ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতিভার লড়াইয়ে সুন্দর শৈশব চাই: কিঙ্কর আহসান

মাহবুব এ রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-১৪ ৩:১৬:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-১৪ ৩:১৮:২১ পিএম

এই সময়ের অন্যতম পাঠকপ্রিয় লেখক কিঙ্কর আহসান। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় দীর্ঘসময় কাজ করেছেন। কাজ করেছেন স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে, ডকুমেন্টারি নির্মাণ এবং ফিল্মের কাজও করেছেন মনের আনন্দে। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি একজন আপাদমস্তক লেখক। গল্প বলতেই সবচেয় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার সাথে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব এ রহমান।

মাহবুব: কেমন আছেন না জিজ্ঞেস করে বরং জিজ্ঞেস করি করোনা কেমন রেখেছে?
কিঙ্কর: মানুষ আসলে কখনো ভালো থাকে না। সে বা তারা ভালো থাকার চেষ্টা করতে পারে শুধু। এখন বিপদের ভেতর আছে পুরো পৃথিবী। আমি ভালো নেই। ঘরবন্দি দিন কাটছে। লেখালেখিতে মন দিতে পারছি না। মা-বাবার শরীর ভালো না। নিজেও হাসপাতাল থেকে ফিরলাম কিছুদিন আগে।

মাহবুব: বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?
কিঙ্কর: করোনার দিনে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। অসহায় মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছি। যারা ঘরে বসে সময় কাটাচ্ছেন, নিয়ম না থাকলেও তাদের জন্য নিজের একটি বইয়ের পিডিএফ উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এই বিপদের দিন কাটুক। মানুষ সুস্থ হয়ে উঠুক দ্রুত এই প্রার্থনা করি।

মাহবুব: আপনার জন্ম কুষ্টিয়ায়। শৈশবটা কেমন ছিল?
কিঙ্কর: জন্ম কুষ্টিয়ায় হলেও আমার শৈশব কেটেছে বরিশাল আর ঢাকায়। বুকপকেটে একটা সুন্দর শৈশব না থাকলে প্রতিভার লড়াইতে নামা যায় না। বাটারবন, নকুলদানা, হ্যাজাক লাইট, ক্রিকেট, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি, বিল্লু, ফ্যান্টম, সাবু এসব নিয়েই কেটেছে আমার ছোটবেলার দিনগুলো। সেইসব বুকে পুষেই এখন নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে পারছি।

মাহবুব: ক্যাম্পাস জীবন কেমন ছিল?
কিঙ্কর: ভালো ছাত্র ছিলাম, তবে পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল কম। সারাক্ষণ আড্ডা দিতাম টিএসসিতে। কণ্ঠশীলনে যেতাম আবৃত্তির জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সংসদ নিয়ে পড়ে থাকতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র সংসদে সময় দিয়েছি অনেক। বিল্ড বেটার বাংলাদেশসহ অনেকগুলো সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম। আমি আসলে সারাদিন লেখালেখি আর সিনেমা নিয়ে থাকতাম। বাকি সময়টা টিউশন করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রথম দিন থেকেই ঠিক করেছিলাম, লিখে বাঁচব আর লিখেই আয় করব। সেটাই হয়েছে।

মাহবুব: লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?
কিঙ্কর: সেই ছোটবেলা থেকেই প্রচুর পড়ি আমি। কমিকসের বই দিয়ে শুরু। তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, জাফর ইকবাল, সুনীল হয়ে বুদ্ধদেব, নীরেন্দ্রনাথ, গুলজার, নাগিব মাহফুজ সবাই আমাকে মুগ্ধ করেছে। নিজের মনের কথা লিখে রাখতাম ডায়েরিতে। সুগন্ধি কলম ব্যবহার করে লিখে যেতাম পাতার পর পাতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ‘প্রথম আলো’তে লেখালেখি শুরু করি। চাকরি করেছি ‘কালের কন্ঠ’ পত্রিকায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় সব দৈনিক পত্রিকায় লিখেছি নিয়মিত। নিজের গল্প বলে যাবার লোভ, ইচ্ছে থেকেই আসলে লেখালেখির শুরু আমার।

মাহবুব: লেখালেখির কারণে কোথাও বাঁধার মুখে পড়েছিলেন কখনো?
কিঙ্কর: বাঁধার মুখে পড়েছি, পড়ছি প্রচুর। বাঁধার কথা বাদ দিয়ে বরং ভালোবাসার কথা বলি। ভালোবাসার কাঙাল আমি। আর এ ব্যাপারে পাঠকরা আমাকে হতাশ করেননি কখনো। লিখেই সবচেয়ে বেশি আয় করছি, বেঁচে আছি। অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই সবাইকে পাশে থাকবার জন্য। আমি ভাগ্যবান।

মাহবুব: অনেক ধরনের কাজ করছেন, একজন কিঙ্করকে দিয়ে এত কিছু কীভাবে সম্ভব হয়েছে?
কিঙ্কর: আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। পরিশ্রম আমার রক্তে আছে। সততার সাথে দিন-রাত কাজ করতে চাই। কাজ করেই আমার শান্তি। আমার কাজ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস, হাফিংটন পোস্ট, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান টাইমস, ইয়াহু এসব জায়গাতেও আলোচনা হয়েছে। এমন অর্জন, পাঠকদের ভালোবাসায় আমার শক্তি আর সাহস বেড়ে যায়।

মাহবুব: আপনার মোটামুটি সবগুলো বই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে, আপনার সবচেয়ে প্রিয় কোনটি?
কিঙ্কর: সব বই আমার প্রিয়। আলাদা করে বলব, গল্পগ্রন্থ ‘কিস্সাপূরণ’ এর নাম। আর উপন্যাস ‘মধ্যবিত্ত’ আর ‘মেঘডুবি’ অন্যতম।

মাহবুব: বেস্টসেলারের তালিকায় নিজের নামটি যখন দেখেন, অনুভূতি কেমন হয়?
কিঙ্কর: পাঠকের কাছে বই পৌঁছে যাচ্ছে এই বিষয়টি অবশ্যই আনন্দের। তবে ১৭ কোটি মানুষের দেশে দশ, পনের হাজার কপি বই বিক্রি করে খুশি হওয়া অপরাধ। এক একজন লেখকের কম করে হলেও দেড় থেকে দুই লাখ কপি বই বিক্রি হওয়া দরকার। জাতি হিসেবে বই কম পড়ার লজ্জা থেকে মুক্তি পাবার সময় এসেছে আমাদের। দিন ফিরছে। দিন বদলাতে দেরি নেই।

মাহবুব: এ পর্যন্ত আপনার কতটি বই প্রকাশিত হয়েছে?
কিঙ্কর: ১৩টি। এর মাঝে আঙ্গারধানি, রঙিলা কিতাব, মকবরা, মধ্যবিত্ত, রাজতন্ত্র, মখমলি মাফলার, বিবিয়ানা, মেঘডুবি এগুলো উপন্যাস।

মাহবুব: আগামী বইমেলা নিয়ে কী পরিকল্পনা?
কিঙ্কর: একই প্রকাশনী থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিনটি বই আসবে। প্রকাশনী ঠিক করিনি এখনো। কথা চলছে অনেকের সাথে। ‘মকবরা’ নামের উপন্যাস, ‘বাঘবিধবা’ নামের গল্পগ্রন্থ এবং ২০২১ বইমেলায় শুধু ‘জলপরানি’ নামের একটি দীর্ঘ উপন্যাস নিয়ে আসার ইচ্ছে আছে।

মাহবুব: আপনার প্রিয় লেখকদের তালিকায় কারা আছেন?
কিঙ্কর: তালিকা অনেক লম্বা। আলাদা করে বলতে পারি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, মাহমুদুল হক আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

মাহবুব: অনেকে বলেন বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে ভালো কাজ হচ্ছে না। আপনি এই সময়টাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
কিঙ্কর: সবসময়েই এটা কেউ না কেউ বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, সুনীল, শক্তি, নীরেন্দ্রনাথ, মাহমুদুল হক সবাইকেই নিজ নিজ সময়ে খারিজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে বলে অনেকেই একটু আলাদা হবার চেষ্টা করেন। নিজেকে অন্যদের কাছে কিছুটা জ্ঞানী এবং জরুরি করে তোলার চেষ্টা করেন। এসব নিয়ে, এদেরকে গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। শেষ অব্দি টিকে থাকে কাজ, পরিশ্রম। নিজের কাজে মনোযোগ দেওয়া দরকার। ইতিবাচক হতে হবে। সময় ঠিক করবে কাজ টিকবে নাকি নয়।

মাহবুব: নতুন লেখকদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে।
কিঙ্কর: অতটা বলার মতো যোগ্য হয়ে উঠিনি। শুধু বলি, অনেকটা পড়লে একটু লেখার সাহস করা যায়। প্রচুর পড়তে হবে। আর সময় করে প্রতিদিন লেখার টেবিলে বসার চেষ্টা করুন। লেখালেখি এক ধরনের আরাধনা। এখানে সততার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

মাহবুব: আপনার পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চান?
কিঙ্কর: বইয়ের কথা ছড়িয়ে দিন। পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য যেমন ভাত, ডাল দরকার তেমনি মনের ক্ষুধা মেটানোর জন্য দরকার বই। সবাই বইয়ের কথা ছড়িয়ে দিলেই, শুদ্ধ মানুষ হবার চেষ্টা করলেই পৃথিবী একদিন বইয়ের হয়ে উঠবে।

মাহবুব: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
কিঙ্কর: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ এমন দারুণ আয়োজনের জন্য। পরে কখনো আবার লম্বা সময় নিয়ে জমিয়ে আড্ডা হবে, এই আশা রাখলাম।

 

চবি/হাকিম মাহি