ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘আমাদের রক্ষার দায় সুন্দরবনের, কিন্তু তাকে…?’

সোগাহ ফেরদৌস : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০১ ১:১৮:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০৩ ৮:২২:৫২ এএম

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতির উপহারস্বরূপ, যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের অন্যতম। বাংলাদেশ ও ভারতের অংশ মিলে এর আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় এর বিস্তৃতি।

বাংলাদেশে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার ও পশ্চিমবঙ্গে এর বাকি অংশ। অসংখ্য জীব-বৈচিত্রের ভাণ্ডার আমাদের এই সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট যেকোনো জলোচ্ছ্বাস-ঘূর্ণিঝড় থেকে আমাদের বাঁচাতে সবার আগে বুক পেতে দেয় এটি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আবারও নিজের বুক পেতে দিয়ে উপকূলীয় জীবন ও সম্পদ রক্ষা করলো সুন্দরবন। ম্যানগ্রোভ এই বনটি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ক্রোধ নিজেই মোকাবিলা করেছে। এটাই প্রথম নয়, এর আগেও এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়েছে একাই।

গত ৭ মে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ আকারে সৃষ্ট আম্ফান প্রথমে সুপার সাইক্লোনে রূপ নিলেও শেষ অবধি ২২০ কলোমিটারের কম গতি নিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। প্রবল বাতাসের সঙ্গে ছিল ১০-১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। আর এই প্রবল ঘূর্ণি বাতাস ও জলোচ্ছ্বাস থেকে দেশকে বাঁচাতে প্রথমেই বুক পেতে দিয়েছে সুন্দরবন। আর তাই  ২০ মে রাতে সাতক্ষীরা উপকূলে আঘাত হানার সময় এর ঘণ্টায় গতিবেগ ছিল ১৪৮ কিলোমিটার।

দেশকে বাঁচাতে গিয়ে প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এ প্রাকৃতিক বনটি। নিজের মধ্যে লালিত তার সন্তান সদৃশ অনেক গাছপালা ও অসংখ্য প্রাণীর জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করেছে আমাদের। প্রতিবারই নিঃস্বার্থভাবে এই কাজটি করে সুন্দরবন। ঝড়ের পরপরই সুন্দরবন রক্ষার দাবিও ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। কালের আবর্তে আমরা বিস্মিত হই সুন্দরবনের সেই একা লড়ার কথা।

এর আগেও ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের কবল থেকে রক্ষা করেছিল দেশকে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে ৩৩টি ঘূর্ণিঝড়। আর ‘ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামের একটি ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী ৩৫টি সুপার সাইক্লোনের ২৬টিই উৎপত্তি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। আর যার বেশকিছু সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশ উপকূলে। আবার অনেকগুলোর প্রভাব পড়েছে উপকূলে। এই সবগুলো ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাচীরের মতো দেশকে ঘিরে রেখে বারবার একাই লড়াই করে গেছে সুন্দরবন।

সর্বশেষ আম্ফানের আঘাতে দেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে চিংড়ি ঘের। ঝরে পড়েছে শত শত কোটি টাকার মৌসুমি ফল। ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে অনেক। সরকারি হিসাব মতে আনুমানিক ১১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এ ঝড়ে। আর মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২২ জনের। একবার ভাবুন তো সুন্দরবন না থাকলে এই ক্ষতির পরিমাণ কেমন হতো!

যে বুক চিতিয়ে আমাদের রক্ষা করলো, তারও ক্ষতি হয়েছে অনেক। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন জানিয়েছেন, সুন্দরবনের ক্ষতি নিরূপণে পৃথক চারটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির প্রতিবেদন আসলেই বোঝা যাবে এ ঝড়ে কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আমাদের এ পরম বন্ধু। এ ক্ষতি প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবন নিজেই কাটিয়ে উঠতে পারে। হয়তো বছর খানেকের মধ্যেই ফিরে পায় নিজের স্বরূপ। তবে বারবার যাদের আগলে রাখে এই সুন্দরবন, তাদের দ্বারা হওয়া ক্ষতি সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারে না আর। ২০০ বছর আগেও সুন্দরবনের মোট আয়তন ছিলো ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি, আর তা এখন ১০ হাজারে নেমেছে।

আমার প্রথম সুন্দরবন দর্শন ২০০৫ সালে, বাবার হাত ধরে। আমাদের বংশের একটি অংশ বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন থেকেই বাস করছে। তাদের বাড়ি বেড়াতে গিয়েই দেখা সুন্দরবনের। উপজেলা সদর থেকে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে জিউধরায় আত্মীয়ের বাড়ি যাই। বিকেলে বাবা আমাকে সুন্দরবন দেখাতে রওনা হলেন। তখনও অন্তত চার কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দশা তখন খুবই ভগ্ন। চিংড়ি ঘেরের পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমরা। তখন ঘেরগুলো কেবল মাটি কেটে তৈরি করা হচ্ছিলো চাষের জন্য। এমন মাটির স্তুপের পাশে পড়ে থাকা এক টুকরো পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ হাতে নিয়ে বাবা বললেন, ‘এটা পাকা কাঠ’। এক সময় সুন্দরবন এদিকেও ছিল। তারপরেও সুন্দরবনের দেখা পেতে হেঁটেছি অন্তত সাড়ে তিন কিলোমিটার। বাবার সেদিনের কথা মতে, সুন্দরবন দখল করে গাছপালা উজাড় করে মানুষ বসতি তৈরি করায় ধীরে ধীরে সুন্দরবন সরে যাচ্ছে সাগরের দিকে।

যাইহোক জিউধারা বাজার পার হয়ে আরও কিছুদূর হেঁটে খরমা ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন একটি খালের পাড় ধরে আমি আর বাবা সুন্দরবনের মধ্যে প্রবেশ করি। প্রায় ১০-১২ মিনিট সোজা ভেতরে ঢোকার পর অনেকগুলো গাছ বোঝাই নৌকা-ট্রলারের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো। তারা আর আমাদের ভেতরে যেতে নিষেধ করলে আমরা ফিরে এসে ফরেস্ট অফিসে একটু বিশ্রামের জন্য যাই। ফরেস্টের বা বন বিভাগের এক কর্মকর্তা আমাকে বাঘের গল্প শোনাচ্ছিলেন। এর মধ্যে আরেকজন বন বিভাগের সদস্য এসে তাকে সেই গাছভর্তি নৌকাগুলোর খবর জানায়। ওই কর্মকর্তা তখন তাকে নৌকাগুলো থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিতে বললেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন এমন করবেন? তিনি আমাকে প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন- গাছ কাটাই এখানকার অনেক মানুষের জীবীকা।

এভাবে প্রতিনিয়ত আমরা ধ্বংস করে চলছি সুন্দরবন নামক আমাদের নিঃস্বার্থ বন্ধুকে। শুধু কি বন কেটে উজাড় করছি, জাতীয়ভাবেও সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দরবনের অদূরবর্তী রামপালে গড়ে উঠছে বিশাল প্রকল্পের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যদিও বারবার সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লির উচ্চতা হবে ২৭৫ মিটার। যার ধোঁয়া সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর হবে না। কিন্তু এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতিবছর ৪ দশমিক ৭২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হবে। এর জন্য ৮০ হাজার টন ক্ষমতা সম্পন্ন ৫৯টি মালবাহী জাহাজের প্রয়োজন হবে। যা চলাচল করবে সুন্দরবনের মধ্যকার নদী দিয়ে।

শুধু কি তাই, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার-ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেঁধে দেওয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি)। ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের এ তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আরও একবার ভাবতে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো ‘আম্ফান’।

২০১৭ সালের ১৬ মার্চ সুন্দরবন নিয়ে দুঃখজনক একটি মন্তব্য করেছিলেন বাগেরহাটের একজন সাংসদ। তিনি বলেছিলেন- ‘সুন্দরবন যে দেশে নাই, সে দেশ কি চলে না?’। এই বরেণ্য সাংসদ ইতোমধ্যে গত হয়েছেন। তিনি ১৯৬০ সাল পরবর্তী ৩৩টি ঘূর্ণিঝড়ের স্বাক্ষী হয়েও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুন্দরবনের ক্ষতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করতে পেরেছিলেন। তিনি কখনো ভেবেছেন সুন্দরবন না থাকলে হয়তো তার বাগেরহাটই থাকবে না।

এদিকে বিশ্ব উষ্ণায়ন সমুদ্রকে স্ফিত করে তুলছে। এই উচ্চ পানিতল সমুদ্রতল থেকে মাত্র ৩০ ফুট উঁচু সুন্দরবনকে অনায়াসেই নিমজ্জিত করতে পারবে। কেননা সারাবিশ্বে প্রতিবছর সমুদ্রতল ২ মিমি করে বেড়ে চলছে, আর সুন্দরবনের অংশে প্রতিবছর ৩ দশমিক ১৪ মিমি করে বাড়ছে। এইভাবে চললে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সুন্দরবনের অধিকাংশ অংশই পানির তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দ্বীপ সাগরে হারিয়ে গেছে সুন্দরবনের মানচিত্র থেকে। ১৯৬৯ সাল থেকে ২০০১ সাল অবধি সময়কালে এখানে আমরা হারিয়েছি ১৫০ বর্গকিমি অঞ্চল। যদিও কিছুটা আমরা ফিরেও পেয়েছি।

সিডর, আইলা, বুলবুল, মোরা, ফণী, সর্বশেষ আম্ফানের আঘাত থেকে বারবার রক্ষা করা সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে আমাদের বাঁচার স্বার্থেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলা করতে হবে বাঁচার তাগিদেই। তাই সুন্দরবন রক্ষায় এখনি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ইবি/হাকিম মাহি