ঢাকা, শুক্রবার, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৩ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কোন পথে বাংলা ভাষা

স্টার্লিং ডি মামুন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৭ ৬:০৯:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৮ ২:১৭:০৪ পিএম

কথায় আছে, বাঙালি আর কিছু পারুক আর না পারুক, মন দিয়ে ভালোবাসতে পারে, আর ভালোবাসার জন্য জীবনও দিতে জানে। সে ভালোবাসা যেকোনো জিনিসের প্রতি হতে পারে। ভাষার প্রতি, দেশ ও দশের প্রতি, প্রিয়জনের প্রতি। তাইতো সুদূর আমেরিকা, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়া থেকে ভালোবাসার টানে প্রিয়জনকে নিয়ে আসেন মাতৃভূমি বাংলায়। ১৯৫২ সালে ভাষা এবং ১৯৭১ সালে দেশের জন্য জীবন দিয়েছিল এ জাতি।

পৃথিবীতে একটা জাতি ভাষার জন্য নিজের বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিতে পেরেছিল, সে নজির প্রথমে বাঙালিই দেখিয়েছে। আর বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে তুলেছে এ নজির। ভাষা নিয়ে এত সমৃদ্ধ ইতিহাস কেবল বাঙালিরই আছে।

রফিক, জব্বার, বরকত ও সালামসহ নাম না জানা বহু অকুতোভয় ভাষা সৈনিকদের আত্মত্যাগ, রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলা ভাষা আজ যেন ধুকে ধুকে মরতে বসেছে।

বাঙালিরা আজকাল বাঙলাকে সেকেলে মনে করেন। তাদের ছেলে-মেয়েদের তারা বিদেশি ভাষায় শিক্ষিত করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। রাষ্ট্রের সকল কাজে এখন ইংরেজির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকরা নিজেদের ‘এলিট’ ভাবেন, তারা ইংরেজিকে এখন রানির আসনে অভিষিক্ত করতে ব্যস্ত।

ভাষার এই বিকৃতি, ভুল ও অশুদ্ধ উচ্চারণ, ভাষা শৃঙ্খলা না মানার পেছনে প্রধানত রাষ্ট্র পরিচালনায় ঔপনিবেশিক ও আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি প্রধান কারণ। সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা প্রচলনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন বিশ্ব-প্রতিযোগিতার কথা বলে ইংরেজির ব্যবহার করছে প্রবলভাবে। সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞপ্তি হচ্ছে ইংরেজি ভাষায়। আদালতের সকল কাজে বিশেষত রায় লেখার ক্ষেত্রে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলার ব্যবহার খুবই সীমিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার কমে আসছে। দেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাপক হারে বাড়ছে। মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বাংলা ভাষার চর্চা কমছে, সেখানে ও ভুল, অশুদ্ধ প্রয়োগ কম নয়। মাদ্রাসাগুলোতে বেশির ভাগ কিতাব বা বই আরবিতে লেখা। শিক্ষার্থীদেরও এখানে আরবি এবং উর্দু মাধ্যম। এবার পাঠ্যপুস্তকে ভাষার বিকৃতি, ভুল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। বাণিজ্যিক অফিসগুলোতে বাংলার ব্যবহার ওঠে যাচ্ছে। নানা রকম শিক্ষাপদ্ধতি থাকার কারণে বাংলা ভাষার মর্যাদা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অথচ একজন বাঙালি আর বাংলাদেশি হিসেবে বাংলাটা ভালো করে জানা, বোঝা ও প্রয়োগ করা ছিল অত্যন্ত জরুরি।

বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে অত্যন্ত বাজেভাবে। আজকাল এফএম রেডিওগুলোতে বাংলা ভাষার কী পরিমাণ যে অপব্যাবহার হচ্ছে, তার ইয়াত্তা নেই। এদিকে নেই কোনো প্রসাশনিক চাপ বা বাংলা ভাষা বিকৃতির শাস্তি। বাংলাটাকে একেবারে এই রেডিও আর জেলাভিত্তিক ব্যবহার গলা টিপে হত্যা করছে।

ভাষার অপব্যবহারকারী আরজেরা তাদের অনুষ্ঠান শোনার জন্য একটি অতি আধুনিক শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করে নিয়েছে। আর সে শ্রোতারা ভাষার এই অপব্যবহারে অতি উৎসাহী। হয়তো এদের কাছে এটাকেই সঠিক মনে হচ্ছে। আর এমনটা চলতে থাকলে আমাদের বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষা থাকবে না, এটা ভিন গ্রহের এলিয়েনের ভাষা হয়ে যাবে। তাই ভাষার এই অধঃপতন ঠেকাতে সমাজের সুশীল আর নীতি নির্ধারকদের এখনই সচেতনভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিৎ।

একটা নির্দিষ্ট নীতিমালা করা উচিৎ অনুষ্ঠান প্রচার আর ভাষার ব্যবহারের উপর। নইলে যে মাতৃভাষার জন্য এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, এত জীবন দান সবই বৃথা হয়ে যাবে। বাঙালির ছেলে-মেয়েরা ইংরেজিতে কথা বলাকে বড় করে দেখছে। বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার ছোট  ছোট বাচ্চাদের শেখানোর ক্ষেত্রে বাংলার চেয়ে ইংরেজি এবং আরবির গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাঙালি এখন আর বাংলা সাহিত্য পড়তে চায় না। হ্যারিপটার পড়তে বেশি ভালোবাসে।

বাংলা কি আসলেই সেকেলে ভাষা? বাংলা ও বাঙালির আছে গৌরবান্বিত ইতিহাস ঐতিহ্য। রবি ঠাকুর, নজরুল, সুকান্ত, শরৎ বাবুরা বাংলা সাহিত্যে কী অমর সব সৃষ্টি উপহার দিয়ে গেছেন! তবুও আজ-কালকার ছেলে-মেয়েরা বলেন, বাংলা সাহিত্যে বড্ড সেকেলে, এতে কী আছে বলুন তো?

আমরা আজ বড় বেশি চেতনাবাজ হয়ে গেছি। সারা বছর আমাদের বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা গান আর সিনেমার খোঁজ থাকে না। আমরা হিন্দি, তামিল, ইংরেজি গান-সিনেমা সাহিত্যে মগ্ন। অথচ ফাল্গুন এলে আমরা এক’দুদিনের জন্য বাঙালি হয়ে যাই। ঘটা করে বসন্ত বরণ করি, শাড়ি পাঞ্জাবী গায়ে জড়িয়ে বাঙালিয়ানা ভাব দেখাই। মাতৃভাষা দিবস পালন করি। শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাই। মাইকে উচ্চস্বরে দেশের গান বাজাই। এই আনুষ্ঠানিকতাই আজ বাঙালির মূল কাজ হয়ে গেছে। এসব চেতনা তো থাকবেই, কিন্তু প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি করতে হবে। সারা বছর শিক্ষাব্যবস্থার সাথে বাংলার চর্চাকে বাড়িয়ে দেয়া সময়ের দাবি।

আমরা কোন পথে হাঁটছি? বাঙালির ছেলে-মেয়ে হয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলতে আমরা লজ্জাবোধ করি, হীনমন্যতায় ভুগি। বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক সব কাজে, সব অফিসে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যে ভাষার পেছনে এত শ্রম, এত আত্মত্যাগ, সে ভাষার এমন করুণ অবস্থা দেখাটা দুঃখজনক।

আমরা বাঙালি, বাঙলা ভাষা আমাদের অহংকার, ভালোবাসা আর ভালো লাগার জায়গা। আমি কাউকে গালি দেব না, কারণ আমি বাঙালি, আমি কখনো আদর্শচ্যুত হবো না, কারণ আমি বাঙালি। বাঙালি মানেই আবেগ আর ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু সারা বিশ্বে আজ বাঙালি মানে ফাঁকিবাজ, চাটুকার হিসেবে পরিচিত। তাই আসুন, বাংলায় কথা বলি। বাংলায় হাসি, বাংলাকে ভালোবাসি। আবার আমরা আদর্শের প্রতীক হই।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


জাবি/হাকিম মাহি