ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ১৪ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
ভূতের গল্প

এক ভুতুড়ে সকাল

মো. শাহীন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৫ ৭:৪৬:২৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৫ ৭:৪৬:২৬ পিএম

সময়টা ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি। আমি আর আমার ছোট ভাই পলাশ (ছদ্মনাম) আমাদের নানা বাড়ি থেকে আমাদের নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। তার আগে বলে রাখি, তখনকার দিনে আমাদের এলাকায় রিকশা ছাড়া বিকল্প কোনো যানবাহন বলতে কিছুই ছিল না। রিকশাও ছিল বিরল! রাস্তাঘাট ছিল কাঁচা বা মাটির পথ। রিকশা যা দুই একটি ছিল বৃষ্টি হলে তাও চলতো না। বৃষ্টিতে রাস্তায় হাঁটু সমান কাঁদা ও জল জমে যেত। তাই কোথাও যেতে হলে দু’পাই ছিল একমাত্র ভরসা!

আমাদের বাড়ি থেকে নানা বাড়ির দূরত্ব প্রায় ১৪ মাইলের মতো। বাড়ি থেকে প্রথমে সাত মাইল পায়ে হেঁটে গিয়ে লঞ্চে উঠতে হয়। লঞ্চের এ পথে যেতে হয় প্রায় চার মাইল। এরপর আরও তিন মাইলের মতো কাঁচা পথ পায়ে হেঁটে নানা বাড়ি পৌঁছাতে হতো। যদিও পায়ে হাঁটার জন্য পথটা একটু বেশিই! কিন্তু নানা বাড়ি যাওয়ার আনন্দের কাছে হাঁটার কষ্টটা তুচ্ছই মনে হতো। যেহেতু অনেক পথ হেঁটে নানা বাড়ি যেতে হতো তাই সেখানে অবস্থানের মাত্রাটা একটু বেশিই ছিল!  মাঝে মাঝে সেটা ১০-১৫ দিনও হতো। তখনকার দিনে গ্রামে মোবাইল বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি।

আমার নানা ওয়াজেদ আলী তালুকদার। তৎকালীন ওয়াপদা অফিসে চাকরি করতেন। তবে এলাকায় তিনি ওয়াজেদ আলী মাস্টার নামেই বেশি পরিচিত। এলাকার ছোট-বড় সবাই তাকে এক নামে চেনে। যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিতো আমার নানা বাড়ি।

যাইহোক, এবার মূল জায়গায় আসি। আমি আর আমার ছোট ভাই নানা বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়ি ফিরছিলাম। আমরা তখন খুবই ছোট ছিলাম। আর শুধু আমরা দুইজনই ছিলাম। আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। নানা বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরে আসবো। সেদিন ভোর রাতেই নানু আমাদের ডেকে তুললেন। যেহেতু নানুর বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির দূরত্ব একটু বেশি, সেহেতু অতি সকালে রওনা দিতে হতো।  সকাল সাড়ে ৬টা বা ৭টার দিকে লঞ্চঘাটে এসে পৌঁছাতো, নানা বাড়ির দূরে যে ঘাট ছিল সেখানে। তাই আগে ভাগেই লঞ্চঘাটে পৌঁছাতে হতো।

সেদিন সকালবেলা নানু আমাদের খাবার খাওয়ানো শেষ করে তাড়াতাড়ি করে তৈরি করে বাড়ির পেছনে বিলের ধারে পুকুর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। তখন ছিল শীতকাল, কোথাও কোনো জল ছিল না। মাঠ-ঘাট চিরে চৌচির। শীতকালে সকালবেলা চারদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকতো। সামনে তিন-চার হাতও দেখা যায়নি সেদিন।  শুকনো মৌসুমে মানুষ সাধারণত বিলের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতো। কারণ রাস্তার পথ ছিল একটু বেশি। আমরাও সেদিন বিলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।

চারদিক কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে ছিল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। দুই ভাই হাঁটতে শুরু করলাম। বিলের মাঝখানে একটি ঈদগাহ ছিল, যা ময়দান নামে পরিচিত ছিল। তখনকার দিন পর্যন্ত আমাদের দুই ভাইয়ের ভূত-প্রেত সম্বন্ধে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। আসলে সেই ছোট বয়সে এসব অতিপ্রাকৃত বিষয়ে ধারণা থাকার কথাও না। যাইহোক আমরা ময়দানের কাছে পৌঁছালাম। ময়দানের কাছে যেতেই এক বিশাল দৈত্যর মতো মানবাকৃতির কিছু একটা লক্ষ করলাম। যার পা দুটো মাটিতে আর মাথা আকাশের সাথে লাগানো। এতটাই বিশাল আকৃতির ছিল! এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো বয়সী মানুষেরই ভয়ে গা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা যে সেদিন ভয় পাইনি তা নয়, আসলে ঐ সময়ে আমাদের সিক্সসেন্স কাজ করছিল না। এখনও সেদিনের কথা মনে পড়লে ভয়ে শরীরের লোম কাটা দিয়ে ওঠে। ভয়ে ডুকরে উঠি। যদিও সেদিন আমাদের ময়দানের দিকে যাওয়ার দরকার ছিল না। ময়দানের বিপরীত দিক দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। হয়তো ঐ দানবাকৃতির দৈত্যটি আমাদের পথ ভুলিয়ে ঐদিকে নিয়ে গেছে অথবা আমরা  কুয়াশার জন্য পথ-ঘাট ঠিক চিনতে পারছিলাম না। বিলের মধ্য দিয়ে গিয়ে রাস্তায় উঠতে তিরিশ মিনিট সময় লাগতো। কিন্তু সেদিন আমরা দুই থেকে তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ঐ পথটুকু শেষ করে রাস্তায় উঠতে পারছিলাম না। সূর্যও সেদিন একটু দেরিতেই উঠেছিল বলে মনে হয়!

আমার হাতে একটা ক্যাসিও ঘড়ি ছিল ওটাতেই সময় দেখা হতো। আসলে সেদিন আমরা ময়দানের চারপাশেই ঘুরতে ছিলাম। যতক্ষণ না সূর্য উঠে কুয়াশা কেটেছিল। সূর্য ওঠার পর দেখলাম আমরা ময়দানের পাশেই ঘুরতেছিলাম। আসলে তখন সেন্স কাজ করতে ছিল না। সূর্য ওঠার পর সেন্স কাজ করতে শুরু করল চারদিক পরিষ্কার হয়ে গেলো। আমরা আমাদের পথ-ঘাট চিনতে পারলাম।

জীবনের বাঁকে বাঁকে জন্ম নেওয়া অজস্র গল্পগুলোর ভিড়ে জীবনঘনিষ্ঠ অনেক কিছুই রয়ে যায়, চার পাশে কত কিছুই তো ঘটে, তার সব খোঁজ কি আমরা রাখি?

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

 

ডিআইইউ/মুছা/মাহি