ঢাকা     শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৭ ||  ৩০ মহরম ১৪৪২

অলৌকিক আগমন

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৫৭, ২৩ মার্চ ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
অলৌকিক আগমন

কাঁচা-পাকা বরই খাচ্ছিলাম। দেখলাম লবন-মরিচ হাতে লেগে আছে, তাই আঙুলগুলো চেটে নিলাম। সময় খরচ করতে হবে গুনে গুনে। সামনে শুধু কাজ আর কাজ। কী সেই কাজ? লেখালেখি। গুনে গুনে শ খানেক কবিতা আর কলামের সাতকাহন লেখে ফেলতে হবে। আগামী বইমেলায় কাব্যগ্রন্থ বের করতেই হবে।

চ্যালেঞ্জটা অবশ্য না নেওয়ারই পক্ষে ছিলাম, কিন্তু লিয়াকে কে মানাবে? বড় মুখ করে সব বান্ধবীদের বলে দিয়েছেন, আমার কবি কবি ভাব আর মহাসাগরীয় পাণ্ডিত্যের কথা। এটাও বলে দিয়েছে, যে আমি নাকি বই বের করতে চলেছি। মেয়েগুলো দলে দলে রিকোয়েস্ট দিচ্ছে, কবিতার পোস্ট শেয়ার দিচ্ছে, দুলাভাই দুলাভাই করে কানের ভেতর থাকা ঝিঁঝি পোকাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিচ্ছে আজকাল।

এই নিয়ে লিখতে বসা। কী লিখব, কী লিখব এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে ল্যাপটপে শ্যামল মিত্রের গোটাকতেক গান শোনা হয়ে গেছে। আকাশ নিয়ে লিখব, নাকি প্রেমিকা, নাকি আবার প্রেমিকার গোপন কথার ফুলঝুরি। ভাবনাটাও বলে দেবো! যেখানে বসে লিখব, সেটা কি আদৌও কোনো কবি আর কবিতার জায়গা!

মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা করছে। মনে হচ্ছে গর্ভের বাচ্চাটা প্রসবের বেলায় ঠিক শেষবেলায় আটকে আছে। কিন্তু পৃথিবীর মুখ দেখতে পারছে না। ওই একই কথা। দু’একটা লাইন মগজ চষে বের করা আর বাচ্চা প্রসব তো কোনো কোনো সময় এক কথাই হয়। শেষে মাথাকে কিছু ঘুষ দিয়ে হলেও লেখা বের করার চেষ্টা করছি। হচ্ছে না! হাতের কাজ রাতের ঘাড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে চলেছি। ঘুমের ঘোরে মনোহর সব দৃশ্য দেখছি মাথার চোখ ভরে। স্বপ্নগুলোকে ঠিকঠাক খাঁচায় বন্দি করে রাখতে পারলে সত্যিই দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে যশ-খ্যাতি অর্জন করতে পারতাম।

সাত-পাঁচ ভেবে হলের ছাঁদে উঠতেই চোখে পড়ে ঝলমলে কী সুন্দর দৃশ্য। বিধিবাম! এ সুখ কপালে আর বেশিক্ষণ সইলো না। দূরে তাঁকাতেই রোকেয়া হলের ৭ মার্চ ভবনের শৃঙ্গভাগ অবলোকন করলাম। আবার মাথায় আসলো লিয়ার কথা। ওর আলয় তো রোকেয়া হল আর ওর আবদার তো কবিতা। মাথায় আবারো কবিতার ঝটিকা এসে আরামের ঝাণ্ডা উড়িয়ে নিয়ে গেলো। এমন না যে আমি লিখি না। নিয়মিতই তো লিখি! কখনো কবিতা, কখনো কলাম, কখনো ফিচার আবার কখনো রম্য। মাথায় হুট করে যা আসতো, তাই লিখতাম। লিখে পুরস্কারও পাচ্ছি। কিন্তু এবার নাস্তানাবুদ হওয়ার উপক্রম।

হঠাৎ ফোনে বেজে উঠল মহাকালের সুপরিচিত ডাক। লিয়া কল দিয়েছে। ধরতেও বুক ধুকধুক করছে। নিথর হাতখানা ফোনের উপর রেখে এপাশ-থেকে ওপাশ টান দিতেই লিয়ার মুখ আর কান ভার্চুয়ালি আমার কান আর মুখের কাছাকাছি চলে আসলো।

ওপাশ থেকে কথা আসছে, কেমন আছো? আমি, হুম ভালো, তুমি কেমন আছো? ওপাশ থেকে হাসি আসছে, দুলাভাই দুলাভাই। কোনোমতে শুনলাম যে ওই ভালোই আছে, তবে কী জানি একটা হয়েছে। ওপাশ থেকে শব্দবোমা আসছে, কবিতা কবিতা।

হঠাৎ একটা চিৎকার শুনলাম। হৈচৈ বেধে গেলো। ওপাশ থেকে হাউমাউ আসছে, কী হলো কী হলো। লিয়া বলল, রাখছি, রোমমেট পিছলে পড়ে গেছে।  বলতে না বলতেই টুট টুট, কল কেটে গেলো।

যাক বাবা, বাঁচলাম। লিখতে তো হবেই। মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। ভাবলাম, একটা কিছু পড়ে ফেলি। কিছু একটা পড়ার পর সেখান থেকে শব্দ, বাক্য, রস নিয়ে পূর্বে অনেকবার অনেক কিছু লিখে ফেলেছিলাম। আশ আশা আইজ্যাক আজিমভের সায়েন্স ফিকশন গল্প ‘নাইটফলের’ দিকে গেলো। পড়াও শেষ। রাত ঠিক আটটা। এদিকে পেটের ভেতরে কারা যেন প্লেট সাজিয়ে খেতে বসে আছে, আর ওই দিকে প্রিয়তমা সর্বভুকের মতো কবিতা গিলবার আশে উদগ্রীব। দোটানা। কবিতার নাম দিলাম ‘দোটানা’।

‘এদিক টানে, ওদিক টানে, আরো টানে মাথা,

টানে টানে টনটন করে মগজে কাইয়া ব্যথা।’

দুই লাইনে লেখা শেষ। লেখার পর সমাধান আসলো মাথায়। লেখাটার ছবি তুলে লিয়াকে পাঠায় দেই, আর তারপর কাগজটা রসদ হিসেবে পেটে চালান করে দেই। লেখারও সমাধান আর খিদারও ইতি।

আরজ আলী মাতুব্বর যেমন বই হারিয়ে পুত্র বিয়োগের শোক পেয়েছিলেন, আমিও তেমনি বই নষ্টে অন্তত গার্লফ্রেন্ড বিয়োগের শোক পাচ্ছি। জানালাগুলো বন্ধ, ধুলো-ময়লারা উড়ন্ত। জানালার ছোট্ট ফুটো দিয়ে নির্বিঘ্নে একরাশি আলোর কণা ভেসে আসছে। মাথায় আসলো,

(আলোর কণায় জীবন গানায় দ্যুলোক হলো সাড়া,

যৌবন মম সমরক্ষেত্র সমাপনী রণে দাঁড়া।

বন্ধ ঘরে আসতে পারলে প্রভুর দীপ্ত আলো,

উৎপাটনে উপচ্ছায়া দেশের জ্বালো মশাল জ্বালো।)

লেখাটা কলমের খোঁচায় কাগজে লিখে রাখলাম। সঙ্গোপন রেখে দিলাম লিয়ার উপহার দেওয়া 'কবি' বইটার মাঝামাঝি কোনো একটা পৃষ্ঠায়। নতুন রুমে কেটে গেলো আরো কয়েক জোড়া সপ্তাহ। এই কয়েকটা দিন খুবই বিষন্ন ছিল। কালেভদ্রে কথা হতো লিয়ার সাথে। অকস্মাৎ একদিন ফোনে রিং বেজে উঠল। কবিতা কই আমার? লেখা হয়নি, আর ক’টা দিন সবুর করো লেখনী ধরেছি। ওপাশ থেকে, ফাজলামো হচ্ছে। কই নাতো! বিটলামি হচ্ছে। বলে দিলাম, লিখতে পারবো না আমি। ওপাশ থেকে কর্কশ আওয়াজ 'ব্রেকাপ'।

মাস কেটে যাওয়ার পর লিয়াকে একা আবিষ্কার করলাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরির ঠিক সামনে। আমার দিকে মাত্র একবার তাঁকিয়ে সরলরেখা বরাবর পা চালানো শুরু করল।  আমিও পেছন পেছন বক্ররেখার সাপের মতো ধাওয়া করে চলেছি। এই লিয়া। কল্লোলিত নদীর ওপাশ থেকে, ‘কিছু বলবেন কী?’

কিছু না, কথা বলবো তোমার সঙ্গে। শুনবা? বলে ফেলেন। তুমি করে বলো না প্লিজ। লিয়া! ও লিয়া! কবিতা শুনবে? এই এখন বানিয়ে বানিয়ে আউড়ে দিচ্ছি.....

লিয়া মম প্রিয়া সম, যখন আপনি করে কয়,

কেন যেন বিয়ার আগেই বিপত্নীক মনে হয়।

 

কেমন হয়েছে লিয়া? লিয়া বলে, মাথা হইছে! যা বলার বলো তো!

তোমার বইটা ফেরত দিয়ে দিতে চাই, লিয়া। ও এটাই বলতে এসেছো?

আমি, হুম। দেও দেও। এই নাও। একটা কেন? বাকিগুলা কই? আমি, ওইগুলো টাকার অভাবে ফেসবুক লাইভে এসে বিক্রি করার দলে চলে গেছিল। দাও! একটাই দাও (ফকির)।

আমিও আলবেদা উত্তকীর্ণ করে বইটা ব্যাগে গুঁজে দিয়ে পত্রপাঠ বিদায় নিলাম। বুকে একটু বেশীই ব্যাথা অনুভব হচ্ছিল। নিজের প্রেম ফিরিয়ে নিতে কষ্ট নেই, কিন্তু অপরের উপহারের প্রেম ফিরানো যেন অজাচার। তবুও যেন ওই চাঁদের অনুভূতিবিন্দু আজ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল। বুকের কষ্ট বুকে রেখে আর লিয়ার প্রেম আঁধারে ঢেকে কেটে গেলো আরো কয়েকটা দিন।

হঠাৎ একদিন একটু বেশিই চমকে উঠলাম পত্রিকার পাতা উল্টাতে গিয়ে। চারটি লাইন খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি, তা ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে, মনে হচ্ছে খুব আপন চারটি লাইন। লাইনগুলো বারবার পড়ে যাচ্ছি।

‘আলোর কণায় জীবন গানায় দ্যুলোক হলো সাড়া,

যৌবন মম সমরক্ষেত্র সমাপনি রণে দাঁড়া।

বন্ধ ঘরে আসতে পারলে প্রভুর দীপ্ত আলো,

উৎপাটনে উপচ্ছায়া জ্বালো মশাল জ্বালো।’

লাইনগুলো মনে হচ্ছিল জাতীয় লাইনে নির্বাচিত হয়েছে। সম্প্রতি করোনা প্রতিরোধের অগ্নি কথনিকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে লাইনগুলো। করোনা সচেতনতায় প্রত্যেকটা সংগঠন তাদের লিফলেটে এই চারটি লাইনই বারবার ব্যবহার করছে। দেশের শিল্পী, রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র-শিক্ষক সবায়ই উচ্চানিনাদে সর্বত্র পাঠ করে চলেছে লাইনগুলো।

আরে এগুলো তো আমার লেখা লাইন।  কেমনে কী? ও মনে পড়েছে! আমি তো খেলাচ্ছলে লাইনগুলো লিখেছিলাম। কোথায় রেখেছিলাম যেন? (স্বগোক্তি)

ও! লিয়ার উপহার দেওয়া বইয়ে রেখেছিলাম, আর বইটা তো ফেরৎ দিয়ে দিয়েছিলাম। লিয়ার কাজ এটা! ভয় নিয়ে কল করলাম লিয়াকে। একবার, দুইবার, তিনবার..। ওপাশ থেকে লাইনগুলো শোনা গেলো কয়েকবার। লাইনগুলো কপিরাইট ছাড়া ব্যবহার কেন করেছো লিয়া? লিয়া বলল, কপিরাইট বড় নাকি সার্থকতা বড়? আমি, স্বার্থপরতা বড়! নাবিল! হা হা।

কীভাবে এত এত প্রচার হয়েছে লিয়া? লিয়া নাকি করোনা প্রতিরোধবিষয়ক তরুণদের সংগঠন ‘করোনা বিরোধী তরুণ সচেতনতা সংঘ’ এর স্লোগান নির্বাচনের দিন লাইনগুলো দিয়ে দিয়েছিল। বাছাইও হয়ে যায়।  রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ে লাইনগুলো। লিফলেটে-লেখায়-পোর্টালে-মুখেমুখে। লাখো মানুষের বাঁচার আলো খুঁজে পাওয়ার লাইন হয়ে গেছে আমার লেখা কয়েকটা লাইন। সবাই আজ বল পায় লাইনগুলোতে। এ এক অলৌকিক আগমনী রচনা।

আমি সাথে সাথে ধন্যবাদ জানিয়ে কলটা কেটে দিলাম। সৃষ্টির রহস্য প্রকাশে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য তো আপাতদৃষ্টিতে। মাথা থেকে কবিতা লিখার ভূত ঝেটিয়ে বিদায় করে দিলাম। কবিতা তো লিখা হয়েই গেছে। আমার কবিতা তো চিলে ঘুড়ি হয়ে আজ সারা দেশে।

কল আসলো। চলো বিকেলে দেখা করি, নাবিল। করোনার ভয় নাই নাকি? ওপাশ থেকে, কাল তো বাসায় চলে যাচ্ছিই! তাইলে তো...। চা খেতে খেতে নিজ এলাকায় করোনা প্রতিরোধে কি কি করা যায়, সেসব নিয়ে আলোচনা করে নিলাম। বাসায় গিয়ে কাজ শুরু করব।

দু’জনের প্রেমালাপের মাঝে করোনার বর্ডার রেখেই বিদায় নিয়ে ফিরে আসলাম। আবার হয়তো দেখো হবে চিরচেনা ক্যাম্পাসে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাবি/হাকিম মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়