ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শৈশব মাতানো ডাংগুলি

হেলাল নিরব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-১০ ৬:৪১:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-১২ ৮:০৩:৫৭ পিএম

শৈশবে ডাংগুলি খেলেননি এমন মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খেলা ডাংগুলি এখন প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।

তবে, একটা সময় বেশ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হতো এই খেলাটি। গ্রামাঞ্চলের অনেক শিশুর দিনের প্রায় অর্ধেকটা সময় কেটে যেত ডাংগুলি খেলে। গ্রামে জন্ম নিয়েছে অথচ ডাংগুলি খেলায় মাতেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া ছিল ভার। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে মোবাইল ফোনের বদৌলতে বদলে গেছে সেই প্রেক্ষাপট।

স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মনিটরেই এখন কিশোর-কিশোরীদের খেলার মাঠ। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার মাঝখানে বা মাঠে ডাংগুলি খেলার সেই চেনা ছবি এখন দেখতে পাওয়াই বরং অবাক করার বিষয়। এখন আর নেই গুলির পেছনে দৌড়ে হাঁপিয়ে ওঠা। মাঠে-ঘাটে, পাড়ায় পাড়ায় ডাংগুলির সেই ঠকঠক আওয়াজ মেশা বাতাস আর নেই। এক সময়কার ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় ডাংগুলি খেলাটি এখন শুধু খেলা হিসেবে বইয়ের পাতায় নামে প্রচলিত আছে।

ডাংগুলি একটি প্রাচীন খেলা। প্রায় ২৫০০ বছর আগে মৌর্য আমল থেকে এই খেলার সূচনা। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোসহ খেলাটি এক সময় পৃথিবীর বহু দেশে অনেক জনপ্রিয় ছিল।

ডাংগুলিকে ইংরেজীতে টিপক্যাট, নেপালি ভাষায় দান্দি-বিয়ো, ওড়িশায় গুলি-বদি, ফার্সিতে আলাক-দুলাক, বাংলায় ডাংগুলি (ডাঙ্গুলি), অসমিয়ায় তাং গুটি (তঙ্গ গুটি), মালায়ালামে কুট্টিয়ুম কলুম, তামিলে কিট্টি-পাল, পাঞ্জাবিতে গুঞ্জি-দন্ডা, পশতুতে লম্পা-দুগ্গি, কম্বোডিয়ায় কোন কো, ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় পাঠেল লেলে নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও আমাদের বাংলাদেশেই ডাংগুলি খেলার বিভিন্ন নাম আছে। অঞ্চলভেদে খেলাটি ড্যাংবাড়ি, গুটবাড়ি, ট্যামডাং, ভ্যাটাডান্ডা ইত্যাদি নামে পরিচিত।

দেড় থেকে দুই ফুট লম্বা একটি বা দুটি লাঠি (ডাং বা ডান্ডা), অপরটি প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা ও আরেকটি ছোট লাঠি (যা গুলি নামে পরিচিত)। গুলির বানানো লাঠিটির দুই প্রান্ত কিছুটা সুচাল করা থাকে। প্রথমটিকে ডান্ডা ও দ্বিতীয়টিকে গুলি বা ফুত্তি বলা হয়। প্রধানত কম বয়সের ছেলেরা খেলাটি খেললেও ডাংগুলি মেয়েরা খেলে না বললেই চলে। দুই থেকে পাঁচ-ছয়জন করে দুই দলে বিভক্ত হয়ে এটি খেলা হয়।

খেলার মাঠে ছোট্ট করে একটি লম্বালম্বি গর্ত করা হয়। টসের মাধ্যমে দু’দলের মাঝে যারা দান পায় (টসে জিতে), তাদের একজন গর্তের ওপর গুলি রেখে ডান্ডা মেরে তুলে শূন্যে থাকা অবস্থায় সেটিকে পরের বাড়িতে দূরে ফেলার চেষ্টা করে। প্রতিপক্ষ তখন চারদিকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে গুলিটি ধরে ফেলার জন্য। তারা যদি গুলিটি মাটিতে পড়ার আগে ধরে ফেলতে পারে, তাহলে ডান্ডা মারা খেলোয়াড়টি আউট হয়। আর না ধরতে পারলে প্রথম খেলোয়াড়টি তার ডান্ডা গর্তের ওপর রাখে এবং প্রতিপক্ষ গর্তের ওপর রাখা ডান্ডা লক্ষ করে গুলিটি ছুড়ে মারে। গুলিটি ডান্ডা ছুঁলে সে দান হারায়, আর না ছুঁলে সে আবার গুলিটি ডাণ্ডা দিয়ে তুলে দূরে পাঠায়। পরে সে গুলি থেকে গর্ত পর্যন্ত ডান্ডা দিয়ে মাপতে থাকে।

এ মাপ হয় ৭টি পদ্ধতিতে।  বাড়ি, দুড়ি, তেড়ি, চাঘল, চাম্পা, ঝেঁক ও মেক। এমন সাত মাপে হয় এক ফুল বা গুট, আর সাত ফুলে হয় এক লাল। ফুল ভাঙা থাকলে তা পরের খেলায় যোগ হয়। আউট না হওয়া পর্যন্ত একজন খেলোয়াড় খেলতে পারে, আউট হলে দ্বিতীয় একজন একই পদ্ধতিতে খেলবে। এভাবে সবাই আউট হয়ে গেলে বিপক্ষ দল দান পেয়ে খেলা শুরু করে। এভাবে যে দলের পয়েন্ট বেশি, খেলায় সেই দল হবে জয়ী। বস্তুত এ খেলাটি অনেকটা বর্তমান যুগের ক্রিকেটের সমতুল্য। এক্ষেত্রেও ক্যাচ হলে অথবা ডান্ডার আঘাত করে আউট করার নিয়ম আছে। বলা হয়ে থাকে, ভারতবর্ষের ডাংগুলি খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশরা ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিল।

খেলাটিতে তেমন কোনো সরঞ্জামের দরকার হয় না, হলে অন্যসব খেলার মতো এ খেলায়ও বেশ কিছু ঝুঁকি আছে। খেলার উপকরণ গুলিটি প্রতিপক্ষ ছুড়ে মারলে সেটা চোখে লেগে অনেক সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। দ্বিতীয়বার মারার পর এর তীব্র বেগ ও সুচাল প্রান্তের চোট এই খেলাকে দুর্ঘটনাপ্রবণ করে তুলতে পারে।

এছাড়াও হিন্দি লেখক প্রেমচাঁদ ‘গিলি-দন্ড’ নামে একটি ছোট গল্প লিখেছিলেন যাতে তিনি প্রাচীন মূল্যবোধ ও আবেগকে আধুনিক মূল্যবোধের সাথে তুলনা করেন এবং ভারতের বর্ণ বৈষম্যের ইঙ্গিতও দেন।

কালের আবর্তনে সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাচ্ছে এই গ্রামীণ খেলা। খেলাধুলার অভাবে যুবসমাজ ঝুঁকছে মাদকের দিকে। অনলাইনের সময় কাটানোর নেশা হয়ে উঠেছে মারাত্মক। এক সময় বিশ্বভারতীর পাঠভবনে ডাংগুলি খেলা হত। ক্রিকেটের ব্যাটসম্যানের ব্যাটের মতো ডাংও নিজস্ব থাকত। সেসব আজ ইতিহাস। তবু আশার কথা এই প্রাচীন খেলাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।

২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতের স্বনিম গুজরাট স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি ভদোদরায় গিল্লি ডান্ডার টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল। ইউনেস্কোর উপদেষ্টা কমিটি এবং আন্তর্জাতিক কাউন্সিল অব ট্র্যাডিশনাল স্পোর্টস অ্যান্ড গেমস (আইসিটিএসজি) পৃথিবীতে প্রায় মারা যাচ্ছে এমন সমস্ত ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া পুনরুদ্ধার ও প্রচার করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ক্রিকেট আসার পর অনেকটাই বিলীন হয়ে এসেছে ডাংগুলি। তাছাড়া আজ কিশোররা ব্যস্ত কম্পিউটার গেমস, মোবাইল গেমস নিয়ে। তাদের সামনে এসব খেলার নাম বললেও তারা নাক সিটকায়। তাদের কাছে এসব খেলা রূপকথার গল্পের মতো। তবে তারা নিঃসন্দেহে বঞ্চিত হচ্ছে প্রাকৃতিক বিনোদন ও প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়া থেকে। তারপরও আশা রাখছি, স্বমহিমায় ফিরে আসুক আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশব মাতানো ডাংগুলি।

লেখক: শিক্ষার্থী, গ্রিন ইউনিভার্সিটি।


ঢাকা/হাকিম মাহি