ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৭ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রশ্নবিদ্ধ মানবতা

শাহরিয়ার নাসের : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৪ ৮:০০:৪২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০৪ ৮:২২:৩১ পিএম

মানুষ, যাদের বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের বিবেকবোধ অন্যসব প্রাণীদের চেয়ে বেশি। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই বিবেকবোধসম্পন্ন প্রাণী? একের পর এক মানুষের অমানবিক, অমানুষিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করছে মানুষের বিবেকবোধ নেই বললেই চলে। ক্রমশ অমানবিক, হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ, লোপ পাচ্ছে তাদের বিবেক।

মানুষের অমানবিকতার চরম নিদর্শন ভারতের কেরালায় বন্য হাতির ভয়াবহ মৃত্যু। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেটি এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) গর্ভবতী বন্য হাতির মৃত্যুর খবরটি হঠাৎ ফেসবুকে দেখতে পাই। খবরটি দেখার পর একটা বিষয় শুধু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, মানুষের দ্বারা কীভাবে এমন কাজ করা সম্ভব হয়েছে? যারা করেছে তারা কি আসলে মানুষ?

বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, আনারসের মধ্যে বাজি ভরে খেতে দেওয়া হয়েছিল খাবারের খোঁজে লোকালয়ে আসা হাতিটিকে। এরপর মুখের ভেতরেই বিস্ফোরণ। যন্ত্রণার মাত্রা এতটাই ব্যাপক ছিল, হাতিটির জিভ ও মুখ ভয়ংকরভাবে চোটপ্রাপ্ত হয়। যন্ত্রণা ও খিদেয় হাতিটি স্থানীয় নদীতে নেমে যায়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। গত ২৭ মে ভারতের কেরালায় এভাবেই অন্তঃসত্ত্বা একটি হাতিকে হত্যা করেছে স্থানীয়রা।

উত্তর কেরালার মালাপ্পুরমের বন বিভাগের এক কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিলে তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। এই বীভৎস ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। বন বিভাগের কর্মকর্তা মোহন কৃষ্ণন তার পোস্টে লিখেছেন, ‘সবাইকে বিশ্বাস করত সে। যখন তার মুখের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে, তখনও সে নিশ্চয়ই নিজের কথা ভাবেনি, ভেবেছে সেই সন্তানের কথা, যার জন্ম হওয়ার কথা ছিল ১৮ থেকে ২০ মাস পর।’ হাতিটিকে উদ্ধার করার উদ্দেশে যে র‍্যাপিড রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে যায়, তারই সদস্য ছিলেন কৃষ্ণন।

বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় হাতিটির জিভ এবং মুখ। অসহ্য যন্ত্রণা এবং খিদে নিয়ে সারা গ্রাম হেঁটে বেড়ায় সে। আঘাতের পরিমাণ এতটাই যে কিছু খাওয়ারও সাধ্য ছিল না তার। তাঁর আবেগঘন পোস্টে কৃষ্ণন লেখেন, ‘ভেতরটা জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে, গ্রামের পথ দিয়ে ছুটছে সে, সেই অবস্থাতেও কিন্তু একজন মানুষেরও ক্ষতি করেনি সে, একটি বাড়িও ছোঁয়নি। তাই বলছিলাম, ওর ভেতরে ভালো ছাড়া আর কিছু ছিল না।’

শেষ পর্যন্ত ভেলিয়ার নদী পর্যন্ত হেঁটে যায় হাতিটি। জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। দাঁড়িয়ে থেকেই মৃত্যু হয় তার। নদীর জলে শুঁড় এবং মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে, হয়তো অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তির আশায়। কৃষ্ণনের মতে, সম্ভবত তার জখমের ওপর যাতে মাছি বা অন্য কোনও পোকা না বসে, সেই কারণেই এমনটা করে সে।

দুটি পোষা হাতির সাহায্যে তাকে নদী থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন বনবিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু কৃষ্ণন লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করছিল। আমাদের কিছু করতে দেয়নি সে।’ দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২৭ মে বিকেল চারটের সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সে। মৃত্যুর পর তার দেহ ট্রাকে করে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে যান বন বিভাগের কর্মকর্তারা, সেখানেই দাহ করা হয় তাকে।

‘ওকে যোগ্য বিদায় দেওয়াটা দরকার ছিল। তাই আমরা লরিতে করে ওকে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাই। সেখানে চিতাকাঠের ওপর শুয়েছিল সে, সেই ভূমিতে, যেখানে সে বেড়ে উঠেছিল, যেখানে সে খেলত। যে ডাক্তার ওর পোস্টমর্টেম করেন, তিনি আমায় জানান যে সে একা ছিল না। ওর মুখোশের মধ্যে দিয়েও বুঝতে পারছিলাম, কী কষ্ট হচ্ছে ওর। তাকে দাহ করলাম আমরা, তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে শেষ সম্মান জানালাম’, লিখেছেন কৃষ্ণন।

কৃষ্ণনের এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় কতটা নৃশংসভাবে গর্ভবতী হাতিটিকে হত্যা করা হয়েছে। পশুপাখির প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতার চরমতম নিদর্শন। কী ছিল হাতিটির অপরাধ? তার ভুল একটাই সে মানুষকে বিশ্বাস করত। সেই কারণেই স্থানীয়দের দেওয়া আনারস খেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি সে। সে জানত না, আনারসের মধ্যে পুরে দেওয়া হয়েছে বাজি-পটকা। এই আনারসটি তার মৃত্যু ডেকে আনবে এটাও সে জানত না। তার মুখের মধ্যেই ফেটে যায় সেগুলি। এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে, সঙ্গে নিয়ে যায় নতুন একটি প্রাণও। ভাবতেই অবাক লাগে কিছু মানুষই করেছে এসব কাজ।

শুধু কি ভারতের কেরালাতেই ঘটছে এমন অমানবিক ঘটনা? না শুধু ভারতের কেরালায় নয় আমাদের মাতৃভূমিতেও ঘটছে একের পর এক এমন অমানবিক ঘটনা। কিছুদিন আগে সিলেটের জৈন্তায় এমনি এক নৃশংস কাজ করে কিছু মানুষ। পরিচয়ে মানুষ হলেও আসলে তারা মানুষ না। নির্মম কষ্ট দিয়ে কয়েকটি বাঘডাশাকে হত্যা করে। হত্যার বর্ণনা দেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে কর্মরত এক সংবাদকর্মী। গত ২৯ মে তিনি তারা নিজ ফেসবুক আইডির এক স্ট্যাটাসে ওই প্রাণীর ছবিসহ পোস্ট করে লিখেন, ‘সৃষ্টির নিকৃষ্ট-বর্বর প্রাণী মানুষের কাজ। প্রথমে এদের বাসায় গিয়ে গর্তের মুখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অক্সিজেনের অভাবে যখন গর্ত থেকে বের হয়ে আসে তখন পিটিয়ে মারা হয়। ছবির বাইরে আরও অনেক প্রাণী রয়েছে, যা পিটিয়ে মারা হয়েছে। জৈন্তা, সিলেটের ঘটনা এটি।’

সম্প্রতি চর্বি সংগ্রহের লোভে একটি ডলফিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। করোনার কারণে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে সব ধরনের কল-কারখানা বন্ধ থাকায় অনেকটাই কমে এসেছে হালদা নদীর দূষণ। এই কারণে নদীতে বিচরণ বেড়েছে ডলফিনের। চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষায় এই ডলফিন ‘শুশুক’ নামেও পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে গাঙ্গেয় প্রজাতির ডলফিন রয়েছে ১২'শ টির মতো। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার এই ডলফিনকে অতি বিপন্ন প্রজাতির লাল তালিকায় রেখেছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এই পর্যন্ত আড়াই বছরে হালদা নদীতে ২৪টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ গত ৮ মে কেটে ক্ষত-বিক্ষত করে হত্যা করা হয়েছে একটি ডলফিনকে।

লোভে পড়ে একের পর এক প্রাণী হত্যা এসব কি বিবেকবোধসম্পন্ন প্রাণী মানুষের দ্বারা করা সাজে? শুধু গর্ভবতী হাতি, বাঘডাশা আর ডলফিনই নয় মানুষ লোভে পড়ে নির্মমভাবে একের পর এক বন্যপ্রাণী হত্যা করে আসছে। অথচ, মানুষ জানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণীদের ভূমিকা কতটুকু।

বন্যপ্রাণীরা যদি মানুষের মতো কথা বলতে পারতো, তাহলে তারাও তাদের কষ্ট, নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিতো। আজ জীববৈচিত্র হুমকির মুখে। পরিবেশের ভারসাম্য নেই। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। একের পর এক দুর্যোগ। এসব জেনেশুনেও নির্মমভাবে বন্যপ্রাণী, সামুদ্রিক প্রাণী হত্যা করছে মানুষ।

এদিকে করোনায় চারদিকে ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বের এই দুর্যোগময় সময়েও আমরা একের পর এক অমানবিক কাজ করছি। আমরা করোনাভাইরাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না। করোনাভাইরাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের মানবিক হওয়াটা এখন বেশি জরুরি। অমানবিক মানুষে নয়; পৃথিবীটা মানবিক মানুষে ভরে যাক। তাহলেই বসবাসযোগ্য হয়ে ওঠবে পৃথিবী।

লেখক: শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


নোবিপ্রবি/হাকিম মাহি