ঢাকা     বুধবার   ১২ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৭ ||  ২১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

করোনায় জবি শিক্ষার্থীদের ঈদ

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৮, ২ আগস্ট ২০২০  
করোনায় জবি শিক্ষার্থীদের ঈদ

চলছে করোনার রাজত্ব। কোটি কোটি মানুষের আর্তনাদে প্রকম্পিত বিশ্বের প্রতিটি জনপদ। কিছুটা অস্বাভাবিকতার ছোঁয়ায় সব কিছুই এলোমেলো মনে হচ্ছে। 

এ অবস্থায় মানুষ যখন প্রিয়জন হারানোর শোকে ব্যথিত, ঠিক তখনি খুশির বার্তা নিয়ে উপস্থিত মুসলিম জগতের সবচেয়ে আনন্দের দিন পবিত্র ঈদুল আজহা। সারাবিশ্বের মুসলিমদের অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব হলো এ ঈদ। এই দিনে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে তাদের প্রাণ। 

করোনাকালীন ব্যতিক্রমভাবেই উদযাপিত হয়েছে এ ঈদ। ঈদের আনন্দ কিছুটা উপভোগ করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে যার মতো করে চেষ্টা করেছে। করোনাকালীন এই সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের কেমন কাটলো ঈদ, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের ঈদ ভাবনা, আয়োজন, উদযাপন তুলে ধরেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ।

ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুজন আহমেদ বলেন, আমাদের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বলতে বছরে দুইটি ঈদ। ঠিক চৌদ্দ কি পনেরো বছর আগে যখন গ্রামে শৈশবের সময় কাটাতাম তখন ঈদ আসছে আসছে জেনে নিজের মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ কাজ করতো। সেই সময়ের কোরবানি ঈদ মানেই তো ভয়ে ভয়ে দূর থেকে গরু জবেহ দেখা কিংবা জবেহর পর সেই গরুর জন্য মন খারাপ করে থাকার গল্পগুলো অসাধারণ। 

বাড়ি ভর্তি মানুষ মিলে মাংস কাটাকাটি করে ব্যস্ত দিন পার করা আর তারপর পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া। দিনভর খেলাধুলা আর হৈচৈ করে সময় কাটানো মূহুর্তগুলো জানান দেয় শৈশব কত সুন্দর। আহা সময় বড় বেমানান। ঈদ মানেই সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করা। বড় বড় ঈদ জামাত, কোলাকুলি-কুশল বিনিময় কিংবা আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশির বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়া, পুরনো হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সাথে আড্ডাগুলো বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মাঝে অনেকটাই সীমাবদ্ধতার মুখ দেখবে। কিন্তু তারপরেও আমাদেরকে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পরিবারের সাথে আনন্দটা খুঁজে নিয়েছি। 

মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসমা আলী মিম বলেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে প্রিয় পশুকে কোরবানি করা হয় এই দিনে। বস্তুত মহামারিতে সবার পক্ষে কোরবানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সামর্থ্যবানদের উচিৎ সমাজের সব অসহায়দের নিয়ে কোরবানি করা। 

এমন অসুস্থ পৃথিবীতে যে ঈদ পালন করতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। করোনা আতঙ্কে সব মিলিয়ে এবারের ঈদ আমার কাছে বর্ণহীন ফ্যাকাসে মনে হয়েছে। করোনাকালীন এবারের ঈদের পুরো সময়টা পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চাচ্ছি। ঈদের দিন আম্মুকে রান্নার কাজে সহযোগিতা ছাড়াও অনলাইনে বন্ধুদের সাথে ঈদের সৌহার্দ্য বিনিময় করেছি। 

এ পরিস্থিতিতে আমাদের উচিৎ সবার পাশে থাকা। যথাসম্ভব নিজের অবস্থান থেকে অন্যকে সাহায্য করা। প্রার্থনা করি, পৃথিবী যেন তার আগের চিরচেনা রূপে খুব শীঘ্রই ফিরে আসে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবাহ্ বলেন, ঈদ মানেই আনন্দ। জীবনের নানা সময় নানাভাবে ঈদ পালনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। শৈশবের ঈদগুলো ছিল একরকম, কৈশোরের ঈদগুলো ছিল অন্য রকম। তরুণ হওয়ার পর ঈদগুলো আরেক ধরনের আনন্দ বয়ে আনতো। এক বয়সের আনন্দগুলো একেক রকমের হলেও আনন্দ ঠিকই হতো। শৈশবের ঈদের আনন্দগুলো শুরু হতো মেহেদি ও নতুন জামা দিয়ে। তারপর কৈশোরের দিনগুলোতে আরো সংযোজন ঘটলো ঈদ কার্ড কেনা। 

টিফিনের টাকা জমিয়ে হরেক রকমের ঈদ কার্ড কিনে ফেলতাম, তারপর বন্ধুদের ঈদের দাওয়াত দিতাম। তারপর ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর ঈদ মানে হয়ে উঠলো ঈদের ছুটি পাওয়া, টিকেট কাটার জন্য ব্যস্ততা অর্থাৎ বাড়ি আসার পূর্বপ্রস্তুতি। দলবদ্ধ হয়ে আমরা সবাই ফিরতাম নাড়ির টানে। একসঙ্গে ফিরতাম ট্রেনে অথবা বাসে একঝাঁক তরুণ-তরুণী। ঈদের এই মজাটাও ছিল অন্য রকম। 

ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান সাব্বির বলেন, ঈদ মানেই আনন্দ-খুশির আমেজ। এই দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে কত পরিকল্পনা! প্রতিবছর দিনটিকে ঘিরে মনের ভেতরে একটা ছটফটানি শুরু হয়ে যায় সবার মাঝে। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর জন্য অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দেখা দেওয়ার কারণে সমস্ত ধর্মীয় উৎসব উদযাপনেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। যেহেতু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, তাই প্রতিবছর ঈদে সবাই যেমনটা উপভোগ করে, এবার তেমনটা উপভোগ করতে পারবে না। 

সকালে গোসল করে প্রস্তুত হয়ে নামাজ পড়তে যাওয়ার পৃর্বে একটি ভিন্ন রকম পরিকল্পনা ছিল, সেটা হলো আব্বু এবার আমাকে ঈদ সেলামি হিসেবে পাঁচশ টাকা দিলেন, যা ছিল আমার ঈদ কেন্দ্রিক সব আনন্দের সেরা। 

আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন মৌরী বলেন, করোনায় এবারের ঈদে সবকিছু জানি কেমন থমকে গেছে। করোনার ভয় মানুষের মন থেকে অনেকটাই কমে গেছে, কিন্তু তাও মানুষের মধ্যে সেই দুশ্চিন্তা যেন ঘর পেতে বসেছে। এ কারণেই ঈদের আলাদা কোনো আমেজ পায়নি। অন্য সময় তো মানুষ বহুদিন পরে বাড়ি ফিরে ঈদের আমেজ, গরু কিনাকাটা সব মিলিয়ে পুরোই আলাদা একটা আনন্দের জন্ম হয়। কিন্তু এবারের ঈদটা পুরোটাই ভিন্ন। পৃথিবী থমকে গেছে, তার সাথে সাথে মানুষের আনন্দগুলো থমকে গেছে। উচ্ছ্বাস নেই, নেই আগের মতো আর সেই আমেজটা। তবুও সবাই এই গৃহবন্দিটাকেই আপন করে নিতে হবে। 

দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাকা শিমু বলেন, ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। আর দীর্ঘ দিন অপেক্ষার পরে যখন ঈদের দিনটি চলে আসে, তখন এই খুশি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। ঈদের দিনটি আসলে অনেক বেশি উপভোগ করার দিন। খাওয়া- দাওয়া, ঘোরাঘুরি, আড্ডা দেওয়া এসবের মাধ্যমে সুন্দরভাবে কেটে যেত দিনটি। স্কুল-কলেজের সময়টাতে ঈদের আগে অনেক আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম কবে ঈদের ছুটি দেওয়া হবে। আবার ছুটি দিলে মন খারাপও হতো, কেননা অনেক দিন বান্ধবিদের সাথে দেখা হবে না। সবমিলিয়ে তখন সময়টা অন্য রকম যেতো।

আমি মনে করি, ঈদ আনন্দ সবার জন্য সমান। তাই নিজের যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে কিছু অসহায়-দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোঁটানোর চেষ্টা করেছি ‘সেভ দা টুমরো’ গ্রুপের মাধ্যমে। এবারের ঈদটা একটু ব্যতিক্রম ভাবেই কেটেছে সবার। এই সময়ে নিজে সুস্থ থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। তাই সবাই ঘরে থেকে, সুস্থ থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করুন, এটাই প্রত্যাশা।

 

জবি/মাহি  

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়