ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৯ ১৪২৭ ||  ০৬ সফর ১৪৪২

‘জীবনের জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ 

আরাফাত শাহীন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৬, ১৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘জীবনের জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ 

কোনো ঘটনা দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়। একটি হলো ইতিবাচক এবং অপরটি নেতিবাচক। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রথমেই এর নেতিবাচক আলোচনা তুলে ধরেন। অথচ সেই বিষয়টা নিয়ে আরও যাচাই-বাছাই এবং চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন ছিল। 

যখন অধিকাংশ মানুষের চিন্তা-চেতনা নেতিবাচক হয়ে যায়, তখন একটি সমাজ কিংবা দেশের মধ্যেও এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোনো বিষয়ে আশাহত হওয়া কিংবা নেতিবাচক চিন্তা করার আগে যদি আমরা বিষয়টা নিয়ে ভাবতে পারি, তাহলে হয়তো এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব।

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছিলেন, ‘শূন্যবাদী (Nihilist) ও নৈরাশ্যবাদীদের (Pessimistic) জীবনদৃষ্টি একপেশে। সবদিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলে বোঝা যায়, হাজারো সমস্যার মধ্যেও জীবন ও জগৎ মানুষের জন্য অন্তহীন সম্ভাবনায় পূর্ণ।’

পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, অনেকেই প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো ফলাফল করেছে। আবার অনেকের প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। যারা ভালো ফলাফল করেছে তারা উল্লসিত। যাদের রেজাল্ট প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তদের মন খারাপ। আমরা যদি এই বিষয়টিকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করি তাহলে এখান থেকেও ইতিবাচক কিছু পেতে পারি। 

অনেকের ধারণা রয়েছে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কিংবা জীবনে সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে হলে ভালো ফলাফল করা বোধহয় চিরায়ত নিয়ম! আমি মনে করি, এটি একটি নেতিবাচক চিন্তাধারা। কারণ, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য বন্ধুদের ক্ষেত্রে দেখেছি, তারা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল না করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে পড়াশোনা করছে। অনেককেই দেখেছি, যারা পড়াশোনা পরবর্তী জীবনে গর্ব করার মতো সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন।

আসল কথা হলো, তারা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। প্রত্যাশামতো ফলাফল না হওয়াতে তারা একটুও ভেঙ্গে পড়েননি। বরং তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি বুঝতে পেরেছি, তারা এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে পরবর্তীতে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। 

এইচএসসিতে আমার রেজাল্ট অন্য বন্ধুদের তুলনায় অনেকাংশে খারাপ হয়েছিল। কিন্তু আমার ভেতর সব সময় একটা সংকল্প কাজ করতো- আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বই। ফলে একটু দেরিতে হলেও আমি সফল হয়েছি। অথচ আমার অনেক ভালো রেজাল্ট করা বন্ধু প্রত্যাশামতো ভর্তি হতে পারেনি। সুতরাং ইতিবাচক মনোভাব লালন করা ছাড়া কোনো উপায় দেখি না। যারা অল্পতেই ভেঙ্গে পড়ে তাদের জন্য জীবন বড় কঠিন হয়ে দেখা দেয়।

অল্প পেয়ে সন্তুষ্ট হতে পারা মানবজীবনের অন্যতম বড় সফলতা। অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এই বিষয়টা দেখতে পাই না। কিছু মানুষ শুধইু পেতে চান; তারা পানও বটে। কিন্তু জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে উপলব্ধি করেন- তারা আসলে কিছুই পাননি। প্রখ্যাত লেখক ক্লাইভ বেল তাঁর Civilization গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যারা- আরো চাই, আরো চাই- মন্ত্র জপ করেন, দেখা যায়, কিছুতেই তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় না। যত পাচ্ছেন, ততই যেন চাওয়া আরো বেড়ে যায়।’ জীবনে অল্প পেয়েও সন্তুষ্ট থাকতে পারাই হলো ইতিবাচকতা। সব মানুষ লোভ সংবরণ করতে পারেন না। ফলে কঠিন ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয় তাদের।

আপনার বাড়িতে কোর্মা-পোলাওয়ের বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। অনেক মেহমান সেখানে আমোদে মত্ত। অথচ আপনার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী একবেলার আহার যোগাড় করার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছে। আপনার যদি তার প্রতি কোনো দরদ না থাকে তাহলে এটাই নেতিবাচকতা। সমাজের সকল মানুষ যদি এমন নেতিবাচক চিন্তা বুকে লালন করে চলে তাহলে সভ্য সমাজ বিনির্মাণ করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় ইতিবাচক হওয়া প্রয়োজন।

সামান্য জ্বর কিংবা শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে আমরা মুষড়ে পড়ি এবং স্রষ্টার প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করি। ভাবি, স্রষ্টা আমাদের বড় অসুখে রেখেছেন। এমন চিন্তা মাথায় এলে আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে গিয়ে একবার ঘুরে আসা উচিত। সেখানে মানুষের সীমাহীন কষ্ট এবং দুর্ভোগ দেখতে পেলে নিজেদের সম্পর্কে এমন নেতিবাচক ধারণা আর হবে না। যেকোনো পরিস্থিতিতে ইতিবাচক চিন্তা করতে পারা সবচেয়ে জরুরি।

পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, কোনো পরিবারের ছেলে বা মেয়ে খারাপ ফল করলে আমরা সামনে-পেছনে তার নিন্দা করি। অন্যের সঙ্গে তুলনা করে তাকে হেয় করার চেষ্টা করি। এতে একজন শিক্ষার্থীর ওপর নেতিবাচক মনোভাব চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমরা এভাবে একজন সন্তানকে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথে ঠেলে দিই। এ ক্ষেত্রেও আচরণ ইতিবাচক হওয়া প্রয়োজন।

আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার পাশাপাশি অন্তরে ইতিবাচক চিন্তা লালন করা অপরিহার্য। আমরা অতি দ্রুত সময়ে সাফল্যের মুখ দেখতে উদগ্রীব থাকি। এসব নেতিবাচক চিন্তা আমাদের চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কাজে সফলতা পেতে হলে ধৈর্য ও একাগ্রতা নিয়ে কাজ করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। চারপাশে মেধাবী মানুষের কোনো কমতি নেই। তারপরও আমাদের উন্নতির গ্রাফ কেন উর্ধ্বমুখী নয়? আমাদের কাজে ইতিবাচক ছোঁয়া দিতে ব্যর্থ হই। 

মনে হয় চাক্ষুষ দেখতে পাওয়া সাফল্যই বুঝি সবচেয়ে বড়। কিন্ত এই ধারণা সঠিক নয়। জীবনকে দেখতে হবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। তবেই জীবনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

রাবি/মাহফুজ/মাহি

রাইজিংবিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়