ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ মাঘ ১৪২৬, ২১ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

একজন গাছের ফেরিওয়ালা

মুরতুজা হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১৩ ৯:১২:০৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১৬ ৫:১০:২৬ পিএম

অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য জীবনের সব সুখ ত্যাগ করে নিরলস পরিশ্রম করার মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তাও যদি হয় প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা, তাহলে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া পাওয়াই যাবে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দিনরাত কাজ করে যাওয়া এমনই এক প্রকৃতিপ্রেমীর গল্প শুনাবো। তার নাম প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল। পেশায় একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী পদে রয়েছেন।

সারা দিন পরিশ্রম করে সবাই যখন বাড়িতে ফিরে পরিবার পরিজন নিয়ে সময় কাটান, তখন এই মানুষটি নিজের আরাম আয়েশের কথা না ভেবে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে বাড়ির ডিজাইন করেন। এখান থেকে যে ক’টাকা আয় করেন, তার পুরোটাই ব্যয় করেন সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে। মানুষ তার নিজ প্রয়োজনে চারদিকে বন-জঙ্গল উজাড় করে দিচ্ছেন। পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন যখন ধ্বংসের মুখে, অনাবৃষ্টি, খরা আর ঝড়-ঝঞ্ঝায় পৃথিবীর অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন প্রকৌশলী টুটুলের প্রকৃতিপ্রেম দৃষ্টান্তমূলক। তিনি প্রায় দুই যুগ আগে থেকেই নিরবে-নিভৃতে সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে পরিচালনা করে যাচ্ছেন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি গত ২৩ বছর যাবৎ প্রায় ১০ লক্ষ গাছের চারা রোপণ করেছেন।

গাছ লাগানো ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করাই যার নেশা, তাঁকে অনেকে গাছের ফেরিওয়ালা নামেও ডেকে থাকেন। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৬ সালে যোগদানের পরেই এর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শুরু করেন পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। এ পর্যন্ত তিনি ক্যাম্পাসে তার নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন।

সম্প্রতি গত ৪-৫ মাসে শেখ হাসিনা হলে ফলের বাগান, শেখ রাসেল হলে ফুলের বাগান, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ফল ও ফুলের বাগান এবং খালেদা জিয়া হলে ফুলের বাগান করায় সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি প্রকৌশল ভবনের সামনের রুট এবং কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশ দিয়ে শাখা রুটে রয়েছে অসংখ্য ফুল ও পাতা বাহারি গাছ, যা শীত মৌসুমে সৌন্দর্যে ভরপুর থাকে। শুধু তাই নয়, ইবি লেক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনসহ বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য ফুল, ফল, ঔষধ গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠা এ বাগানগুলো। প্রায় বাগানগুলো নিজস্ব অর্থায়নে করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলিমুজ্জামান টুটুল।

তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ইবি ক্যাম্পাসে গত কয়েক মাসে ফল, ফুল ও ঔষধি গাছসহ প্রায় ৩ হাজারের অধিক গাছ লাগিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গোলাপ, গাঁদা, রঙ্গন, একজিরা, চন্দন মল্লিকা, কসমচ, টগর, জবা, ঝাউ, হাসনাহেনা, বেলি, পাতাবাহার, টাইম ফুল, ঢালিয়া, ফায়ার বল, জিনিয়া, নয়ন তারা, পপিসহ আরও বহু জাতের ফুল গাছ লাগিয়েছেন।

 

 

গত এক বছরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রায় ৪০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। এসব গাছ লাগানোর প্রতি কবে থেকে উদ্বুদ্ধ হন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ১৯৯৩ সালের দিকে একদিন টেলিভিশনে শুনতে পারলেন আমাদের দেশে পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে আমরা ভয়াবহ পানি সংকটে পড়তে পারি এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি পথ খোলা আছে, আর সেটা হলো অধিক পরিমাণে গাছ লাগানো। তারপর থেকেই তার ইচ্ছা জাগে গাছ লাগানোর প্রতি।  ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি ব্যাপকহারে গাছ লাগানো শুরু করেন, আর সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ২০১৯ সালে এসে তার গাছ লাগানোর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ।

ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত বাগান করার প্রতি তিনি বেশি উৎসাহ পেয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এ উন্মুক্ত বাগানগুলোতে কেউ হাত দেয় না। এমনকি একটি ফুলও কেউ বিনা কারণে ছেড়ে না। এ মহানুভবতা থেকে আমি আরও বেশি উৎসাহী হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রাশিদ আসকারী মহোদয় আমাকে বেশি অনুপ্রাণিত করছেন, তার কারণেই এবছর বিশ্ববিদ্যালয়কে সেরা বাগান উপহার দিতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজের ক্লান্তি দূর করতে এ বাগানগুলো বেছে নেন তিনি।’

প্রকৌশলী টুটুল পরিবেশবান্ধব কাজের পাশাপাশি সমাজ সেবায় নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখেন। তিনি রাত জেগে বেসরকারি বাড়ির ডিজাইন করে যে অর্থ আয় করেন, তা দিয়ে তিনি সমাজসেবার কাজ করে থাকেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও শিক্ষার্থীদের হাতে গাছ তুলে দেন। তিনি তাঁর এ সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। এর আগে ২০১২ সালে পেয়েছেন পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবকের পুরস্কার।

তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘গাছ লাগানো আমার নেশা, এ ধারা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি আমি ভবিষ্যতে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করতে চাই, সেজন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছি।’

‘মেগা প্রকল্পের আওতায় ইবি ক্যাম্পাসে আনুমানিক ৩১টি ভবনের কাজ হবে। এ নির্মাণের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে ভবনগুলোতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনের কাজ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা যদি আগামী ৪ বছরের মধ্যে সবগুলো ভবনের কাজ শেষ করতে পারি, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিবেশগত দিক দিয়ে এ ক্যাম্পাসটি বাংলাদেশের সুন্দরতম ক্যাম্পাসে পরিণত হবে’, বলেন তিনি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

ইবি/হাকিম মাহি