ঢাকা, রবিবার, ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, ১২ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
গল্প

‘বাবা তোকে বড় সাহেব হতে হবে’

তুষার আলী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০২ ২:১৯:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০২ ২:১৯:৪৮ পিএম

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসলো সাকিবের মায়ের কণ্ঠ। বাবা এক্ষুনি মেডিকেলে চলে আয়। আচ্ছা, আসছি মা, বলে ফোনটা রেখে কিছু না খেয়েই শুধু হাত-মুখটা ধুইয়ে বেরিয়ে পড়লো সাকিব।

গতকাল রাত ২টা পর্যন্ত হাসপাতালে ছিল। বাবাকে ভর্তি করে, কিছু খাবার কিনে দিয়ে মার হাতে হাজার খানেক টাকা দিয়ে বাড়িতে এসেছিল। কী হলো হঠাৎ, মাকে এত শঙ্কিত দেখাচ্ছিল কেন? আবার বুকটা কেঁপে উঠলো সাকিবের।

তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। শরীরে মাংস কমই আছে, একটু রোগা টাইপের। কিন্তু দেখলে মনে হবে সে অনেক প্রাপ্তবয়ষ্ক। হবেই না কেন, পরিবারের সব দায়িত্ব যে এখন তার উপর বর্তেছে। ছয় মাস হলো সাকিবের বাবা অসুস্থ। মরণ রোগও বলা যায়। এই ছয় মাসের অভিজ্ঞতা সাকিবকে একজন পরিপক্ক মানুষে পরিণত করেছে।

এই দুনিয়াতে সাকিবের আপন বলতে শুধু এই মা এবং বাবাই। দরিদ্র হওয়ার কারণে আত্মীয়রা পরিচয় দিতে চায় না, তবে এতে কিছু যায় আসে না সাকিবের। কারণ ছোটবেলা থেকেই এমন আচরণ দেখে আসছে। মানুষ যে শুধু ধনী হলেই মানুষ হয় না, সেটা সাকিবের আত্মীয়দের না দেখলে বোঝা মুশকিল। একেকটা নরপশু, অমানুষ।

সাকিবকে নিয়ে তার বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল, ছেলে বড় হয়ে একজন আদর্শ মানুষ হবে, সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত একটি চরিত্র হবে, আরও কত কিছু!

হবেই না কেন, সাকিব যতটা না মেধাবী তার চেয়ে বেশি পরিশ্রমী। সমাজ বাস্তবতা সে খুব ভালোই জানে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হলে কেউ মর্যাদা দেয় না। অমানুষের মতো আচরণ করে, এইতো কয়েক দিন আগেও পাড়ার মোড়ল তাকে যাচ্ছে তাই বলে গালি দিলো, শুধু কিছু টাকা ঋণ চাওয়ার কারণে। কথাগুলো এমন ছিল ‘ফকিন্নির বাচ্চা খেতেই পায় না, আর আমার টাকা নিয়ে নাকি পরিশোধ করবে’। আসলে দুনিয়াতে ফকিন্নি হয়ে জন্মগ্রহণ করাটা যে কত যন্ত্রণার, সেটা সে বুঝে গেছে। কিন্তু সাকিবের এমন কথা শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে।

স্কুলে সবাই সাকিবকে এক নামে চেনে, তার মেধা আর আচরণের জন্য। যেমন মেধাবী, তেমনই ভদ্র, তাই স্যাররা তাকে নিজের সন্তানের মতোই দেখেন। সেদিন তো আসাদ স্যার বলছিলো, ‘বাবা সাকিব, তুমি জীবনে একজন সফল মানুষ হবে, দেখে নিও। বলার পেছনে কারণ আছে, সাকিব ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তার মেধায় সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভূত। জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ সহ বোর্ডে ১ম স্থান অধিকার করেছিল।

তার স্বপ্ন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার হওয়ার। কিন্তু গত কয়েক মাসে যেন তার জীবনটা উলটপালট হয়ে গেছে। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। যখন যেখানে যা পায়। রাতে এসে বাসায় পড়ে। স্যারদের থেকে অনুমতি নিয়েছে, স্যাররাও জানে এছাড়া উপায় নেই। সবাই যথাসাধ্য সাহায্য করেছে। কিন্তু সারাজীবন তো আর করতে পারে না। তবুও যখন যে পারে কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করে।

পরিবারের একমাত্র আয় করা মানুষটি ছিল সাকিবের বাবা, কিন্তু তিনিও এখন মৃত্যুশয্যায়। ফলে, গত ছয় মাস ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে কাজের সন্ধানে ঘুরতে হয় সারাদিন। তবে, পড়াশোনা ঠিকই চালিয়ে যায় সে। প্রতিদিন অনেক মানুষের অকথ্য গালিগালাজ শুনতে হয় মানুষের টাকা চাওয়ার জন্য।

হাসপাতালে পৌঁছাতেই, একটা অজানা শঙ্কা কাজ করতে লাগলো, ভেতরে যেতেই শোনা গেলো, মায়ের কান্না। একজন নার্স এসে বললো, আপনি ক্যান্সারের রোগীর কে হোন? জি, আমি উনার ছেলে, ওহ্ উনি আজ সকালে মৃত্যুবরণ করেছেন।

শুনে আকাশটা ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হলো সাকিবের। সারাজীবন যে বাবা এত কষ্ট করে মানুষ করলো তাকে, কত স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি, মনে পড়ে যায়, নিরক্ষর মানুষটির সেই কথাটা, ‘বাবা বড় হয়ে তোকে বড় সাহেব হতে হবে, তুই কোর্ট, প্যান্ট পরবি, বড় গাড়িতে ঘুরবি এটাই আমার চাওয়া। আমি যে বাড়িতে দাঁড়োয়ান, ঠিক সেই বাড়ির বাবু সাহেবের মতো।’

সাকিব শুধু মুচকি হেসে বলতো, হুম আব্বা, ইনশাআল্লাহ। আপনি শুধু দোয়া করবেন আমার জন্য। বাবা মাথায় হাত রেখে বলতেন, ‘আমার দোয়া সবসময় তোর সাথে আছে বাবা। সেই জীবনযোদ্ধা বাবাকেও শেষ মুহূর্তে দেখতে পেলো না সাকিব।’

টাকার অভাবে, বাবাকে ভালো হাসপাতালে ভর্তি করতে পারেনি, ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। এটা ভেবে নিজের অজান্তেই চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মা সাকিবকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শুধু চোখের পানি ঝড়াতে লাগলো।

একটা অনিশ্চিত জীবন শুরু হলো সাকিবের। মা বললো, বাপ! তোকে বড় সাহেব হতেই হবে এবং একজন আদর্শ মানুষ হবি। সাকিব, হুম মা, আমি বড় মানুষ হবো ইনশাআল্লাহ্। আর যেন কোনো বাবাকে চিকিৎসার অভাবে মারা যেতে না হয়, টাকার জন্য যেন ফকিন্নির বাচ্চার মতো গালি শুনতে না হয়, তার জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো।

বাবার লাশটা কবরে দাফন করার সময়, সাকিবের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল এবং একটা কথাই মনে পড়ছিল, ‘বাবা তোকে বড় হয়ে সাহেব হতে হবে, তুই কোর্ট-প্যান্ট পরবি, বড় গাড়িতে ঘুরবি, ঠিক আমার সাহেব বাবুর মতো।’

গল্প: অনিশ্চিত জীবন

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

রাবি/হাকিম মাহি