ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

ফুলও নাকি মাংস খায়

ছাবিত হোসাইন মজুমদার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩৮, ১১ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
ফুলও নাকি মাংস খায়

সত্যিই বিচিত্র আমাদের এই পৃথিবী! কত-শত জীবজন্তু আর গাছ-গাছালিতে ভরপুর আমাদের এই পরিবেশ। তবে, এমন কিছু গাছ রয়েছে, যেগুলো সত্যিই সবাইকে চমকে দিতে পারে।

আমরা জানি, উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে। কিন্তু কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে, যাদের আবার এত সময় নেই! তাদের চাই চটজলদি খানাপিনা। তাই তো এরা সরাসরি সাবাড় করে চলেছে পোকামাকড়।

কলসি উদ্ভিদ বা Pitcher Plants হচ্ছে কতিপয় আলাদা প্রকারের মাংসাশী উদ্ভিদ, যেগুলোর পরিবর্তিত পাতাগুলো এক ধরনের বিপদের ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। এই বিপদের ফাঁদগুলো শিকার ধরার কৌশলী হিসেবে কলসি উদ্ভিদের পাতাগুলোর গভীর গহ্বরটি তরল দ্বারা পূর্ণ থাকে। এই কলসি উদ্ভিদকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাংসাশী উদ্ভিদ বলে চিহ্নিত করা হয়।

কলসি উদ্ভিদে ফাঁপা বিশেষ ধরনের পাতা রয়েছে, যা একটি জগ কিংবা কলসির মতো জল ধরে রাখতে পারে। কলসির মতো দেখতে এই পাতাগুলোই শিকার ধরার ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। এদের গঠন ও আকৃতি থেকেই এদের নাম দেওয়া হয়েছে কলসি উদ্ভিদ।

গ্রীষ্মমন্ডলীর কলসী উদ্ভিদে সাধারণত পাতা ও উজ্জ্বল রঙের কলসির মতো পাতা দুটোই রয়েছে। একটি আকর্ষী থেকে ধীরে ধীরে সুতোর মতো একটি পাতা উৎপন্ন হয়। পাতাটি বড় হতে হতে ফুলে উঠে রঙিন একটি জগ বা কলসির মতো আকৃতি লাভ করে। এর উপরের দিকে পাতার একটি ঢাকনাও তৈরি হয়। কোনো কোনো কলসি উদ্ভিদে ঢাকনাটি কলসির কিনারে শোভাবর্ধক হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন প্রজাতি কলসি উদ্ভিদের পাতাগুলোর রঙ ও আকৃতি ভিন্ন হতে পারে।

ছোট ছোট কলসি উদ্ভিদগুলো মাছি, গোবরে পোকা, পিঁপড়া ইত্যাদি পোকামাকড় শিকার করে। বড় বড় কলসি উদ্ভিদগুলো ব্যাঙ এমনকি ছোট আকারের ইঁদুর পর্যন্ত সাবাড় করে ফেলে। সব কলসি উদ্ভিদ কিন্তু একই পদ্ধতিতে শিকার ধরে। কলসি উদ্ভিদগুলোর ফাঁদ পরোক্ষ ধরনের। অর্থাৎ কোনো নড়াচড়া ছাড়াই এরা শিকার করে থাকে। এ উদ্ভিদগুলোর গঠন এমন যে এর ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া পোকামাকড় একটি বন্দিশালার মতো কাজ করে। নলের মাথায় থাকে একটি রঙচঙে প্রবেশ পথ। নলের তলদেশটি পেয়ালাকৃতির। যেসব কলসি উদ্ভিদ মাটির কাছাকাছি জন্মে, তাদের মধ্যে বৃষ্টির পানি জমা হয়ে থাকে। অধিকাংশ কলসি উদ্ভিদের ঢাকনাটি অতিরিক্ত পরিমাণ বৃষ্টির পানি পাতায় ঢুকতে বাধা দেয়। ঢাকনাটি সবসময় খোলা থাকে। ঢাকনাটির প্রবেশ মুখে সবসময় মধু উৎপন্ন হয়। 

কলসির উজ্জ্বল রঙ আর মধুর লোভে পোকামাকড় হামাগুড়ি দিয়ে কলসির ভিতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢোকার পর উদ্ভিদটি আরও মধু উৎপন্ন করা শুরু করে। ফলে পোকামাকড় অতিরিক্ত মধুর লোভে আরও গভীরে চলে যায়। পোকাটি কলসির নলের মধ্যে ঢোকার পরই বিপদের পড়ে যায়। নলের ভেতরের অংশটি বরফের মতো মসৃণ আর পিচ্ছিল। ফলে পোকাটি উপরের দিকে উঠতে চেয়ে কলসির একেবারে তলানিতে পড়ে যায়। তখন অবশ্য উপরে উঠেও লাভ নেই। কারণ কলসির ঢাকনাটি ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। 

নলের তলদেশে থাকে অসংখ্য শুঙ্গ (কাঁটার মতো দাঁত)। শুঙ্গগুলো সবই কলসির নিচে জমানো পানির দিকে ফিরিয়ে থাকে। এগুলো পার হয়ে গেলেই পোকামাকড় আর উপরের দিকে যেতে পারে না। এরপর পোকাটি পানিগুলোতে পড়ে যায়। পানিতে পড়ার পরপরই বের হতে থাকে পরিপাকে সাহায্যকারী উৎসেচক রস। মানে শুরু হয় পোকা হজমের প্রক্রিয়া। পোকার নরম অংশগুলো উদ্ভিদটির দেহে শোষিত হয় আর শক্ত অংশগুলো উদ্ভিদের নিচে জমা হয়। এরপর আবার ঢাকনাটি খুলে উদ্ভিদটি তৈরি হয়ে যায় পরবর্তী শিকারের জন্য!

এই গাছ সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জলাভূমিতে দেখা যায়। তবে, আমাদের সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলেও নাকি এই গাছের দেখা মিলেছে!

 

লেখক: শিক্ষার্থী, আলী আজম উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ।

ফেনী/মাহি 

রাইজিংবিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়