ঢাকা     সোমবার   ১০ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৬ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘ঘুড়িতে কাটাকাটি ছিল বিশ্ব জয়ের আনন্দ’

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫৭, ৩ জুলাই ২০২০  
‘ঘুড়িতে কাটাকাটি ছিল বিশ্ব জয়ের আনন্দ’

বিকেলের মিষ্টি রোদ যখন নীল আকাশকে সোনালী আভায় পরিপূর্ণ করে দেয়, ঠিক তখনই যদি দেখা যায় আকাশের বুকে রঙ বেরঙের ঘুড়ি, অনুভূতিটা কেমন লাগবে? সত্যিই অসাধারণ। ঘুড়ি উড়ানো একটি খেলা হলেও এটাকে একটি শখের কাতারে ফেলা যায়। ঢাকা শহরে সাধারণত গ্রীষ্মকালের অল্প কয়েক দিন ঘুড়ি উড়ানোর প্রবল মাতামাতি দেখা যায়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে শীতের বিদায়লগ্ন থেকেই এর আগমন ঘটে, চলে বৃষ্টির মৌসুম আসার পূর্ব পর্যন্ত।

ঘুড়ি আবিষ্কার নিয়ে মজার একটি ঘটনা রয়েছে। যদিও ঘটনার সত্যতা নিয়ে অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তিই সন্দিহান। ধারণা করা হয়ে থাকে খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ অব্দে চীনা দার্শনিক মোজির হাত ধরেই ঘুড়ির আবিষ্কার। তৎকালীন সময়ে চীনারা মাথায় এক ধরনের পাতলা কাপড়ের টুপি পরতো। টুপিগুলো এতটাই পাতলা ছিল যে, সামান্য বাতাসেই উড়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। এমন সমস্যা সমাধানের জন্য এক প্রৌঢ় ব্যক্তি একটি সুতার মাধ্যমে থুতনী আর কানের সাথে টুপিটাকে বেঁধে রাখতেন।

একদিন মোজি দেখলেন ওই বৃদ্ধ লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আর তার টুপির সুতো ঢিলেঢালা হওয়ায় মাথার উপরে টুপিটা বাতাসে উড়ছিল। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর তিনি সুতো দিয়ে কোনো কিছু উড়ানোর ধারণাটি পেয়ে যান।

অবশ্য এর পরই আমাদের এখনকার শৈল্পিক ঘুড়ি চলে আসেনি। চীনারা তখন দূরত্ব পরিমাপ করা, সংকেত আদান-প্রদান করা, বাতাসের গতি নির্ণয় করা ইত্যাদি কাজে ঘুড়ি ব্যবহার করতেন। এমনকি চীনের শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করার জন্য কাঠের তৈরি বিশেষ ধরনের এক ঘুড়ির সাথে বিস্ফোরক বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই মূলত ঘুড়ির উদ্ভব হয় এবং কালক্রমে ইউরোপীয়দের মাধ্যমে এটি একটি শখ এবং খেলায় রূপান্তরিত হয়।

এবার ঘুড়ি নিয়ে কিছু অজানা তথ্য জেনে নেই। ১৭৪৯ সালে স্কটিশ দুই বিজ্ঞানী টমাস মেলভিন ও আলেক্সান্ডার উইলসন ঘুড়ির গায়ে থার্মোমিটার যুক্ত করে আকাশে উড়িয়ে পৃথিবীর উপরের স্তরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে ঘুড়ির সাথে অ্যানিমোমিটার যুক্ত করে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩০০ ফুট উচ্চতায় পাঠিয়ে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ডগলাস আর্কিবল্ড বাতাসের গতিবেগ পরিমাপের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। ২০১১ সালে ব্রিস্টল ইন্টারন্যাশনাল কাইট ফেস্টিভ্যালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকারের ঘুড়িটি প্রায় ২০ মিনিট যাবৎ আকাশে উড়েছিল, যার আয়তন ১০৯৭১ বর্গফুট।

ঘুড়ি উড়ানো একাধারে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং সকল বয়সীদের বিনোদনে পরিণত হয়েছে। পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা হচ্ছে ঘুড়ি উড়ানো। পৌষ সংক্রান্তিতে পুরান ঢাকায় এটি মহা ধুমধামে পালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজোয় ঘুড়ি উড়ানো হয়ে থাকে। তবে ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় এশীয় দেশগুলোতে ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন বেশি। সবচেয়ে বেশি ঘুড়ি উড়ানো হয় জাপানে।

একসময় জাপানে ঘুড়ি উড়ানোর প্রবণতা এতটাই তুঙ্গে উঠে যায় যে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বন্ধ করে শুধু ঘুড়ি উড়াত এবং জাপান সরকার সাময়িক সময়ের জন্য ঘুড়ি উড়ানো নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

ঘুড়ি নিয়ে আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা খুব মজার এবং রোমাঞ্চকর। ছোটবেলায় গ্রামের মানুষকে এক অভিনব পদ্ধতিতে ঘুড়ি উড়াতে দেখেছি। বিশাল আকারের দ্বিমাত্রিক ঘুড়িগুলো (চঙ্গা ঘুড্ডি) বাদামী রঙের কাগজ দিয়ে তৈরি করা হতো। আকাশে উড়ার সময় এগুলো খুবই মনোমুগ্ধকর লাগত। আর ঘুড়ির নিচের অংশে বড়, মাঝারি পুরুত্বের অথচ হালকা দড়ি লাগানো থাকত, যাকে বলা হতো লেজ। এই লেজের কারণে ঘুড়ির ভারসাম্য বজায় থাকত, সেই সাথে সৌন্দর্য আরও বেড়ে যেত। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো প্লাস্টিকের বস্তা থেকে তন্তু খুলে নিয়ে ঘুড়ির উপরের দুই প্রান্তের সাথে সটান বেঁধে দেয়া হত। উপরে উড়ার সময় এই তন্তুগুলো বাতাসের সাথে কম্পন তৈরি করে এক ধরনের ব্যতিক্রমী শব্দ তৈরি করত। নিচে থেকে শব্দগুলো অনেকটা বেহালার মতো লাগত।

বড়ই শূন্যতা অনুভব করি সেই দিনগুলোর। আবারও যদি ফিরে পেতাম সেই দিনগুলো! সেই বিকেল বেলায় ঘুড়ি আর নাটাই নিয়ে দৌড়ে চলে যেতাম মাঠে। বন্ধু ঘুড়ি ছাড়ার সাথে সাথে লাটাই হাতে দৌড় দেওয়ার সময় হাফপ্যান্ট পরিধান করা উন্মুক্ত শরীরে বাতাস লাগলে যেন শিউরে উঠতাম। দখিনা বাতাসে যখন বাহারি রঙের ঘুড়ি উড়ে নীলাম্বরখানি রঙিন করে দিত, তখন যেন প্রকৃতি এক নতুন রূপ পেত।

বন্ধু কৌশিক তার ছোটবেলার ঘুড়ি উড়ানোর অবিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বলেন, আকাশে রঙিন ঘুড়ি দেখলে কার না কৈশোরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে! গাঁয়ের ছোট্ট নদীটির পাড়ে সবুজ ঘাসের মাঠে লাটাই নিয়ে সারাটা দিন কাটিয়ে দিলেও মনে অতৃপ্ত কিছু থেকেই যায়। কেননা আমরা ঘুড়ি হিসেবে নিজের মনকেই উড়িয়ে দেই খোলা আকাশে।

আরেক বন্ধু টুটুল তার ঘুড়ি উড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ঘুড়ি উড়ানো আমাদের শৈশবের একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে। খোলা মাঠ হোক বা বাড়ির ছাদ। ২ টাকা থেকে ঘুড়ির দাম শুরু হতো। অনেক দামের ঘুড়িও ছিল। আর যারা পারতাম না, তারা পলিথিন আর শলার কাঠি দিয়ে ঘুড়ি বানাতাম। তারপর কাঠির মধ্যে সুতা পেঁচিয়ে নাটাই বানিয়ে উড়াতাম। আর মাঞ্জা কাটা, ঘুড়ি কাটাকাটির পর ঘুড়ি ধরতে যে দৌড় দিতাম, সেটা হাতে পাবার পর ছিল শৈশবে বিশ্ব জয়ের আনন্দ।

লেখক: শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


জবি/হাকিম মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়