ঢাকা     শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৪ ১৪২৭ ||  ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভাজন রাখা যাবে না’

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৩০, ২ জুলাই ২০২০  

করোনা তার ভয়াবহতার জালে সারা পৃথিবীকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। এই জাল ভেদ করে আমরা বের হবো একদিন, আবার সুন্দর এই পৃথিবীটাকে উপভোগ করবো আগের মতো করে, এমন স্বপ্ন সবাই দেখি। কিন্তু পৃথিবী কি আগের মতো থাকবে? হয়তো বদলে যাবে অনেক কিছু।

করোনাকালীন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে যেসব খাতগুলোতে তারমধ্যে শিক্ষা অন্যতম। তিন মাসের অধিক সময় যাবত বন্ধ রয়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুরু থেকেই অনলাইনে পাঠদান অব্যাহত রাখলেও পিছিয়ে ছিল সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও এখন অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে পাঠদান শুরু হয়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সঙ্গে বিস্তর ফারাক থেকেই গেছে এই মাধ্যমে। অনেক শিক্ষার্থী ভালো ইন্টারনেট সেবার অভাবে ন্যূনতম অংশগ্রহণও করতে পারছে না এই প্রক্রিয়ায়।

সবকিছু ছাপিয়ে করোনামুক্ত হয়ে যেদিন আবার শ্রেণিকক্ষের পাঠদান শুরু হবে, সেই সকালটা যেন একটু অন্যরকম হয়। যেকোনো দেশের শিক্ষার মান নির্ণয়ের প্রধান ভিত্তি ধরা হয় গবেষণাকে। আমরা বহির্বিশ্বের তুলনায় গবেষণায় অনেক পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকরা গবেষণা করা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছেন। যারা করতে আগ্রহী তারাও পর্যাপ্ত অর্থের যোগান না থাকায় করতে পারছেন না। গবেষণার মানকে উন্নত করতে অবশ্যই এ খাতে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

দেশের অনুমোদিত ৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষাকার্যক্রমের এই বৃহৎ অংশকে বাইরে রেখে কখনোই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভবপর হবে না। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও উন্নত পাঠদান করা হচ্ছে। সরকারি এবং বেসরকারি বিভাজন না করে সবাইকে নিয়ে সবার সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সংকট নিরসন ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। বেশিরভাগ আবাসিক হলগুলোর চিত্র অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও সঠিক আবাসন সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অতীব জরুরি। তাদের মননের বিকাশের স্বার্থে এই বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের উৎস শিক্ষার্থীরা। এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এর চাপ যেন শিক্ষার্থীদের বইতে না হয় সেদিকে সরকারের সুদৃষ্টি প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে গবেষণা ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমের প্রতি মনোযোগী হতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাধ্যও করা যেতে পারে। আবার, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়মিত বেতন থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তারা শিক্ষাদানে সেভাবে মনোনিবেশ করতে পারেন না বা চান না। তাই তাদের বেতন যাতে যথাসময়ে দেওয়া হয়, সে ব্যাপারেও নজর দিতে হবে।

সব শিক্ষকের জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। সারাদেশে যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া রয়েছে সেখানে রদবদল করার সময় এসেছে। দলের সমর্থন ভারী করার জন্য যোগ্যতার থেকে দলীয় পরিচয়কে বড় করে দেখে শিক্ষক নিয়োগের এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি স্কুল, কলেজগুলোতেও আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি ফলপ্রসূ করে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছ।

শিক্ষার্থীদের মাঝে  শিক্ষা গ্রহণের থেকে গলাধঃকরণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিদ্যমান৷ পাঠ্যবই পড়ার থেকে গাইড বইয়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। এই সংস্কৃতির অপসারণ ঘটানো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একজন শিক্ষার্থী ছোটোবেলা থেকে এরকম একটা অসুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠলে, বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণের সময় সে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। শিক্ষার মূল যে শেখা সেই ‘শেখা’ নিশ্চিত করতে হবে। এখন কোনো পর্যায়ের শিক্ষার্থীই শেখার জন্য পড়ে না, তারা পড়ে ভালো মার্ক, ভালো জিপিএ বা সিজিপিএর জন্য। আমাদের সমাজ তাদের বাহবাও দেয়। তারা আহ্লাদিত হয়ে মনে করে তাদের আর কোনো দায়িত্ব নেই।

বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় চোখের পড়ার মতো। তরুণ মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের এক রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭৫ লাখ। আসক্তের শতকরা ৯০ ভাগকে কিশোর-তরুণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার শতকরা ৪৫ ভাগ বেকার ও ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট। আর উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। তাই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ প্রদর্শনের সময় এসেছে।

দেশের তরুণসমাজ, শিক্ষকদেরকে শিক্ষানুরাগী করে গড়ে তোলা ও সরকারি-বেসরকারি বিভাজন কমিয়ে সবার সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই সম্ভব একটি আধুনিক উন্নত শিক্ষার মানসম্পন্ন দেশ গড়ে তোলা। এর জন্য সবার সহযোগিতার পাশাপাশি চাই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাকা/হাকিম মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়