ঢাকা, বুধবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৩ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রকৃতি ও আমাদের সম্পর্ক

শুভ দে : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৯ ৪:০২:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৯ ৪:০২:৩১ পিএম

প্রকৃতির একটা নিজস্ব রূপ আছে। আর সে রূপ হলো সতেজতা। যখন প্রকৃতি তার সতেজতা হারিয়ে ফেলে, তখন এটি বিরূপ আকার ধারণ করে। কখনো সিডর, আইলা, ফণীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্লেগ, বসন্ত ও করোনার মতো মহামারি দিয়ে। এগুলো এক কথায় বলা যেতে পারে প্রকৃতির প্রতিশোধ।

মানুষ যেমন গাছ কেটে, কার্বেন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি করে, পানি দূষণ করে, পারমাণবিক বোমা বানিয়ে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, তেমনি কালে কালে প্রকৃতিও করোনার মতো মহামারি দিয়ে মানুষ নিধন কর্মসূচি চালায়। এটি আসলে ইটটি মেরে পাটকেলটি খাওয়ার মতো। এতে প্রকৃতির দোষ নেই। ওর আচরণ আসলে সফটওয়্যারের মতো। যেমন প্রশ্ন, তার তেমন উত্তর।

এইতো কয়েক দিন আগের কথা, সংবাদে দেখা গেলো, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টের কাছে ডলফিনের দুটি দলকে খেলা করতে। দুটি দলে মোট ২০/২৫টা ডলফিন আছে। ৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডের ভিডিওটি আমাদের সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্থানীয়দের মতে, গত তিন দশকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এভাবে ডলফিন খেলা করতে দেখা যায়নি। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটক কিংবা স্থানীয়দের নামতে দেওয়া হচ্ছে না, ফলে  কমে  গেছে দূষণ, আর দূর হয়েছে সামুদ্রিক জীবদের চলাচলের অসুবিধা।

এতে করে সমুদ্র তার সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে পেরেছে নিজস্বতা। ডলফিন তার বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দে মেতে মানুষকে যেন বলতে চাইছে, দেখো এটা কিন্তু আমাদের জায়গা, তোমরা আমাদের বিরক্ত করতে এসো না।

ঢাকাসহ সারা দেশের অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার পাশাপাশি নৌ-যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় নদীগুলো এখন শান্ত। এখন আর যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলার প্রতিযোগিতা নেই। তাই আশা করা যায়, দূষিত বুড়িগঙ্গা হয়ে উঠবে ইতালীর ভেনিসের খালের মতো স্বচ্ছ, থাকবে না অসহনীয় দুর্গন্ধ।

প্রকৃতিকে বিরক্ত করার ফলাফল আমরা অনেকবারই পেয়েছি, কিন্তু কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি। করোনা হয়তো আবার শেখাতে এসেছে যে, প্রকৃতিকে শান্তিতে থাকতে দাও, নইলে প্রকৃতির অংশ হিসেবে আমিই তাকে তার নিজস্বতা ফিরিয়ে দেব।

বলা হয়ে থাকে, প্রাচীন অসহায় মানুষ পাথরে পাথরে ঘর্ষণের মাধ্যমে যেদিন প্রথম আগুন জ্বালাল এবং সেটা থেকে যে ধোঁয়া সৃষ্টি হলো, সেখান থেকেই শুরু মানব সৃষ্ট বায়ুদূষণ। এরপর হাজার বছর কেটে গেছে সভ্যতার অনেক পরিবর্তন এসেছে, গোটা পৃথিবী বলতে গেলে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। আর এই অবস্থায় আসতে মানুষ প্রকৃতির উপর করেছে অনেক অত্যাচার। পৃথিবীর মাটি, পানি, বাতাসকে করেছে বিষাক্ত, বাড়িয়ে দিয়েছে তাপমাত্রা, মেরুতে জমে থাকা বরফ যাচ্ছে গলে, হুমকি দিচ্ছে সমুদ্র তলের উচ্চতা বৃদ্ধি করে উপকূলীয় এলাকা নিঃশেষ করার।

পরিবেশ প্রতিবেশ যখন আমাদের খামখেয়ালিতে অতিষ্ঠ, কেউ কারো কথা শুনছে না, প্রকৃতির উপর অত্যাচার চালিয়েই যাচ্ছে, তখন মনে হয় এসবের লাগাম টেনে ধরল করোনা। ভয়ানক করোনার তাণ্ডবে মানুষ যা লাভ করেছে, তা হলো বায়ুদূষণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের উদ্গিরণ হ্রাস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যম সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ কমে যাওয়ার খবর। করোনা সংক্রমণের হটস্পট উহানের সব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়, চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, এতে করে বিশাল অঞ্চল জুড়ে সড়ক, বিমান, রেল যোগাযোগ থেমে যায়। ফল হিসেবে কমে যায় বায়ুদূষণ।

নাসা এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা দ্বারা পরিচালিত দূষণ-পর্যবেক্ষণকারী ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, কোয়ারেন্টাইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে বায়ুদূষণ ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে। বিভিন্ন শিল্পস্থাপনা, কল-কারখানা থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

ফিনল্যান্ডের সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের বিশ্লেষক লরী মিল্লিভির্টারের মতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় জানুয়ারির শেষের দিকে চার সপ্তাহের মধ্যে চীনের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ইতালির কথা বলতে গেলে, পুরো দেশটাই এখন লকডাউন। সড়ক, নৌ, আকাশ, রেলসহ সব যোগাযোগ বন্ধ। নৌ-চলাচল বন্ধের কারণে ভেনিসের নোংরা খালগুলো এখন পরিস্কার হতে শুরু করেছে, পানির নীচে মাছ খেলা করতে দেখা যাচ্ছে। ইতালীর বাতাসেও চীনের মতো নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের নাটকীয় হ্রাস লক্ষ করা গেছে। ওয়াশিংটন পোষ্টের এক বিশ্লেষনে দেখা যায়, উত্তর ইতালীতে এই হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি।

মানুষ তার প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাতাসে যোগ করছে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম কণা। বাতাসে অবস্থানরত সূক্ষ্ম কণাগুলো, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ, সেটিও বিশ্বব্যাপী কমতে শুরু করেছে। সানফ্রাসিস্কোতে বাতাসের সূক্ষ্ম কণার গড় ঘনত্ব অতীতের পাঁচ বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে বলে ধারণা করা হয়। ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কণাগুলোর পরিমাণ বাতাসে কমে গেলে হ্রাস পাবে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ।

বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন, ওজোন স্তরের ক্ষয়, সমুদ্র সমতলের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো উন্নত বিশ্বের শিল্প-কারখানা থেকে মাত্রাতিরিক্ত বর্জ ও দূষণ নির্গমনের ফল। এ নিয়ে সারাবিশ্বে অনেক আলোচনা, চুক্তি হলেও সবার সদিচ্ছা প্রকাশ পায়নি। আর এ কারণে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তনও সাধিত হয়নি। করোনা সবার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে উপেক্ষা করে বাধ্য করেছে প্রকৃতি বিনাশী সব কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখতে।

এতে স্পষ্ট হলো, আমরাই পারি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব রূপ-বৈচিত্র ফিরিয়ে দিতে। তা না হলে প্রকৃতিই বরং আমাদের বাধ্য করবে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে। তাই সময় থাকতে আমরা প্রকৃতি দূষণ থেকে সরে আসি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


মাভাবিপ্রবি/হাকিম মাহি