ঢাকা     মঙ্গলবার   ১১ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৭ ১৪২৭ ||  ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘প্রয়োজন অনলাইন উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা’

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫১, ৫ জুলাই ২০২০  
‘প্রয়োজন অনলাইন উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা’

চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে থমকে আছে বিশ্ব। প্রায় প্রতিটি দেশই এই ভাইরাসের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যখাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের অবস্থাই শোচনীয়। স্বাস্থ্যখাতে উন্নত দেশও সংক্রমিত রোগীদের সেবায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সেখানে তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলোর জন্য করোনাভাইরাস মোকাবিলা করাটা যে বাস্তবিক অর্থে কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লকডাউনে ঘরে বসে মানুষের চিন্তা এখন করোনা পরবর্তী সময়ে দেশের অবস্থা কি হবে এসব নিয়ে! তবে করোনা পরবর্তীকালে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মানুষের চিন্তা- কবে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান?

করোনা পরবর্তী দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। তবে তার আগে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে এই লকডাউনে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কামার, কুমোর, কৃষক, জেলে, মেথর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, চা-বিক্রেতা আর পান-বিক্রেতাদের মতো খেটে খাওয়া নিম্মবিত্ত মানুষের কথা আমরা কতটা ভাবছি? কিন্তু এসব মানুষের জীবন-জীবিকা এই করোনাকালে বেশি হুমকির মুখে। তাই নয় কি? তাদের এমনিতেই ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা তার ওপরে এত দীর্ঘ লকডাউনে সংসারে অর্থনৈতিক সহ নানান সমস্যা দেখা দেবেই। সামান্য চাকুরি করে যারা সংসার চালাতেন তারা চাকুরি হারিয়ে ইতোমধ্যেই পাড়ার মোড়ে সবজি বিক্রি করতে শুরু করেছেন। রেমিটেন্স যোদ্ধারা কেউ চাকুরি হারাচ্ছেন কেউ হারিয়েছন। ভুগছেন হতাশায়। সত্যি বলতে কেউই এখন ভালো নেই।

দৃষ্টি দেওয়া যাক দরিদ্র জনসাধারণের সন্তানদের উপর। যাদের দু’বেলা খেয়ে বেঁচে থাকার অবস্থা নেই। এই সময় সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো কিংবা পড়াশোনা চালু রাখা বিলাসিতা বৈ কিছুই নয়। কথা হচ্ছে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর তারা কি তাদের সন্তানদের এমন সময়ে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইবেন যখন করোনা সমস্যা শেষ হয়ে যাবে? শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার যোগাযোগ রয়েছে তীব্রভাবেই। তাই করোনার প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। কারন এসব সাধারণ পরিবারের মানুষ বাধ্য হয়েই চাইবেন তাদের সন্তানেরা পরিবারে সহায়তা করুক। এর ফলে বৃদ্ধি পাবে শিশুশ্রমের সংখ্যাও। হয়তো বাড়বে বাল্যবিবাহের মতো অভিশাপও। মোটকথা করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার নিকট অতীতের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে। শিক্ষাবিদরা আশঙ্কা করছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ফিরবে না।

ইতোমধ্যে উন্নত দেশগুলো করোনা পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে আমাদেরও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘মিড ডে মিল’-এর আয়োজন করা যেতে পারে। খাবারের আশায় হলেও তখন অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে যাবে। তাছাড়া এই উদ্যোগের ফলে দরিদ্র পিতা-মাতা সন্তানদেরকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে হয়তো দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবেন। একবার যদি কোন বাবা-মা শিক্ষার্থীদেরকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কাজে লাগিয়ে দেন তবে সেখান থেকে আবার স্কুলে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।

মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও আশঙ্কাজনক। এখানে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর উচ্চ মাধ্যমিকে ২০১৮ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঝরে পড়ার হার নেহায়েত কম নয়। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ অনেক বেশি হওয়ায় প্রতি বছরই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি টিউশন ফি না কমায় বা কোনো বিশেষ বিবেচনা না করে, তাহলে অনেক শিক্ষার্থীরই আর কোনো উপায় থাকবে না। নেমে পড়তে হবে পরিবারকে সহযোগিতায়।

২০১১ সালে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। প্রায় ছয় মাস পরে এই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যায়। বাংলাদেশ সরকার গতবছর ‘মিড ডে মিল নীতি-২০১৯’ চালু করেন। এখন এই নীতির যথাযথ বাস্তবায়নের অপেক্ষা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। তখন জাপান সরকারও এই নীতি বাস্তবায়ন করে। এমনকি জাপান এখনো তাদের ওই ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখেছে। আমাদের দেশেও এই নীতির বিকল্প নেই।

শিক্ষাই একটি জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করা উচিত। অন্ততপক্ষে এই বছর শিক্ষাব্যবস্থায় লকডাউনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ‘আপদকালীন বাজেট’ বাড়ানো যেতে পারতো। উন্নত দেশগুলোতে অনলাইন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিলেও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র শ্রেণীকক্ষভিত্তিক পাঠদান ব্যবস্থায় অধিকতর নির্ভরশীল। এই স্থবিরতা জেঁকে বসেছে প্রকটরূপে। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য সকলের কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে। তাই কোনো উদ্যোগই এখন পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে না। করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির হয়ে আছে। এখন  শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনলাইনকরণ করতে হবে। তা করতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনলাইন উপযোগি করেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

হাবিপ্রবি/মাহফুজ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়