ঢাকা     বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭ ||  ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

সংকট থাকলেও ব্যয় হয়নি কুবির আড়াই কোটি টাকা

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫৬, ৮ জুলাই ২০২০  
সংকট থাকলেও ব্যয় হয়নি কুবির আড়াই কোটি টাকা

সংকট থাকলেও ল্যাবরেটরি, বই, কম্পিউটার ও শিক্ষা উপকরণ ক্রয়সহ মোট ১০টি খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় করতে পারেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬টি অনুষদের মধ্যে ৪টি অনুষদের শিক্ষার্থীরাই ল্যাবরেটরির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবুও বছরজুড়ে ল্যাবের জন্য বরাদ্দ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রশাসন ব্যয় করেনি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

অর্থ ও হিসাব দপ্তরসূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ অর্থবছরে ল্যাবরেটরি খাতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বই ক্রয় খাতে ১০ লাখ টাকা, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ক্রয় খাতে ১৫ লাখ, অফিস সরঞ্জাম ক্রয় খাতে ১২ লাখ, শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ ক্রয় খাতে ১০ লাখ, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি ক্রয় খাতে ১০ লাখ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ৫ লাখ, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ ক্রয় খাতে ৪০ লাখ, আসবাবপত্র ক্রয় খাতে ১৮ লাখ এবং আইকিউএসির ১০ লাখ টাকাসহ মোট ১০টি খাতের ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারেনি প্রশাসন।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪২ কোটি ১৭ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা হলেও তা সংশোধিত হয়ে ৪৭ কোটিতে গিয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয়টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগ থাকলেও চারটি অনুষদের ১২টি বিভাগে কোনো ল্যাব সুবিধা নেই। সমাজবিজ্ঞান অনুষদে একটি ল্যাবরুম থাকলেও কম্পিউটারগুলো অধিকাংশ বিকল। দীর্ঘদিন ধরেই এটি ব্যবহার হচ্ছে না। আর ব্যবসায় অনুষদের জন্য ল্যাবের কাজ প্রক্রিয়াধীন হলেও এখনও শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারেনি। অন্য দিকে কলা ও মানবিক অনুষদ এবং আইন অনুষদের কোনো ল্যাব নেই। প্রকৌশল এবং বিজ্ঞান অনুষদে কয়েকটি ল্যাব থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। অনেক মৌলিক ব্যবহারিক ক্লাস ল্যাবের অভাবে শিক্ষার্থীরা করতে পারে না। এত সংকট থাকার পরেও বাজেটের টাকা কেন খরচ করা হচ্ছে না এমন প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজুল হুদা বলেন, ‘আমাদের পুরো বিভাগে মাত্র ২টি ল্যাব। কোনো কম্পিউটার ল্যাব নেই। অথচ প্রত্যেক বিভাগেই অন্তত কম্পিউটারের একটি ল্যাব থাকা দরকার। যে দুটো আছে, তাতে আমাদের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ চাহিদা পূর্ণ হয়।’

ফার্মেসি বিভাগ ল্যাবনির্ভর হলেও বিশেষায়িত কোনো ল্যাব নেই তাদের। ৭ ব্যাচের জন্য মাত্র ৩টি ল্যাব। দাম বেশি হওয়ায় উন্নমানের যন্ত্রপাতিও নেই। বাজেটও বরাদ্দ দেওয়া হয় কম। ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভাগটির শিক্ষার্থী নূরুল মোস্তফা বলেন, ‘মাস্টার্সে ক্লাস করার জন্য বিশেষায়িত ল্যাবের প্রয়োজন, যা আমাদের নেই। উন্নত মেশিন যেমন এইচপিএলসি ও এমআর মেশিন আমাদের এখানে নেই, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর ল্যাবের জন্য বাজেটও দেয় কম। অথচ প্রশাসন পূরো বাজেট খরচ করছে না। বিষয়টি দুঃখজনক।’

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে সদস্য স্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থী শাহরিমা শশী বলেন, ‘স্নাতক শেষ করে ফেললাম। বিভাগ তো দূরে থাক পুরো অনুষদেও একটা ল্যাব নেই। চার বছর ধরে শুধু আশ্বাসের কথাই শুনেছি। অথচ ল্যাবের জন্য বরাদ্দ টাকা তারা খরচই করতে পারছে না। কিন্তু কেন?’

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র দেব বলেন, ‘ল্যাবের জন্য ৩০টি কম্পিউটার আছে। ফার্নিচার এলেই আমরা ল্যাব চালু করতে পারবো।’

তবে চার বিভাগের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৩০টি কম্পিউটারের একটি ল্যাব যথেষ্ট হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আরম্ভ তো করতে হবে। আরম্ভ করি। আমাদের জায়গা কম। আপাতত এগুলো দিয়েই শুরু করবো।’

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ‘ল্যাব একটি আছে কিন্তু সচল নয়। কিছু কম্পিউটার আছে। তবে অধিকাংশই নষ্ট। এগুলো রিপ্লেস করতে হবে। ল্যাবের জন্য চাহিদাপত্র দেওয়া ছিল, কিন্তু করোনার জন্য প্রসেসিংয়ে আছে। এবার না হলেও পরের বছরের বাজেট মিলিয়ে করোনা পরিস্থিতি ভালো হলে হয়ে যাবে।’

এদিকে গত বছর উত্তরপত্রের সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেরা উত্তরপত্র কিনে পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একটি বিভাগে। টেন্ডার জটিলতায় আটকে ছিল উত্তরপত্র ক্রয়। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি বিভাগেই উত্তরপত্র সংকট ছিল। শিক্ষকরা চাহিদা দিলেও পরিমাণের চেয়ে অনেক কম উত্তরপত্র পেতেন। টেন্ডার জটিলতায় সে উত্তরপত্র আর ক্রয় করা হয়নি। শিক্ষা ও শিক্ষা উপকরণ ক্রয় খাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক হলগুলোতে লাগানো অধিকাংশ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রই হয় মেয়াদোত্তীর্ণ অথবা অকেজো। গত বছরের মার্চ মাসে ছাত্রী হলে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনার পরেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ক্রয় খাতে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এছাড়া শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় বই না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। কম্পিউটারের অভাবে বন্ধ রয়েছে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ল্যাবরুমও। তবুও এসবের বাজেট থাকা সত্বেও ব্যয় না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. রশিদুল ইসলাম শেখ বলেন, ‘আমার মনে হয় টাকা ব্যয় করতে না পারা প্রশাসনের দুর্বলতা। সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটা ঘটেছে। বাজেট নিয়ে নিয়মিত মিটিং না হওয়া আমি মনে করি এর অন্যতম কারণ। করোনার কারণে হয়তো আমাদের ৩ মাস সময় নষ্ট হয়েছে। কিন্তু বাকি নয় মাস কাজ করার সুযোগ ছিল।’

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘টেন্ডার জটিলতার কারণেই এমনটি হয়েছে। আমরা টেন্ডার করেছিলাম। এগুলার টেন্ডার সঠিকভাবে হয়নি। সেজন্য আমাদের রিটেন্ডারে যেতে হয়েছে। টেন্ডার জটিলতার কারণেই মূলত ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার জন্য আমরা ই-টেন্ডার আহ্বান করেছিলাম। হয়তো ব্যাকরণ ফলো করে টেন্ডার হয়নি। সেগুলো আবার রিটেন্ডারে যাবে।’

আর বরাদ্দকৃত টাকা আগামী অর্থবছরে যোগ হবে বলেও জানান তিনি।

 

 

কুবি/মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়