ঢাকা     মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৭ ||  ০৪ সফর ১৪৪২

বিশ্ব আদিবাসী দিবস

‘চাই মৌলিক অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন’

ধীরা ঢালী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:২৯, ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘চাই মৌলিক অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন’

‘গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে বলা যায়, আমরা মানুষ, আমরা অসাম্প্রদায়িক, আমরা সম্প্রীতির চাদরে মোড়ানো এক শান্তির জাতি। আমরা সম্মান জানাই বিশ্বকে, সম্মান জানাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে। 

আমাদের সম্প্রীতির বার্তাকে আজ আমরা পাহাড়সম উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছি। অথচ আমাদের এই দুর্গম অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মনের খবর কি কেউ রাখে! 

আজ, ৯ আগস্ট। এই দিনটি উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে দিয়ে। অথচ দিনটিকেই বেছে নিতে হয়, সবার অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে। কেন? 

করোনাকালীন সময়ে মলিন ফ্রেমে আবদ্ধ এই বিশেষ দিনটির অনুভূতি ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের শিক্ষার্থী ঞোয়াইসিন মারমা। তিনি বলেন, ‘আদিবাসী দিবস নিয়ে অনুভূতি এবার অন্যরকম। প্রতিবছর আমরা সবাই মিলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দিবসটি উদযাপন করি। নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে আমরা এই একটি দিনই বাছাই করি। কিন্তু এবার করোনাকালীন সময়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারছি না।’ 

‘আমরা এখনো অবহেলিত সবদিক থেকেই। সত্য কথা বলতে এই একটি দিনেই আমাদের সবকিছু পূরণ হতে পারে না। আমরা এখনো আমাদের প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাই না। আমাদের বাক স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। আজকের এই বিশেষ দিনে একটাই চাওয়া, আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকারটুকু পেতে চাই’, বলেন তিনি। 

বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এবং তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ ও চর্চা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসনীয়। তবে এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদাগুলো কি আজও আমরা মেটাতে পেরেছি! আর কতটুকুই বা পেরেছি! এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী রাম খুম লিয়ান মংপা বম বলেন, ‘আদিবাসী দিবস প্রসঙ্গ এলেই একটু মিশ্র অনুভূতি অনুভব হয়। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসীদের ঐতিহ্য রক্ষার্থে নানারকম কর্মসূচি পালন করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে কিঞ্চিৎ পরিমাণেই এর প্রয়োগ দেখা যায়।’ 

‘আদিবাসীদের মৌলিক চাহিদা প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমেই সাম্প্রতিক বিষয়গুলো তুলে ধরতে হয়। করোনাকালীন এই দুঃসময়ের মধ্যে যখন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং শত শত নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারায়। যেটা আধুনিক এই যুগে মোটেও কাম্য নয়। তখনই আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো কতটা পূরণ হয়েছে বা হচ্ছে’, বলেন তিনি। 

মংপা বম আরও বলেন, ‘যেখানে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে জন্মের পরে শিশুকে পোলিও ও টিকা দেওয়া হয়, সেখানেও আমরা বঞ্চিত। আমাদের জীবন এতটাই মূল্যহীন। আর এরপরও আমরা আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো নিয়ে দাবি জানাতে পারি না।’ 

আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন জাতি। বহু মূল্যবান জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ মহান স্বাধীনতা। আমরা যে স্বাধীন এই পরিচয় আমরা কি নির্দ্বিধায় দিতে পারি! আমরা কি আজও পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ? এমন প্রশ্নের জবাবে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মেসাইনু মারমা বলেন, ‘দিন শেষে এ দেশের আদিবাসীরা একটি অবহেলিত শব্দ মাত্র। আমরা জানি, মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল জাতিগত শোষণের অবসান ঘটানো। অথচ আজ অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা অবহেলিত, পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ। আমাদের নেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার।’ 

‘পাহাড় ও সমতলে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতন, ভূমি দখল আজও চলে আসছে। আমরা এই ভয়াবহ গ্রাস থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই’, বলেন তিনি।

মানুষের অধিকার হবে সম-অধিকার, সমাজব্যবস্থা হবে সমান্তরাল, মানুষের বন্ধন হবে ভ্রাতৃত্বের, আর বিশ্ব হবে সম্প্রীতির চাদরে মোড়ানো অনাবিল প্রশান্তিতে ভরপুর এক নতুন বিশ্ব। আসুন আমরা সম্প্রীতির গল্প বলি, ভ্রাতৃত্বের নজির গড়ি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে আবদ্ধ হই।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়। 

গবি/মাহি

রাইজিংবিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়