ঢাকা     সোমবার   ০৩ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

ক্যাম্পাসের শতবর্ষ ও রাত্রি কথন

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০৬, ২ জুলাই ২০২০  

রাত প্রায় বারোটা। বাইরে হাঁটাহাঁটি করছি। ঘুটঘুটে অন্ধকারে দু’টো কুকুর শুয়ে আছে। ফোনের আলো ফেলতেই চারটে চোখ জ্বলে উঠলো। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির পূর্বাভাস। চারপাশ জুড়ে নিস্তব্ধতা। এতোটাই নিস্তব্ধতা যে আশেপাশের বাড়িঘর থেকে সিলিং ফ্যানের বিরক্তিকর ক্যাচর ক্যাচর শব্দ শোনা যাচ্ছে। এসময় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হলে যাপন করা রাতগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

হলে রাত বারোটা বাজলে মনে পড়তো সারাদিন রিডিংরুমে যাওয়া হয়নি। রাত যত গভীর হয় পড়াশোনার গুরুত্ব তত স্পষ্ট হতে থাকে। বিসিএস প্রিপারেশন নেয়া ভাইদের পড়াশোনার গতি দেখে নিজেকে অতি তুচ্ছ লাগে। অধিকাংশ মহাপুরুষেরা যে প্রথাগত পড়াশোনা ছাড়াই মহাপুরুষ হয়েছেন, এসব বানোয়াট গল্প মনে হয়। জীবনের দ্বিতীয় প্রেম হওয়া উচিত পড়াশোনা। আর প্রথম প্রেম নিঃসন্দেহে আপন সত্ত্বা।

রাত তিনটে পর্যন্ত পড়াশোনার পর রিডিংরুম থেকে বেরিয়ে পড়ি। হল গেইটে এসে দেখি বাবুল ভাই তখনও চা সিগারেট বিক্রি করছেন। বাবুল ভাই রোগাপাতলা ধরনের লোক। মাথাভর্তি টাক। ছোট ছোট চোখ। ক্লান্তিতে চোয়াল ভাঙ্গা। ভাঙ্গা চোয়াল আর মাথাভর্তি টাক মিলিয়ে চেহারায় একটা হতাশা ভাব। বাবুল ভাই-এর সাথে দু’টো বড় বড় চায়ের ফ্লাস্ক। সন্ধ্যার পর থেকে হল গেইটে চা সিগারেট বিক্রি করেন তিনি।

হল গেইটের সামনে রোজ এক-আধ ডজন কুকুর শুয়ে বসে থাকে। এরা হলেরই অংশ হয়ে গেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম হল পাহারা দিচ্ছে এরা। আগে তাদের বাপদাদারা পাহারা দিতো, এখন যেন তাদের পালা। হয়তো তাদের পরবর্তী বংশধরও এভাবে পাহারা দেবে। ইশারায় ডাকলে মাঝে মাঝে পায়ের কাছে এসে ঘুরঘুর করে। লেজ নেড়ে হাল অবস্থা জানতে চায়। শোনাতে চায় ওদের মনের কোনে লুকিয়ে থাকা কোনো কথা। মানুষের সাথে তাদের ওই মিশতে চাওয়ার আগ্রহ দেখে আনন্দ পাই। কিন্তু আমার মা এই আনন্দ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখান না। মা'র সাইনোফোবিয়া আছে। মানে কুকুর ভীতি। রাস্তার বামপাশে কুকুর দেখলে তিনি ডানপাশ দিয়ে যান। এমন ভয়ানক কুকুর ভীতির একটি কারণ অবশ্য আছে। মা বিয়ের পর শ্বশুড়বাড়ি গিয়ে একটি কুকুর পোষা শুরু করেন। কুকুরটার নাম দেন ডায়েনা। ব্রিটিশ রয়েল পরিবারের প্রিন্সেস ডায়েনার সাথে এই কুকুরের কোনো লেনদেন নেই। একদিন কুকুরটা কি মনে করে মা'র হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। আর সেদিন থেকেই মা'র ভেতর সাইনোফোবিয়া জন্মানো শুরু করে। মা যদি কোনোভাবে জানতে পারেন আমি হলে এসে প্রতিরাতে কুকুরের লেজ নাড়ানোর সাইকোলজি বোঝার চেষ্টা করছি, তাহলে আমার ধারণা টিটেনাস ইনজেকশন নেয়া ছাড়া তিনি আমায় ঘরে ঢুকতে দেবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেয়েও হলে ওঠার ঘটনা আমায় বেশি আনন্দ দেয়।

অনার্স প্রথম বর্ষের ঘটনা। জানুয়ারি মাসের দশ তারিখ। একদিন বিকেলে ব্যাগভর্তি জামাকাপড় আর বই নিয়ে হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হলের সামনে বড় করে লিখা- হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, স্থাপিত ১৯৬৭। লোকজন গেইট দিয়ে ভেতরে আসা যাওয়া করছে। কিছুক্ষণ পর হলের সিনিয়রদের দুয়েকজন এসে ব্যাগপত্র ধরাধরি করে আমায় ১০২৬ নম্বর রুমে দিয়ে গেলেন। তারপর থেকেই জীবনের নতুন পৃষ্ঠা উল্টানো শুরু।

রাত তিনটায় রিডিংরুম থেকে বের হওয়ার উদ্দেশ্য খাওয়া-দাওয়া। চলে আসলাম ঢাকা মেডিক্যাল মোড়ে। গভীর রাতেও জায়গাটা ব্যস্ততায় ভরা থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল গেইটের বিপরীত পাশের ফুটপাতে ছোট ছোট ভাসমান দোকান বসানো। দোকানের চুলোতে গরম তাওয়া বসানো থাকে। এসব দোকানের চুলো নিভানো হয় না কখনো। আসলে নিভানোর সুযোগ নেই। ঘণ্টায় হাজার খানেক পরোটা উঠে আসে তাওয়া থেকে। কাস্টমার এসে অর্ডার করার সাথে সাথে তাওয়ায় পরোটা সাজিয়ে ফেলা হয়।

রাস্তার ওপাশে একজন ঝড়ের গতিতে চেঁচাতে চেঁচাতে কাস্টমার ডাকছে। আর এই কাজটা সে অত্যন্ত আনন্দের সাথেই করছে। মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ হলে মানুষ আনন্দ পায়। আবার ডোপামিন ক্ষরণে অসঙ্গতি হলে মানুষ দুঃখ পায়। দেখেই মনে হচ্ছে, এই ব্যক্তির ডোপামিন ক্ষরণ অতি উচ্চ মাত্রায় চলছে।

আমি দোকানে ঢুকে বসলাম। এতক্ষণ যে ঝড়ের গতিতে  চেঁচাচ্ছিল, তার নাম মাসুদ। বাড়ি চাঁদপুর। মাসুদের কাজ হচ্ছে কাস্টমার ডেকে আনা আর পরোটা পরিবেশন করা। ঢাকা মেডিক্যাল মোড়ের প্রায় সব ক’টা দোকান চাঁদপুরের লোকজনের। বছরের পর বছর তারা এখানে ব্যবসা করছেন। পরোটা, ভাত বিক্রি ইত্যাদি। তেল ছাড়া এবং তেলসহ দু'ধরনের পরোটারই ব্যবস্থা আছে এখানে।

আমি মাসুদকে ডাকলাম। তিনটে তেলেভাজা পরোটার অর্ডার দিলাম। সাথে আলুভাজা স্পেশাল। আলুভাজা স্পেশাল বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। ভাজি করে রাখা আলু নতুন করে তাওয়ায় ঢেলে কাঁচা মরিচ এবং পেঁয়াজ দিয়ে গরম করা হয়। তারপর গরম পরোটার সাথে আলুভাজা স্পেশাল রাত্রিজাগার স্বার্থকতা এনে দেয় মুখে।

মাসুদ মিনিট পাঁচেকের ভেতর পরোটা আর আলুভাজা স্পেশাল নিয়ে এসেছে। পরোটার প্লেট টেবিলে রাখতে রাখতে বলল, 'ভাইজান আশেপাশে প্যামিলি বাসা কেমন পাওয়া যায়? চারজনের প্যামিলি বাসা। আমার পরিচিত একজন উঠবে।'

মাসুদ ফ কে প বলছে৷ বিষয়টা আগে খেয়াল করিনি। প আর ফ এর ব্যবহার গুলিয়ে ফেলার বৈশিষ্ট্য ফেনীর লোকজনের মধ্যে আছে। কিন্তু মাসুদ চাঁদপুরের।

আমি বললাম, খোঁজ নিয়ে দেখতে পারো। নানান জায়গায় দেখবে দেয়ালে লিফলেট লাগানো আছে "ফ্যামিলি বাসা ভাড়া দেয়া হবে। আর ব্যাচেলরের ক্ষেত্রে পড়াশোনা করা নারীরা অগ্রাধিকার পাবে"। লিফলেটের এককোণায় বাড়িওয়ালার ফোন নাম্বর পেয়ে যাবে। ফোন করে কথা বলবে। তারপর তিনমাসের ভাড়া অ্যাডভান্স দিলে বাসায় উঠে যেতে পারবে।

মাসুদের মুখ দেখে মনে হলো, সে আমার কথায় চরম হতাশ হয়েছে। কথা শেষ না করতেই 'অ্যাই গরম পরোটা আছে...' চেঁচাতে চেঁচাতে চলে গেলো। মাসুদ সম্ভবত ওসব ফোনের ঝামেলায় যেতে চাচ্ছে না। এই ধরনের মানুষ যখন উচ্চপদে চলে যায় তখন তার কর্মচারীদের ঘন ঘন ঝামেলায় ফেলে চুপচাপ বসে মজা দেখে। এক পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে।

ঢাকা শহর ঝামেলার শহর। ঝামেলায় যে অভ্যস্ত না, ঢাকা শহর তার জন্য না। রিকশাওয়ালার সাথে ভাড়ার অতিরিক্ত পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে ডিপার্টমেন্টে টিচারের সাথে অ্যাটেন্ডেস মার্কসের জন্য পর্যন্ত ঝামেলায় জড়াতে হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল মোড় হলের ছেলেদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দিনের বেলার রাজনৈতিক আলোচনার আঁতুড়ঘর মধুর ক্যান্টিন হলেও, রাতের বেলার আড্ডার ড্রয়িংরুম এই ঢাকা মেডিক্যাল গেইট। বিভিন্ন হলের পোস্টেড নেতারা এখানে ভীড় করেন। মোটর সাইকেল থামিয়ে চা সিগারেট খান। ক্যাম্পাসের হট টপিক নিয়ে গল্পগুজব করেন। ডাকসু নির্বাচনের সময় এই মেডিক্যালের সামনে রাতের বেলা বেশি জমজমাট থাকতো। নির্বাচনের প্রার্থীরা না ঘুমিয়ে এখানে সময় কাটাতেন বেশিরভাগ। ডেকে ডেকে সবার সাথে কথা বলতেন। পরিচিত হতেন। চা সিগারেট খেতেন-খাওয়াতেন।

আমরা ডাকসু নির্বাচনের সময় প্রথম বর্ষে ছিলাম। রাতে সবাই ঝাঁক বেঁধে ঘুরতে বের হতাম। প্রায়ই সামনাসামনি দুয়েকজন হট ক্যান্ডিডেট পেয়ে যেতাম। ওনারা দেখলেই যত্নআত্তি শুরু করতেন। হাতে হাজার টাকার নোট গুজে দিয়ে নাস্তা করতে বলতেন। আর নির্বাচনের দিন নাম এবং সিরিয়াল নাম্বার মনে রাখার কথা বলতে ভুলতেন না। আমাদেরও সময় ভালো যেতে লাগলো। বিন্দাস খানাপিনার ব্যবস্থা। বেশ আগ্রহ নিয়ে রাতে বের হতে লাগলাম সবাই।

আমি পরোটা খাওয়া শেষ করলাম। পরে আরও দু’টো অর্ডার করে, টোটাল পাঁচটা পরোটা খেলাম। টেবিলের এক কোণায় একটি প্লাস্টিকের মগে খবরের কাগজ ছিঁড়ে রোল করে রাখা আছে। সেই কাগজ হাত মোছার জন্য ব্যবহার করা হয়। ওটার নাম দেয়া হয়েছে 'বাংলা টিস্যু'। আমি বাংলা টিস্যু নিলাম না। মাসুদকে ডেকে বসুন্ধরা টিস্যু দিতে বললাম। মুখ ফুঁটে না চাইলে এখানে টিস্যু দেয়া হয় না। টিস্যু শুধু ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখদের জন্য। মাসুদকে ডেকে টিস্যু দেয়ার কথা বলতে হয় না তাদের। খাওয়া শেষে এমনিতেই টিস্যু হাজির হয়ে যায় সামনে। আর ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ বানানোর সহজ রাস্তা হচ্ছে এক্টিভ পলিটিক্স। এক্টিভ পলিটিশিয়ান হওয়ার পর শাহবাগ থানার ওসি সাহেবও বড়ভাই ডেকে গলা মেলায়।

পরোটা খাওয়া শেষ করে সুফিয়া কামাল হলের দিকে হাঁটা শুরু করি। হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, টিএসসি হয়ে হলে ফিরতে ফিরতে ভোর পাঁচটা বেজে যায়। ক্যাম্পাসে আমার প্রতিটি রাত এভাবেই সাজানো ছিল। মান্না দে'র কফি হাউজের আড্ডার সোনালি বিকেলের মতো আমার রূপালী রাত্রিরা আজ বহুদিন হলো হারিয়ে গেছে।

শতবর্ষে পা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নিঃসন্দেহে আনন্দঘন মুহূর্ত। অথচ এই আনন্দের সময় ক্যাম্পাসের বটতলা, আমতলা, টিএসসি আর কার্জন, একাত্তরের সন্তানহারা মা-এর মতো খালি কোল নিয়ে বসে আছে। সেখানে নেই কোনো কোলাহল, নেই কোনো আলোকসজ্জা।

তার সন্তানরাও যে খুব একটা ভালো আছে তা নয়। অজানা দ্বীপে আটকে পড়া রবিনসন ক্রুসোর মতো লকডাউনে একটি বদ্ধ জীবনধারায় আটকে আছি আমরা । এক বিচ্ছিরি জীবনধারায় হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের সবচেয়ে রঙিন সময়গুলো। চুলদাঁড়ি পেকে যাওয়া বয়সে বাচ্চাদের শোনানোর জন্য জমানো গল্পের থলিতে দিন দিন ভাটা পড়ছে। ঢাকা মেডিক্যাল মোড়ের গরম গরম পরোটার স্বাদহীনতায় জিভ তেতো হয়ে আছে। হলের ছারপোকার কামড় খাই না প্রায় একশো দিন। হল ক্যান্টিনের বাবুর্চির নিন্দা করি না বহুকাল। সেই পুরনো জীবনধারা ছাড়া আমি প্রবলভাবে অক্সিজেন হীনতায় ভুগছি। হাসপাতালের যান্ত্রিক ভ্যান্টিলেটরের সাধ্য নেই আমার এই অক্সিজেনের অভাব মেটানোর। আমার দরকার রাত তিনটের ফাঁকা ক্যাম্পাস।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাবি/মাহফুজ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়