ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ মানেই ছাত্র নিপীড়ন বন্ধ নয়

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১৪ ১২:০৪:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১৪ ১২:০৪:০৪ পিএম

বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত জ্ঞান চর্চার জায়গা। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে- বাইরে নানা স্থান থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ করার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে মানুষ গল্পে-আড্ডায় নানাভাবে জ্ঞান আহরণ করে।

দেশের সবচেয়ে সচেতন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে তারা যেমন সচেতন, তেমনি দেশের মানুষের অধিকারের ব্যাপারেও তারা সোচ্চার। কিন্তু জ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় বাধা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কর্তৃত্বপূর্ণ মানসিকতা। শুধু শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কর্তৃত্ব প্রকাশের মানসিকতা রয়েছে। গত কয়েক দশকে এর বলি হতে হয়েছে বহুসংখ্যক শিক্ষার্থীকে। সম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ড এধরনের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

গত ৭ অক্টোবর আবরারকে নৃশংসভাবে হত্যা সারা দেশের মানুষের মনে রেখাপাত করেছে। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দাবির মধ্যে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা ছিলো অন্যতম একটি দাবি। দেশের একটি বৃহৎ অংশ তাদের এই দাবির সাথে একমত পোষণ করেছেন, অন্যদিকে আরেকটি অংশ তাদের দাবির সাথে একমত হতে পারেননি। যে অংশটি একমত হতে পেরেছেন তাদের মূল যুক্তির জায়গা হলো, ছাত্র রাজনীতির ফলে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির বলি হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর। ছাত্র রাজনীতির ফলে একধরনের কর্তৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়, যা রাজনীতির বাইরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একপ্রকার ভীতির সঞ্চার করে। অন্যদিকে যারা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সাথে একমত হতে পারছেন না, তাদের পক্ষেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। ছাত্র রাজনীতির হাত ধরেই ৫২ থেকে ৭১ এবং পরবর্তী সময়েও রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানা অনিয়ম, শিক্ষার পরিবেশ উন্নতকরণের জন্য ছাত্ররাই রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্তৃত্ববাদী আচরণের ফলে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এর বিপরীতে আন্দোলনও গড়ে উঠেছে। কিন্তু সম্প্রতি আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড এ ধরণের আন্দোলনে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। বুয়েটের সাথে উত্তাল হয়েছে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

আবরার ফাহাদকে হত্যার পেছনে যে কারণটি ছিলো, তা মূলত রাজনৈতিক। ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস লেখার জেরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র হত্যার ঘটনার নজির বাংলাদেশে বেশি নেই। এ হত্যাকাণ্ডের পরই বেরিয়ে আসছে বুয়েটে রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ ছাত্রদেরকে নির্যাতনের সব তিক্ত কাহিনী। বুয়েটে হলে অবস্থান করা প্রথম বর্ষের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে হয়। তারপর সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশে চলে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বুয়েটের কয়েকজন ছাত্র তাদের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে র‌্যাগ দেয়ার এই নির্মম প্রথার বলি আবরার এবং তার মতো বুয়েটের অসংখ্য ছাত্র।

বুয়েটের পাশাপাশি বাংলাদেশের তথাকথিক সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পুঁজি করে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি হলে রয়েছে গণরুম। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সেখানে গাদাগাদি করে রাত্রিযাপন করে। নিয়মিত হাজির হতে হয় রাজনৈতিক প্রোগ্রামে। রাতে বসে গেস্টরুম। সেখানে শেখানো হয় নানারকম নিয়মকানুন। সালাম দেয়া, আচার-আচরণের ত্রুটি, রাজনৈতিক প্রোগ্রামে উপস্থিত না থাকা প্রভৃতি কারণে সেখানে ছাত্রদেরকে নানারকম শাস্তিও দেয়া হয়। এ দায়িত্ব অর্পিত থাকে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রদের উপর। এখান থেকেই মূলত নতুন ছাত্রদের রাজনীতিকীকরণ শুরু হয়। বছরের পালাবদলে আবার তাদের উপরেই এ দায়িত্ব বর্তায়। তখন পূর্বের সব ঘটনার শোধ তোলা হয় নতুন ছাত্রদের উপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট উভয়টিতে র‌্যাগিং মূলত রাজনৈতিক। তবে, এ দুই প্রতিষ্ঠানের র‌্যাগিংয়ের মধ্যে মিল থাকলেও শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে বুয়েট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা নমনীয়।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চার সেল রয়েছে এমন ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও রয়েছে। সকলের মনে প্রশ্ন উঠছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নেই সেখানে টর্চার সেল থাকারও কোনো সম্ভাবনা নেই। আবরার ফাহাদকে হত্যার পর সকলের মধ্যে টর্চার বলতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক টর্চার এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা শুধু রাজনৈতিকভাবেই ঘটে থাকে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার করে নির্যাতন ছাড়াও দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের  শিকার হতে হয়। এসব নির্যাতন চলে র‌্যাগিং নামক এক ভয়ঙ্কর প্রথার মাধ্যমে। রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার ছাড়া বাকি সবই হয় এই অরাজনৈতিক র‌্যাগিংয়ে। রাজনৈতিক র‌্যাগিং এর মূল উদ্দেশ্য প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে লেজুড়বৃত্তিক করে তোলা। তাদেরকে আচার-আচরণ শেখানোর নামে সম্পূর্ণ অনুগামী করা হয়। অরাজনৈতিক র‌্যাগিংও একইভাবে আচার-আচরণ শেখানো এবং নতুন শিক্ষার্থীদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়ে চালাক-চতুর করার নামে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে টিকে আছে। কিন্তু এধরনের র‌্যাগিংও মূলত কর্তৃত্ববাদী সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা আসা মাত্রই তাদেরকে উষ্ণ আলিঙ্গনে, মমতা দিয়ে আপন করে নেয়ার কথা ছিলো, সেখানে সিনিয়ররা শুরুতেই একটি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখে। ফলে উচ্চশিক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর পদার্পন ঘটে মনে একরাশ ভয় নিয়ে। শুরুর দিনগুলোতে ভয়কে নিত্য সঙ্গী করেই ক্যাম্পাসে বিচরণ করতে হয় তাকে। হঠাৎ একদিন তিনিও শিকারে পরিণত হন। মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটে যেমন টর্চারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, এরকম সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। বিশেষ করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির প্রভাব কম, সেসব ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং সিনিয়রদের জন্য উন্মুক্ত। চাইলে যেকোনো সিনিয়র প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীকে র‌্যাগ দিতে পারেন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিং আবার ডিপার্টমেন্ট কেন্দ্রিক। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ নিজ ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র দ্বারাই র‌্যাগের শিকার হয়ে থাকেন নতুন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাগিং এধরনের হয়ে থাকে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাগিংয়ের দিক থেকে একধাপ এগিয়ে। সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়া ছাত্রদেরকেও র‌্যাগ দেয়া হয়।

নানা অঙ্গভঙ্গি, অশ্লীল শব্দ উচ্চারণে বাধ্য করা, শারীরিক নির্যাতন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য প্রভৃতি র‌্যাগের অন্যতম কৌশল। এছাড়াও ইচ্ছার বিরুদ্ধে গান গাওয়া, নাচা প্রভৃতির মাধ্যমে মজা নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়ররা। দিনের পর দিন এধরনের প্রথা চলে আসলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এগুলোকে নেহাত মজা বলে উড়িয়ে দেন। সম্ভবত নিজেরাও একই প্রক্রিয়া অতিক্রম করে আসায় তারাও এটাকে শুধুই মজা করার মাধ্যম হিসেবে দেখেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য পা দেয়া একজন শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিংয়ের ভয়ে সবসময় মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, বিশেষত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য এটিকে তার নৈতিক অধিকার খেলাফের চূড়ান্ত পর্যায় বলা চলে। তাই বুয়েটের শিক্ষার্থীদের নিজ ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি পূরণ হওয়াই যে শিক্ষার্থী নির্যাতনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, তা নয়। বরং শিক্ষার্থী নির্যাতনের ব্যাপারটি রাজনৈতিক সংগঠন থেকে স্থানচ্যুত হয়ে ভিন্নরূপে ফিরে আসতে পারে বুয়েট ক্যাম্পাসে। যেমনিভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থীরা সেটিকে কর্তব্যজ্ঞান করে পালন করে থাকেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাবি/খালেদ সাইফুল্লাহ/হাকিম মাহি

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন