ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ট্যুরিজমে দেশের ব্র্যান্ডিং ও অর্থনৈতিক উন্নতি

মাহবুব এ রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-১০ ৪:৫৫:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-১০ ৫:১৫:৪৪ পিএম

ভ্রমণকন্যা এলিজা বিনতে এলাহী। ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। দেশ ভ্রমণ ছাড়াও ছুটেছেন বিদেশের পথে। তার সর্বশেষ ভ্রমণের তালিকায় রয়েছে ৪৯তম দেশ মিয়ানমার।

১৯৯৯ সালে নেপাল ভ্রমণের মাধ্যমে তার বিদেশ ভ্রমণ শুরু। এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতোমধ্যে তাঁর দুটি প্রকাশনা রয়েছে। এর একটি ‘এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি’ আরেকটি ‘এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি-২’। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বপ্রেমী এলিজা তার অনুরাগের জায়গা থেকেই দেশে পর্যটনের সম্ভাবনাময় খাত হেরিটেজ ট্যুরিজম গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছেন। এলিজার সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব এ রহমান

মাহবুব: কোথায় আছেন এখন, ব্যস্ততা কী নিয়ে?

এলিজা: ঢাকায় বাসাতেই আছি। লেখালেখিতেই সময় পার হচ্ছে। আমার একটি বইয়ের প্রকাশনার কাজ করছি।

মাহবুব: আপনার এই ভ্রমণের শুরুর গল্পটা যদি একটু বলেন।

এলিজা: ভ্রমণ শুরু করেছি ১৯৯৯ সাল থেকে। পৃথিবী ঘুরতে গিয়ে নিজ দেশের স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার ইচ্ছা হয়। এরপর ২০১৬ সাল থেকে হেরিটেজ ট্যুর শুরু করি। ঢাকার বলধা গার্ডেন দিয়ে আমার এ যাত্রা শুরু হয়। আমার এই প্রজেক্টের নাম QUEST. A heritage Journey of Bangladesh, যা আমার ব্যক্তিগত অর্থায়নে করা।

বাংলাদেশের খুব কম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা আছে, যেগুলো সাধারণের কাছে পরিচিত। দেখার উপযোগী বিভিন্ন জেলায় অল্প কিছু স্থাপনা আছে, যা বহুল পরিচিত। আমি মূলত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্ততরের প্রকাশিত বই, বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ারের বই এবং আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়ার (যিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ নিয়ে গবেষণা করেছেন) বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জেলাগুলো ঘুরছি।

এমন কিছু স্থাপনার তথ্য আমি পেয়েছি, যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আছে। এমনকি সেই জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও সেই স্থাপনা সম্পর্কে জানেন না। সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরার পরও একই ধরনের ফিডব্যাক পেয়েছি, ‘আপু এটা আমার জেলায় আমি জানি না!’

উদাহরণস্বরূপ– ঠাকুরগাঁ জেলার গোরকুই কুপ (যা বাংলাদেশের একমাত্র বেলে পাথরের কূপ), নওগাঁ জেলায় জগদ্দল বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার (সেটি খনন করেছেন আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া), পঞ্চগড়ের ভিতর গড় (বাংলাদেশের একমাত্র দুর্গ নগরী), গাইবান্ধা জেলার প্রাচীন বোগদহ বিহার, জয়পুরহাট পাথরঘাটা প্রাচীন নগরী, নওগাঁ জেলার দিবর দিঘী স্তম্ভ, ভীমের পান্টি, নীলফামারী জেলার ধর্ম পালের গড়, পটুয়াখালীর মসজিদবাড়ি, সৈয়দপুরের ফিদা আলি ইনস্টিটিউট।

বিভিন্ন জেলার প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। জেলার প্রাচীন ইতিহাস অনেকেই জানতেন না। ৫ হাজার বছরের পুরনো গাইবান্ধার রাজা বিরাট নগর। বিক্রমপুর জেলার নগর কসবা, ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা ৩০০০ বছর আগের প্রাচীন শহর, হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রাম এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রাম।

এই তথ্যগুলো অনেকে জানেন না, কেউ কেউ আবার ভুল তথ্য জানেন। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোও আমাদের হেড়িটেজের অংশ। চাপাইনবাবগঞ্জের কোল সম্প্রদায় সবচেয়ে ছোট সম্প্রদায় বাংলাদেশে এখন। তাছাড়া ঈশ্বরদী রয়েছে গুড়িয়া সম্প্রদায়, যারা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।

মাহবুব: এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বাইরে কতটি দেশ ঘুরা হয়েছে আপনার, ভ্রমণ নিয়ে পরবর্তী টার্গেট কী?

এলিজা: ৪৯টি দেশ শেষ হলো। ইচ্ছে আছে পুরো বিশ্ব ঘুরে দেখবার। আর সেই সাথে, আমি চাই বাংলাদেশ বিশ্ব পর্যটকদের কাছে হেরিটেজ ট্যুরিজমের জন্য একটি অনন্য গন্তব্য হয়ে উঠুক। সেই নিমিত্তে আমাদের কাজ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আবেদন, হেরিটেজ ট্যুরিজম-ডে ঘোষণা করা হোক। যাতে প্রতিবছর সারা দেশে তথা ৬৪ জেলায় সেই দিবসটি পালিত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও দেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা হোক। বাংলাদেশসহ বিশ্ব ভ্রমণের আর্কাইভ করার কাজে হাত দিয়েছি প্রকাশনা করবার ইচ্ছায়।

মাহবুব: কোন মানুষ বা কোন কাজ আপনাকে বেশি ভ্রমণের পেছনে অনুপ্রেরণা দিয়েছে বা দিচ্ছে?

এলিজা: আমি কখনোই গতানুগতিক জীবনযাপন করতে চাইনি। আমার কাছে জীবন উপভোগের বিষয়। আমি উপভোগ করি ভ্রমণের মাধ্যমে। প্রথমে আমি নিজেই নিজেকে অনুপ্রাণিত করেছি। আর এখন অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে সারা দেশের মানুষ।

মাহবুব: কখনো কি মনে হয়েছে, আমি একজন নারী, আপনাকে দিয়ে হবে না?

এলিজা: আমার পরিবার কখনোই আমাকে ভাবতে শেখায়নি আমি নারী, আমি দুর্বল। আর আমি মনে করি, নিজের প্রতি বিশ্বাস, কাজের প্রতি একাগ্রতা, সততা আর  ভালোবাসা থাকলে যেকোনো কাজেই সফল হওয়া যায়।

মাহবুব: আপনার এই ভ্রমণের লক্ষ্য সম্পর্কে যদি একটু বলেন।

এলিজা: সারা বিশ্বে পর্যটন একটি সম্ভনাময় শিল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্যুরিজমের অনেকগুলো শাখা আছে। যেমন– এডুকেশন ট্যুরিজম, ব্যবসা ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, হেরিটেজ ট্যুরিজম ইত্যাদি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো, এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলো পর্যটনের বিভিন্ন শাখাগুলো নিয়ে কাজ করছে এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা অর্জন করছে, যা একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে।

পর্যটনের এই শাখাগুলোর মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল হেরিটেজ ট্যুরিজম। সব দেশ তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরে আকর্ষণ করছে কোটি কোটি পর্যটকদের নিজের দেশে। আমাদের পাশের দেশ ভারত, নেপাল, লাওস, কম্বোডিয়ার মতো দেশও তাদের দেশে হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনছে।

বছর জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরতে ঘুরতে মনে হলো নিজের দেশটাও ঘুরে দেখি। বিশেষ করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী- প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গাগুলো ঘুরতে গিয়ে আবারো মনে হয়েছে, গর্ব করার মতো নানা বৈচিত্রে ভরপুর এক সমৃদ্ধ জনপদ ‘বাংলাদেশ’। অন্য দেশ পারলে আমরাও পারব।

এক কথায় যদি বলতে হয়, হেরিটেজ ট্যুরিজমের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং এবং অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব।

মাহবুব: আপনার দৃষ্টিতে কেমন আছে বাংলাদেশের মানুষ?

এলিজা: ২০ বছরের বিশ্ব ভ্রমণের যাত্রায় আমার নিজেকে সত্যিকার ট্রাভেলার মনে হয়েছে। যখন আমি বাংলাদেশের কোণায় কোণায় গেছি। আমার দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মানুষ আমাকে যা আনন্দ দিয়েছে, পৃথিবীর বড় বড় দেশ তা দিতে পারেনি। আমি দেখেছি গর্ব করার মতো বিশ্ব মানের স্থাপনা আমাদেরও রয়েছে।  প্রয়োজন শুধু সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার প্রচারণা।

অনেক ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি মানুষের। সেই প্রেরণাতেই শহর থেকে শহরে ছুটে বেড়াচ্ছি। যখন কেউ বলেন ‘আপু আপনাকে দেখে সাহস পাই নতুন কিছু করার’। আবার যখন কেউ ফোনে বলেন ‘আপু আপনাকে সামনে থেকে দেখতে চাই’। বিভিন্ন দেশ থেকে (আমেরিকা, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া) প্রবাসীরা যখন ফোন করে দোয়া দেন, তখন অকারণেই চোখ ভিজে যায় আর ছুটে চলার দ্বিগুণ অনুপ্রেরণা পাই। তারা ধন্যবাদ জানান তাদের জেলাকে সবার সামনে উপস্থাপন করার জন্য।

যেহেতু আমার পরিভ্রমণ ছিল হেরিটেজ ট্যুরিজমের সাথে সম্পর্কযুক্ত, তাই আমি দেখেছি বাংলাদেশের মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ, পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


চবি/হাকিম মাহি