সঙ্গীত রচনা করে ফেলে।

জাত গেল জাত গেল বলে
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি সবই শুধু তা না না

জাত-পাতবিরোধী এই দর্শন আনন্দবাজারের সমাজকাঠামোর ওপর গভীর ছাপ ফেলে। তখনকার বাঙালি সমাজ থেকে আনন্দবাজার বিশেষভাবে পৃথক হয়ে পড়ে এই জাত-পাতের প্রশ্নেই। এই সমাজের মধ্যে জাত-পাতের প্রশ্নটি কেমন রূপ পেয়েছিল তার একটি ভালো দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে কমলি ও ভান্তির বাতচিতের মধ্যে। সতীদাহের চিতা থেকে সদ্য রক্ষা পাওয়া ভান্তিকে কমলি বলছে:
‘দেখরে ভান্তি। ভালো কইরা দেখ। ইরাই আমাদের সগ্গ। এখানে হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে থাকে। তোর আবার ছোঁয়াছুয়ির বাতিক নাই তো? আমি তোর জাত মারতি চাইনে।’
‘তুমি কি?’
‘আমি আগে ছিলাম বামুন। এখন আমার খসম মুসলমান। এখানে এমনও আছে হিঁদুও না আবার মুসলমানও না। কিংবা বলতে গেলে দুইই।’
জাত প্রসঙ্গে একটি বেশ নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় ছবির শেষ দিকে। জাত-পাতবিরোধী লালনের বিরুদ্ধে মোল্লা-পুরুতের যৌথ উদ্যোগে একটি বাহাছ হয় পাবনার আটঘরিয়াতে। সেখানে লালন হিন্দু নাকি মুসলমান এই প্রশ্নের উত্তর চাওয়া হয়। লালন তার উত্তরে একটি অসাধারণ গান শোনাচ্ছে:

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
লালন কয় জাতের কী রূপ
আমি দেখলাম না এই নজরে।

এভাবে মনের মানুষ ছবিটি হয়ে ওঠে সেক্যুলার ভাবাদর্শের ভাষ্যকার। লালন ফকির এই ছবিতে সেকুলার নবী হিসাবে নির্মিত হন।

একটু খেয়াল করলে কায়াসাধনা ও লালনের সেকুলার ভাবকল্পের মধ্যে একটি সম্পর্কের সূত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এই দুইয়ের সম্পর্কের মধ্যেই মনের মানুষ ছবিটির দার্শনিক আকাঙ্ক্ষাও কিছু মাত্রায় টের হয়। বহুধাবিভক্ত ভারতের অস্তিত্বের জন্য জাতীয় সংহতি একটি গুরুতর সমস্যা। এই বিচিত্রকে কোনো একটি গভীর ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটি অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য। এখানে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে, উচ্চবর্গ ও ইতরের মধ্যে যে ফাটল আছে সেটা বুঝিয়ে দিয়ে এক ও অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আওয়াজ তোলা ভারতের জন্য জরুরি। এক্ষেত্রে গান্ধীর সেকুলারিজম১৫ ভারতের জন্য মোক্ষম দাওয়াই। ফলে, সর্বভারতীয় সমাজের কল্পনা নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠায় গান্ধী বিশেষ কলকে পাবেন তাতে আশ্চর্য কিছু নেই। গান্ধী প্রসঙ্গে ভারতীয় বিদ্বৎসমাজের মধ্যে একটি কনসেন্সাস দাঁড়িয়ে গেছে। ভারতীয় ইতিহাস-চর্চার দিকে তাকালে এটা ভালোভাবে চোখে পড়বে। মেইনস্ট্রিম ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে সাবঅল্টার্ন ঘরানার লেখক পর্যন্ত সকলেই গান্ধীর মাহাত্মের কাছে হার মেনেছেন, গান্ধীকে ভক্তি দিয়েছেন।

আমাদের প্রস্তাব, মনের মানুষ এই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রকল্পেরই অংশভাক। এখানে লালন ফকিরকে গান্ধীবাদী ভাবাদর্শের জেবের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। মনের মানুষকে তাই ভারতীয় জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের একটি সৃজনী তৎপরতা হিসেবে দেখা দরকার। হরিজন-প্রিয় গান্ধী এবং নিম্নবর্গের ভাবুক লালন এখানে একই ফরাসে উপবিষ্ট। এজন্য অবশ্য মূল্য দিতে হচ্ছে ছেঁউড়িয়ার লালন ফকিরকে। তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে এই ছবিতে অহিংস ভাবের অনুসারী হয়েছেন, এবং কামাচারে ব্রহ্মচর্যকে ব্রত করেছেন। লালনের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় দিকটি এখানে তাঁর অটল ব্রহ্মচর্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এই অটল ব্রহ্মচর্যের পাশাপাশি জাত-পাতবিরোধী দর্শনের মাধ্যমে লালন গান্ধীর তরিকাতে হিজরত করলেন। এবং এর মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী গ্রান্ড ন্যারেশনে সর্বভারতীয় আইকন হিসাবে লালনের প্রতিষ্ঠা ঘটলো। এই প্রতিষ্ঠারই উদযাপন আমরা ঘটতে দেখছি মনের মানুষ ছবিতে।

চলবে...
(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত)


তথ্যসূত্র ও টীকা:
১. অক্ষয় কুমার দত্ত, ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, প্রথম ভাগ, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, ১৪০৯ বঙ্গাব্দ

২. মৌলবী আবদুল ওয়ালীর ‘অন কিউরিয়াস টেনেট্স অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস অব এ সারটেন কাস অব ফকিরস ইন বেঙ্গল’ শিরোনামের এই নিবন্ধটি প্রথমে ছাপা হয়েছিল দি জার্নাল অব দ্য অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি অব বোম্বে-র ১৯০০ সালের পঞ্চম খণ্ডে। পরে সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ব্রাত্য লোকায়ত লালন (পুস্তক বিপণি, কলকাতা, ২০০৭) গ্রন্থে রচনাটি পূনর্মুদ্রণ করেছেন।

৩. মৌলবী আবদুল ওয়ালী, প্রাগুক্ত।

৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শিক্ষার বিকিরণ’, ‘শিক্ষা’র সংযোজন অংশে সংকলিত। লিংক:  http://www.rabindra-rachanabali.nltr.org/node/15092

৫. ক্ষিতিমোহন সেন, বাংলার বাউল, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৩

৬. ছবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা এই আলোচনার বাইরে রেখেছি। কারণ সামগ্রিকভাবে মনের মানুষ ছবির একটি ক্রিটিক রচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কেবল দেখতে চেয়েছি, এই ছবিতে বাউলিয়ানার নির্মাণ। ফলে, কালচার ইন্ডাস্ট্রির একটি পণ্য হিসেবে এই ছবির নির্মিতির দিকটি আমাদের আলাপের বাইরে থাকছে। এই ছবিটির একটি নারীবাদী পাঠ তৈরি করা দরকারি কাজ। বিশেষত, এরোটিক অবজেক্ট হিসেবে নারীর পরিবেশন, এক্সোটিক লোকেশন— এসবের মাধ্যমে ভিজুয়াল প্লেজার উৎপাদন করার যে সচেতন খেয়াল এই ছবিতে আছে সেদিকটা নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। এব্যাপারে কিছু কিছু আলোচনা ইতিমধ্যেই হয়েছে, তবে বিষয়টি আরো আলোচনার দাবি রাখে।
এই প্রসঙ্গগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য দেখুন, কল্লোল মোস্তফা, ‘গৌতম ঘোষের “মনের মানুষ”: জাতহীনের জাত মারার তরিকা’, ফেসবুক নোট আকারে প্রকাশিত।

৭. চরিত্রের ক্ষেত্রে ‘সে’ সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে। লালন সম্পর্কে যেখানে ‘আপনি’ সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে ঐতিহাসিক লালনকে ও যেখানে ‘তুমি’ সম্বোধন হয়েছে সেখানে ফিকশনাল লালনকে বুঝতে হবে।

৮. সংলাপ উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে শ্রুতির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। ফলে, কোথাও কোথাও গৌণ ত্রুটি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরকম ত্রুটির ঝুঁকি নিয়ে লেখাটি প্রকাশ করতে হলো বলে দুঃখপ্রকাশ করছি।

৯. মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০১০

১০. মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, প্রাগুক্ত

১১. রাজকুমারী অমৃত কউরকে লেখা মহাত্মা গান্ধীর চিঠি। চিঠির যে অংশটি এখানে উদ্ধৃত হয়েছে সেটি নেয়া হয়েছে স্ট্যানলি ওলপার্টের গান্ধী’স প্যাশন: দি লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অব মহাত্মা গান্ধী (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২) গ্রন্থ থেকে।

১২. শক্তিনাথ ঝাঁ, ফকির লালন সাঁই: দেশ, কাল এবং শিল্প, সংবাদ, কলকাতা, ২০০৭

১৩. ২৩ ডিসেম্বর ২০১০ বিবিসি বাংলাতে মনের মানুষ ছবির ওপর মনীষা বসুর একটি অডিও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এখানেই ছবিটি নিয়ে কথা বলেন গৌতম ঘোষ। তাঁর কথার রেকর্ড শুনতে এই লিংকে দেখুন: http://www.bbc.co.uk/bengali/multimedia/2010/12/101223_mk_moner_manush.shtml?

১৪. বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ন্যারেশন তৈরি হচ্ছে লালনকে দিয়ে। আর ভারতবর্ষে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে, এই ন্যারেশন তৈরি হচ্ছে আরো বড় পরিসরে। ভারতবর্ষের নানা জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষকে অভিন্ন জাতীয়তাবাদী ন্যারেশনে জড়ো করতে লালন ফকির আইকন হয়ে উঠতে যাচ্ছেন।

১৫. মহাত্মা গান্ধী তাঁর লেখালেখি ও জীবন-যাপনের মধ্যে বহুবার নিজেকে সাচ্চা সেক্যুলার হিসেবে হাজির করেছেন। এক্ষেত্রে একটি মাত্র উদ্ধৃতিই যথেষ্ট হবে। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে গান্ধী একজন খ্রিস্টান মিশনারিকে বলছেন:
আমি যদি একনায়ক হতাম তাহলে ধর্ম ও রাষ্ট্র পৃথক হত। আমি আমার ধর্মের নামে শপথ করে বলছি। আমি এর জন্য মরতেও প্রস্তুত। কিন্তু এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্র আপনার ইহজাগতিক কল্যাণ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বৈদেশিক সম্পর্ক, মুদ্রাব্যবস্থা এবং এরকম আরো অনেক কিছুরই দেখভাল করবে, কিন্তু আপনার কিংবা আমার ধর্ম কিছুতেই নয়। সেটা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যাপার।
(If I were a dictator, religion and state would be separate. I swear by my religion. I will die for it. But it is my personal affair. The state has nothing to do with it. The state would look after your secular welfare, health, communications, foreign relations, currency and so on, but not your or my religion. That is everybody`s personal concern!)

উদ্ধৃত হয়েছে দি হিন্দুর ২২ অক্টোবর, ২০০৩ সংখ্যাতে। এই লিংকে পাওয়া যাবে: http://www.hindu.com/2003/10/22/stories/2003102200891000.htm

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়