ঢাকা, সোমবার, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধু ও মাতৃভাষা আন্দোলন

আহমেদ আরিফ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৩ ৬:৩৩:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০৩ ১০:৪৮:৪৩ পিএম

বাংলা ও বাঙালির প্রবাদ পুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিবিসির অনুসন্ধানে যাকে ২০০৪ সালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ঘোষণা করা হয়। যেখানে মনোনয়ন পেয়েছিল দুই বাংলার বিখ্যাত মনীষীরা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন। আজন্ম মাতৃভাষাপ্রেমী বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে এবং পরবর্তী সময়ে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

সর্বশেষ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। সারাজীবন তিনি বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করে গিয়েছেন। ১৯৪৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার (কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। কারণ, বাংলা ভাষা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা। কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা এতে কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না। ফলে,বাংলাকে বাদ দেয়ার জন্য ব্যাপক ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে বাংলার ছাত্রজনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া ছাত্রসংগঠন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (বর্তমান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিস যৌথভাবে শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ করে। শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্য ছাত্রনেতৃবৃন্দ সভা করে রাষ্ট্রভাষার ষড়যন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ জানান। সেই প্রতিবাদ সভা থেকে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার জোড় দাবি জানানো হয়।

এ সময় ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর অন্যতম সংগঠক। ওই সভায় ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের এই উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে ছাত্রসভা করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভোরবেলায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ডাকা প্রতিবাদ দিবস ও ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসংখ্য ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং,করেন। এদিন পুলিশ ছাত্রনেতৃবৃন্দের উপর লাঠিচার্জ ও মারপিট করে। প্রতিবাদি শেখ মুজিব পুলিশি নির্যাতনের শিকার ও গ্রেপ্তার হন। ফলে, আন্দোলন আরো দানা বাঁধতে থাকে।

১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়। পরদিন ১৬ মার্চ সকাল ১০টায় বিখ্যাত আমতলায় ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ছাত্রজনতার সর্বসম্মতিক্রমে বলিষ্ঠ প্রত্যয়সম্পন্ন সাহসী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী ও আপোষহীন। তাঁর ভাষ্যমতে-‘বাংলা পাকিস্তানের শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ লোকের মাতৃভাষা। তাই বাংলাই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিৎ।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন-   উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ কিন্তু বাংলার ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিক তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনও জিন্নাহর পন্থা অনুসরণ করেন ও একই কথা বলেন। ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

এ দিকে কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা প্রহরীর নজর এড়িয়ে ছাত্রনেতাদের নিয়মিত ৫২-র ভাষা আন্দোলনের দিক নির্দেশনা দিতেন। ছাত্রনেতাদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগমীকাল রাতে আবার এস..। 'সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমরণ অনশনরত অবস্থায় ফরিদপুর জেলখানায় ছিলেন। সেদিনের বিক্ষোভ মিছিলে ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করে। বুলেটের নির্মম আঘাতে শহীদ হন বাংলা মায়ের বীর সন্তান রফিক, সালাম, বরকত ও আব্দুল জব্বারসহ আরো অনেকে। শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। পরের দিনের হরতালে ফরিদপুরে ছাত্রছাত্রী মিছিল করে জেলগেটে আসেন। ‘তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিল, 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাঙ্গালিদের শোষণ করা চলবেনা, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, আরো অনেক স্লোগান।

২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারামুক্তির বার্তা আসে। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে যে মিছিল বের হয়, সেটার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এছাড়া, তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে আলাপ করেন এবং তাঁর সুস্পষ্ট সমর্থন আদায় করেন। অন্যদিকে, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আরবি হরফে বাংলা লেখার পদ্ধতি চালু করার চেষ্টা করলে বঙ্গবন্ধু তার বিরোধীতা করে জনমত সৃষ্টি করেন।

মওলানা ভাসানী, শামসুল হকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ জেলখানায় বন্দি থাকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পিত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যারা ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম।’

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনার উপর ভর করে গঠিত যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয় এবং বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে সমসাময়িক রাজনীতি ও বাংলা ভাষার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন।

১৯৫৫ সালের ৫ জুন শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কেন্দ্রীয় আইনসভায় আওয়ামী লীগের জোড়াল দাবির মুখে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে বাংলা ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও রাষ্ট্রনেতা হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং সকল পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচলনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন।

নতুন ইতিহাস রচনা করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ দেন। জাতিসংঘে যা ছিল বাংলায় দেয়া প্রথম ভাষণ।

বাংলা ও বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, রাজনীতির অমর কবি, লড়াই সংগ্রামের অনন্য ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাংলা বর্ণমালার অমিয় অক্ষর ‘আমার সোনার বাংলা’য়, বেঁচে থাকবেন লাল সবুজের পতাকায় আপন আলোয় চিরভাস্বর হয়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। লেখা সংগ্রহ করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামীম।

তথ্যসূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী।


জাবি/হাকিম মাহি