ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৬, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

একাকি রাতের গল্প

আমিন পিয়াল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৬ ১০:১৭:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৬ ১০:১৭:৪১ পিএম

নিজের সাথে এক অদ্ভুত সময় কাটছে। আমার বাসার সবাই পরীক্ষা শেষে বাড়ি চলে গেছেন। আমার এখনো একটা পরীক্ষা বাকি। আমি একা ফাঁকা কবরস্থানে বাস করছি।

আসলে আমার বাসাটা এক বিশাল কবরস্থানের পাশে। কুয়াশা কেটে কখন ভোর হয় বুঝতে পারি না। রোজ সকালে ঘুম থেকে ওঠে এক কাপ রঙ চা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো অভ্যাস হয়ে গেছে। আমাদের বারান্দায় গেলে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। দু’চোখে দেখা যায় শত শত নিস্তব্ধ, নীরব কবর, আর নাকে ভেসে আসে বকুলের ঘ্রাণ।

আজ সকালে বাসার সামনে মেইন রোডে একটা বড় মিছিল দেখতে পেলাম। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষগুলোকে দেখে আমার খুব অদ্ভুত লাগলো। প্রথমে বেশ কিছু মধ্যবয়স্ক মহিলা, তারপর আরো কম বয়সী কিছু কিশোরী, তারপর কিশোরদের একটা দল, তারপর এবং শেষটায় একদল বৃদ্ধ। এরা সবাই সাধারণ মানুষ। সবাই গলা ফাটিয়ে স্লোগানের সাথে তাল মেলাচ্ছেন। যেন এক অদ্ভুত মানব জুয়া! আমি রাজনীতি করিনা। এমন কি নিজের টাইমলাইনে রাজনৈতিক পোস্টগুলোও এড়িয়ে চলি। এসব দেখতে ভালো লাগে না। বিকেলে যাই একটা অনলাইন পত্রিকার অফিসে। আমাকে দাওয়াত দিয়েছেন হাকিম মাহি ভাই। গিয়ে দেখি, সেখানে appreciation ceremony. বিশেষ করে সেখানে সকল ক্যাম্পাস রিপোর্টার উপস্থিত রয়েছেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে একজন আলোচক এবং সাংবাদিক বললেন, ‘আমরা কারো বিরুদ্ধে লেখি না। আমরা যা সত্য তাই লিখি।’ কথাগুলো ভালো লাগলো। যদি এমনটা দেশের কোনো পত্রিকা করতে পারে সেটা আমাদের দেশের জন্য বেশ পজিটিভ। অনুষ্ঠান উপলক্ষে পত্রিকার অফিসে একটা পিঠা উৎসবের আয়োজন ছিলো। পিঠা খাওয়া শেষে সবাই প্রতি মাসে একবার সাহিত্যসন্ধ্যা এবং আলোচনা সভার প্রস্তাব করল। দেখা যাক কী হয়।

পত্রিকার অফিসের নিচে একটা রঙ চায়ের দোকান আছে। একটা রঙ চায়ের কথা বলে দাঁড়িয়ে আছি। দুজন সাধারণ লোক কথা বলছিলেন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। একজন আরেক জনকে বলতেছেন ‘ইরান যদি আমেরিকারে আক্রমণ করে, তাইলে আমেরিকারে খুইজা পাওয়া যাইবো?’

অদ্ভুত! আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোও চায়ের দোকানে আলোচনা হয়। আচ্ছা, চায়ের দোকানেই কেন রাজনীতি বা সাম্প্রতিক সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়! চা এবং রাজনীতি কি ওতপ্রোতভাবে জড়িত?

বাসার গলিতে ঢুকতেই দেখি সাউন্ডবক্সে বিকট শব্দে হিন্দি গান বাজছে। বাসার রাস্তার উপরেই স্টেজ বসানো হয়েছে। স্টেজের উপর নেমপ্লেটে লেখা ‘আজ সীমার গায়ে হলুদ’। বুঝতে পারলাম, এখানে সীমা নামের কেউ একজন থাকত, যে কাল থেকে আর থাকবে না।

ওহ! আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি। সন্ধ্যায় বন্ধু আশিকের সাথে দেখা হয়েছে অনেক দিন পর। বন্ধু আমার জন্য ভুটান থেকে গিফট আর চকলেট নিয়ে আসছে। আমি বেশ খুশি বন্ধুকে অনেক দিন পর দেখতে পেয়ে।

বাসায় আসার পর ক্লান্তিটা আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার একটা কথাই বারবার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, এদেশের মানুষ পাঁচ বছর পর পর একটা জাতীয় ভুল করে থাকেন। জাতীয়ভাবে ন্যাড়া বারবার বেলতলায় গিয়ে ন্যাড়া হয়। দেশ যদি আমাদের মা হয়, তাহলে আমাদের মায়ের বৃদ্ধাশ্রমেও ঠাই হয়নি। আমাদের মা রাস্তার উপর শুয়ে আছেন কোনো খড়কুটার উপর।

সাতপাচঁ ভাবতে থাবতে চোখ পড়লো জানালার বাইরে কবরস্থানের দিকে। তখন মনের অজান্তেই একটা ভয় কাজ করতে থাকলো। সে ভয় কবরস্থান দেখে নয়, সে ভয় মরণের, সে ভয় একাকিত্বের। একদিন আমারও জায়গা হবে এমন নির্জন একটি জায়গায়। তবুও মনকে বোঝাতে পারি না। অনেক সময় একাকি থাকলে ভুলেও কবরের দিকে তাকাই না, বাসার নিচেও নামি না।

আমি থাকি মিরপুর-১ এর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের একটি পাশের এপার্টমেন্টে। পড়াশোনা করি প্রাইম ইউনিভার্সিতে, সে সুবাদে এখানে থাকা। এখান থেকে ভার্সিটি খুব কাছেই। অনেক কিছু ভাবছি, আর বারবার চোখ পড়ছে নীরব, নির্জন কবরস্থানের দিকে।

হঠাৎ ছোটবেলার একটি হ্যালোসিনেশনের কথা মনে পড়ে গেলো। আমি একবার সন্ধ্যায় একা ওয়াজ শুনতে গিয়েছি। আসার সময় নির্জন একটি জায়গায় আমার কাছে মনে হলো কেউ একজন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ডাকলাম, কিন্তু কেউ শুনলো না। আমি ভয়ে দৌড় দিলাম। কাছেই একটি বাড়িতে প্রবেশ করলাম। দেখি তিনজন বৃদ্ধা বসে পান খাচ্ছেন, তারা কথা বলছেন না। সে কথা ভাবতে ভাবতে শরীরে একটি অদৃশ্য স্পর্সের অনুভব করলাম। কিন্তু আমি আজ স্থির ভয় পাবো না।  একাকি ঘরে একবার শুয়ে থাকি, আবার কী যেন ভেবে ওঠে যাই। কখনো আবার ওয়াসরুমে। 

অনেকের কাছেই এসব স্থানের ব্যাপারে ভয়ের গল্প শুনি, কিন্তু আমি কখনো ভয়কে নিজের কাছে স্থান দেই না। কিন্তু ভাবি, আসল ঠিকানাই যদি হয় এটি, তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কখন যে ঘুময়ে পড়েছি মনে নেই। উঠে দেখি সকাল হয়ে গেছে। আবার মানুষের সিনেমাটিক জীবনের শুরু...।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাইম ইউনিভার্সিটি।


ঢাকা/হাকিম মাহি