ঢাকা, সোমবার, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘শুধু গানে চলবে না, আমার স্বপ্ন আরও বড়’

গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-১০ ২:২৭:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-১০ ২:২৭:১২ পিএম

পারশা মাহজাবীন পূর্ণী বগুড়ার মেয়ে। বর্তমানে সে মিলেনিয়াম স্কলাস্টিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। পারশা নানা রকম গান গেয়ে সবার কাছে পরিচিত। ইউটিউবে ঢুকলেই চোখে পড়বে পারশার গানের ভিডিও।

২০১৭ সালে চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠে সেরা ৩০ জনের একজন ছিল এই খুদে গায়িকা। তাকে নিয়ে লিখেছে কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত।

পারশার গানের হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে ছোটবেলায়। বয়স যখন তিন বছর তখন মায়ের হাত ধরে বড় ভাইয়ের গানের একাডেমিতে যাওয়া হতো। মায়ের কোলে বসে বসে সবার গান শুনতে শুনতে একদিন ঘটলো মহাকাণ্ড। সে গানের শিক্ষকসহ সবার উদ্দেশে ছুড়ল এক প্রশ্ন। কেউ দিতে পারল না সে প্রশ্নের জবাব। জাদুর মতো নাকি সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেয় পারশা, এই গল্প শুনেছে সে মায়ের মুখে। গানের শিক্ষক এই জবাব শুনে কিছুটা চমকে পারশার মা’কে বলেন, মেয়েকে একাডেমিতে ভর্তি করতে হবে না, ওকে প্রতিদিন নিয়ে আসেন। পাঁচ বছর বয়সে বগুড়ার উচ্চারণ একাডেমিতে গান শেখার জন্য ভর্তি হয় পারশা।

২০১৭ সালে মায়ের আবদারেই অডিশন দেয় চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠে। তখন পারশা পড়ছে দশম শ্রেণিতে। প্রথমে এতটা গুরুত্ব দেয়নি এই পারশা, কেননা মাথায় একটা প্রশ্ন জাগছিল তার, সে সবার থেকে ছোট। তার কাছেই জানতে চাইলাম সে অভিজ্ঞতার কথা।

পারশা বলল, ‘প্রথম অডিশনেই খুরশিদ আলম স্যার, স্বপন স্যার ও একরামুল স্যারের কাছ থেকে বাহবা পেয়েছি, সেটা আমার কল্পনার বাইরেই ছিল বলা যায়। যখন ঢাকায় গেলাম, জীবনের প্রথম নিজের সবচেয়ে প্রিয় ক্লাসিক্যাল শিল্পী মিতালি মুখার্জি ম্যামের সাথে দেখা হলো। ওই দিনগুলো আমার জন্য খুব স্মরণীয় বলা যায়।

‘বন্যা ম্যাম, সামিনা চৌধুরী ম্যাম, কুমার বিশ্বজিৎ স্যার, মিতালি ম্যাম, আগুন স্যার, রুমানা ম্যাম সবার কাছ থেকেই প্রতিনিয়ত গানের নানা বিষয়ে জানতে পেরেছি। আমি সত্যি এতটা আশাই করিনি! আমি যদিও বেশি দূর যেতে পারিনি, কারণ আমার তখন এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষা চলছিল। ভোর ৮টায় স্টুডিওতে যেতে হতো এরপর শুটিং, মেকআপ,খাওয়া-দাওয়া করতে করতে আবার ভোর ৪টা-৫টা বেজে যেতো। তখনি আবার রওনা দিয়ে বগুড়ায় এসে দুপুরে পরীক্ষায় উপস্থিত হওয়া খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াতো’, বলে সে।

পারশা আরও বলে, ‘আমি ডেঞ্জার জোনে পড়ার পর কিছুটা হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম, কেননা আমি আর চাইলেও বেশিদূর যেতে পারতাম না আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার কারণে। তবে, এখন পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছি এবারের সিজনে যাওয়ার জন্য।

গানের পাশাপাশি আঁকাআকিতেও হাত পাকিয়েছে সে। বয়স যখন একবছর, মা তখন খেলনার বদলে সামনে রঙ-পেন্সিল দিয়েছিল, তাই বলাই যায় পারশার আঁকাআঁকির হাতেখড়ি একবছর থেকেই। ছোট বেলায় মনের খুশিতে দাগাদাগি আঁকাতে রূপ নিলেও৷ বয়স যখন সাত বছর, তখন বগুড়ায় একটা আর্ট স্কুলে ভর্তি হলো পারশা। আঁকাআঁকি করে প্রায় পাঁচ ডজন পুরস্কার পেয়েছে পারশা।

তবে একটা বিশেষ স্মৃতিচারণ করলো ফোন আলাপের সময়। পারশা বলল, ‘আমি যেখানে আর্ট শিখতাম, ওখানে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। আমি তৃতীয় স্থান অর্জন করলাম। চিত্রশিল্পী হাশেম খান আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন, তখন আমার বয়স মাত্র ৫। ব্যাপারটা অনেক আনন্দের আমার কাছে। আমি তখন ছবি এঁকে এঁকে সেগুলোয় প্রাইজ ট্যাগ

বসিয়ে আব্বুর কাছে বিক্রি করতাম! ব্যাপারটা ভাবলেই হাসি পায় এখন। পাশাপাশি এটাও মনে হয় যে, এভাবেই তারা আমাকে এতটা উৎসাহ দিয়েছে সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোতে।’

এখন পর্যন্ত প্রায় শখানেক পুরস্কার রয়েছে পারশার ঘরে। বলা যায় ছোটখাটো পুরস্কারের জাদুঘর। পারশার নামের পাশে রয়েছে জেলা, উপজেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের খেতাব। রবীন্দ্র সংগীতে বিভাগীয় পর্যায়ে দুইবার, জেলা পর্যায়ে নজরুল সংগীত, উচ্চাঙ্গসংগীতে রয়েছে একবার সেরা হওয়ার খেতাব।

পারশার গানের সাথে সবসময় দেখা যায় একটা পাখি। জানতে চাইলাম রহস্যটা, গানের সাথে পাখির সম্পর্কটা, ফোনে খানিকটা হাসতে হাসতে পারশা বলল, ‘আসলে রহস্য নেই, ছোটবেলা থেকেই পাখির প্রতি আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করতো। আমার পাখিটার নাম ‘অলি’। আমার অলি পাখির গল্পটা খুব বড় নয়, আমি গেলো অক্টোবর মাসে বাবার কাছ থেকে উপহার পেয়েছি পাখিটা। আমার সব গানেই তাকে দেখার রহস্য হলো এটাই যে, সে আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও থাকবে না। আমার গান সে ভীষণ পছন্দ করে এবং নিজে গাওয়ার চেষ্টাও করে আমার সাথে। আমার শ্রোতাদের এখন নিজের দিকে সে টেনে নিয়েছে। শ্রোতারা আমার গান শোনার চেয়ে অলির গান শুনতে বেশি পছন্দ করে ইদানিং!’

গান নিয়ে কোনো বিশেষ স্মৃতি জানতে চাইলে পারশা বলে, ‘আমার জীবনের প্রথম গান বলতে আমার নিজ হাতে তোলা প্রথম গান হলো ‘যাও পাখি বলো তারে’। আমাকে আমার ওস্তাদজি ৮ বছর পর্যন্ত হারমোনিয়ামে কোনো গান তুলতে দেননি। কারণ, তিনি চাইতেন আমি আগে আমার গলা তৈরি করি। তাও লুকিয়ে লুকিয়ে বাসায় মাঝে মাঝে হারমোনিয়াম নিয়ে বসতাম। তখন মনপুরা ছবি কেবল বের হয়েছে। আমি জানি না কীভাবে কিছু না জেনেই আমি নিজে নিজে সেই গানটা তুলে ফেললাম হারমোনিয়ামে। ওস্তাদজি আমার এই উন্নতি দেখে আমাকে আর মানা করেননি গান তুলতে।’

প্রায় স্টেজ শো’তে গান করছে পারশা। সর্বশেষ আর্মি গলফ ক্লাবে পারফর্ম করেছে। প্রতিমাসে কম করে হলেও একটা শো’তে পারফর্ম করে থাকে। তবে আপাতত পড়াশোনার জন্য ফুলদমে গানের সাথে যুক্ত থাকতে রাজি নয় সে। ভবিষ্যতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হতে চায় পারশা।

গান নিয়ে পারশার নিজের মতো কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বটে। ছোটবেলা থেকেই সবার থেকে ভিন্ন ভাবতে বেশি পছন্দ করে সে। তাই অন্যের প্ল্যাটফর্মে গাওয়ার চেয়ে নিজে প্ল্যাটফর্ম বানানোর চিন্তা করছে। পারশা বলে, ‘গানটাকে আমি মূল হিসেবে কখনো ধরি না, এটা এখন নেশার মতো হয়ে গেছে। না করলে ভালো লাগে না, তাই করছি৷ জীবনে কিছু লক্ষ্য আছে, যেগুলো একদিন পূরণ করব আশা আছে। আপাতত কোথাও গান করার পরিকল্পনা নেই সেভাবে। কারণ, আমি এইটা ভাবি যে, আমাকে নিজেকেই নিজের তুলতে হবে। আমার হাতে যদি ক্ষমতা থাকে, আমি আরও দশটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারব। তাই শুধু গান করলেই আমার চলবে না, আমার স্বপ্নটা আরও বড়।

পরিশেষে জানতে চাইলাম করোনায় আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। অবসরে এই সময়গুলো কীভাবে কাটছে? পারশা শোনাল কিছুটা হতাশার কথা। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী, সেহেতু সে জানে না কবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তাই কিছুটা মানসিকভাবে দুর্বল।

পারশা বলে, ‘বাসা থেকে বেশি বের হই না, সবসময় বাসাতেই থাকা হয় বলা যায়। করোনার আগে কলেজ, শো কিংবা কোথাও হঠাৎ ঘুরতে যাওয়া হলে বের হওয়া হতো। তাই বাসায় থাকতে খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না এখন বলা যায়। করোনার দিনগুলোতে পাখি আর গান-বাজনার সাথে ভালোই দিন কাটছে আমার।’


ঢাকা/হাকিম মাহি