ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আমার স্বপ্ন ‘এসো বাঁচতে শিখি’

আমেনা আক্তার অমি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ১২:০১:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৩ ১২:১০:৪৯ পিএম

মনে পড়ে, আমার বয়স তখন ৪ বছরের মতো হবে, সেই সময় আমার মা আমাকে ছেড়ে চলে যান। আমি খুব কান্না করেছিলাম মায়ের জন্য। তখন থেকেই বুঝেছি ভালোবাসা কতটা মূল্যবান। আত্মার আত্মীয় হারানোর কষ্ট কতটা যন্ত্রণার। তারপর যখন প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার করে হাই স্কুলে ভর্তি হলাম, তখন এক পরীক্ষায় আসলো ‘আমার স্বপ্ন’ (যাকে বলে ইংরেজিতে অ্যাইম ইন লাইফ) বাংলা রচনা।

আমি খাতায় লিখলাম, আমি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচতে চাই। আমি বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে একত্র করতে চাই, সবার ভালোবাসার মানুষগুলোকে সবার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। সমাজের আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। আমার এই চাওয়াটাই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকলো। যেখানেই ভালোবাসার কমতি দেখতাম, সেখানেই বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।

মনে পড়ে, স্কুলে পড়াকালীন রাস্তায় বা আশেপাশে অনেক অসহায়দের দেখতাম। তবে, তখন অনেক বড় ধরনের সাহায্য করার ক্ষমতা ছিল না, স্কুল টিফিনের খরচ, স্কুলে যাতায়াত ভাড়া বাঁচিয়ে তাদের সাহায্য করতাম যতটুকু পারতাম। আমি হাতিরদিয়া ছাদত আলী স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছি। একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে এক ছোট্ট ছেলে রাস্তায় বসে আছে আর কান্না করতেছে, আমি বললাম এই তুমি কাদঁছো কেন? ছেলেটা বলে, আমার মা অসুস্থ, বাপ ছেড়ে চলে গেছে। আরেকটা বিয়ে করছে। আমি বললাম, থাক মন খারাপ করো না, মার কী হয়েছে? সে বলে পেটে অসুখ, যদিও ছেলেটা রোগটার কথা গুছিয়ে বলতে পারেনি। আমি বুঝে নিয়েছি, ঠিক সেদিনই দুই প্রাইভেটের টাকা ছিল ১ হাজারের মতো। নিয়েছিলাম বাসা থেকে। এই টাকা আর ছেলেটাকে নিয়ে তাদের বাসায় গেলাম, তখন তার মার হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে আসছি।

এভাবে আরও অনেককেই আমি সাধ্যমত সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। তবে ২০১৭ সাল থেকে একটা সংগঠনে যোগ দেই। নাম ‘এসো বাঁচতে শিখি’। তারপর সেখানেই আমার বন্ধুরা সবাই মিলে কাজ করে থাকি। আমি এখন নরসিংদী ইন্ডিপেনডেন্ট কলেজে পড়ি, ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। বাড়ি নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার হাতিরদিয়ায়।

আমাদের স্থানীয় স্কুল কলেজগুলোতে ইভেন্ট করেছি, তাদের বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করেছি এবং স্কুলের শিক্ষকদের বলেছি, যদি এমন কোনো শিক্ষার্থী থাকে, যাদের রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষার ফি বা বই-খাতা, কলম কিনতে অসুবিধা হচ্ছে, আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে। আমরা চেষ্টা করি, যেন তার সব সমস্যা সমাধান করা যায়।

আমাদের সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-

১. আমাদের সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ে সবার জন্য পাঠাগার নির্মাণ করা।

২. আমাদের মাঝে দারিদ্র্যতাকে দূর করা।

৩. শিক্ষার আলো প্রসারিত করা।

৪. মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করা।

সর্বশেষ করোনার প্রকোপে যখন সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের ছোট্ট দেশটিও কাঁপছে, এ সময়ে গৃহবন্দি হয়ে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো আমাদেরও কলেজ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ। কিন্তু আমরা বাড়িতে বসে নেই। নেমে পড়ি মানবতার সেবায়। যতটুকু পারছি আমার সংগঠন ‘এসো বাঁচতে শিখি’কে সঙ্গে নিয়ে ক্ষুধার্ত ও পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াই।

আমরা সদস্যদের বাড়িতে বাড়িতে গোপনে রাতের বেলা সহায়তা দিয়ে আসি, যেন অন্যান্য মানুষ তা বুঝতে না পারে। সাহয্যপ্রাপ্ত মানুষের সামাজিক সম্মান যেন ক্ষুন্ন না হয়, সে দিকে আমরা খেয়াল রাখি। তাই আমাদের পেইজ বা গ্রুপে সাহায্য প্রদানের জিনিসপত্র কাকে দেওয়া হচ্ছে, সেরকম কোনো ছবি বা পোস্ট নেই। 

কখনো পায়ে হেঁটে অসহায়দের কাছে যাই, আবার আমাদের সংগঠনের ভার্চুয়াল জগতে লাইভে এসে মানুষকে সচেতন করি, মাঝে মাঝে মানবিক মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে খাদ্যসামগ্রী কিনে অসহায়দের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেই। এপর্যন্ত বলতে গেলে সাংগঠনিকভাবে আমরা শতাধিক পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি।

বেশির ভাগ সংগঠনগুলো শহর কেন্দ্রিক, আমাদের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করা সত্ত্বেও আমরা আমাদের নিজ গ্রাম-এলাকা ও থানাকে সমৃদ্ধ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

আমাদের এই মানবিক কাজে যারা শ্রম দিয়ে, অর্থ দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ ও ধন্যবাদ। আমার সহযোদ্ধা আমার সংগঠনের সবাইকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। আমার শিক্ষক মহোদয়, যারা আমাকে/আমাদের বিভিন্ন মানবিক কাজে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।

সবচেয়ে যিনি আমার সঙ্গে সারাজীবন ছায়ার মতো লেগে আছেন, প্রবাসে থেকেও আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করেছেন, সে আমার বাবা। বাবা তোমাকে দেওয়ার মতো আমার কিছু নেই, তবে তোমাকে আমার পক্ষ থেকে ভালোবাসা। সারাজীবন আমাকে আগলে রেখো। বাবা আমি মানবিক মানুষ হতে চাই, সবসময় তোমাকে পাশে চাই।

 

নরসিংদী/হাকিম মাহি