ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

‘বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু’ 

তুষার মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৭, ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু’ 

মধুমতি নদীর অসংখ্য শাখা নদীর মধ্যে একটি হচ্ছে বাইগার। বাইগার নদীর তীর ঘেঁষে ছবির মতো সাজানো সুন্দর একটি গ্রাম। নদীর দু’পাশে অসংখ্য গাছ ও সবুজের সমারোহ। ভাটিয়ালি গানের সুর ভেসে আসে হালধরা মাঝির কণ্ঠ থেকে। পাখির গান, নদীর কলকল ধ্বনি এক অবিশ্বাস্য মনোরম পরিবেশ গড়ে তোলে। বলছি এদেশের রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা। যেখানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, এদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি, পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুনের প্রথম পুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। 

তিনি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এদেশের মানুষের মুক্তির দূত হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জন্মের পর নানা শেখ আবদুল মজিদ তাঁর নাম রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং তিনি (শেখ আবদুল মজিদ) তাঁর কন্যা তথা বঙ্গবন্ধুর মাতা সায়রা খাতুনকে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দান করে বলেছিলেন তোর ছেলের নাম এমন রেখেছি যে নাম একদিন জগৎ বিখ্যাত হবে। বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছিল টুঙ্গিপাড়ার নদীর পানিতে ঝাঁপ দিয়ে, মেঠোপথে ধুলোবালি মেখে, মাছরাঙা কীভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরে, দোয়েল পাখির সুমধুর সুর শুনে।

গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন এবং সেখানেই তাঁর কৈশোর বেলা কাটে। পিতা-মাতা আদর করে ডাকত খোকা নামে এবং গ্রামবাসী ‘মিয়া ভাই’ নামে সম্বোধন করত। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তিনি বেশ আকৃষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে তিনি খুব ফুটবল অনুরাগী ছিলেন। ছোটকাল থেকেই তিনি অত্যন্ত হৃদয়বান ছিলেন। তখনকার দিনে ছেলেদের পড়াশোনার তেমন সুযোগ না থাকায় অনেকে জায়গির থেকে পড়াশোনা করত। চার-পাঁচ মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসতে হতো। সকালে খেয়ে আসলে সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় থাকত। আর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে ছিল বলে তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে খাবার খাওয়াতেন। ছাতার অভাবে বৃষ্টিতে ভিজে কেউ স্কুলে আসলে তাকে তাঁর নিজের ছাতা দিয়ে দিতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব অধিকার সচেতন ছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান, চাল, ডাল জোগাড় করে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের তিনি সহায়তা করতেন।

গোপালগঞ্জ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান। তখন তিনি বেকার হোস্টেলে থাকতেন। এই সময় তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে এসে হলওয়ে মনুমেন্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন সক্রিয়ভাবে। আর তখন থেকে রাজনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু।

১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। পাকিস্তান-ভারত ভাগ হওয়ার সময় দাঙ্গা হয়। তখন দাঙ্গা দমনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। অন্যায়কে তিনি কোনো দিন প্রশ্রয় দেননি। ন্যায় এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে তিনি কখনো পিছপা হননি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। নানা আন্দোলনের জন্য জীবনের অধিকটা সময় তিনি জেলে ব্যয় করে দিয়েছেন এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। জীবনের আনন্দ, সুখ, আহ্লাদ থেকে হয়েছেন বঞ্চিত। দেশের মানুষের ভালোবাসা তাকে সাহস দিয়েছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। 

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সর্বপ্রথম যখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি আঘাত হানে অর্থাৎ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষার ঘোষণা দিলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি বাঙালি প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। ছাত্র সমাজ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। এই আন্দোলনে ১৯৪৯ সালে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হোন। টানা ১৯৫২ সাল অবধি তিনি জেলে বন্দি থাকেন। তারপর থেকে দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ঘাতকের নির্মম নির্যাতন ও বুলেটের সামনে পথহারা বাঙালিকে যিনি পথ দেখিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য যিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, সারা বিশ্বে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন পতাকাবাহী রাষ্ট্র এনে দিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন হচ্ছেন পিতা মাতার আদরের খোকা, টুঙ্গিপাড়ার সবার ‘মিয়া ভাই’ খ্যাত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

স্বাধীনতা উত্তর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে ব্রত হয়ে যিনি নিঃস্বার্থভাবে এদেশের মানুষের ভাগ্যের চাকাকে ঘুরিয়ে দিতে এবং তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি কাজ করে চলেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যিনি সোনার বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেন সেই স্বপ্নসারথিকে দেশীয় কিছু নরপশু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করে এদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াল কালো অধ্যায়ের সূচনা করে। এই দিনে বাঙালি জাতির ললাটে সারাজীবনের জন্য এক কালো টিকা লাগিয়ে দেয় নরপশুগুলো। এ যেন গোটা বাংলাদেশকেই হত্যা করার শামিল। সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ও তাঁর নিভৃত সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, হত্যা করা হয়েছিল শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ছোট্ট রাসেলও রেহাই পায়নি। 

রেহাই পায়নি কামাল-জামালের বধূ সুলতানা ও রোজী। যাদের হাতের মেহেদীর রঙ বুকের রক্তে মিশে একাকার হয়ে গেছে। খুনিরা এখানেই শেষ করেনি বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ নাসের, তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধুর ভাগিনা শেখ মনি ও তার স্ত্রী আরজুকেও তারা খুন করেছে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। আর সেই রাতেই নিভে যায় বাংলার মানুষের আশা ভরসার সবচেয়ে আলোকিত ও উজ্জ্বলতম বাতিটি। 

বাঙালি জাতির জীবনে নেমে আসে শোকের ঘন কালো ছায়া। এ যেন মৃত্যু নয় বরং নতুন করে বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকা। নানা শেখ আবদুল মজিদের কথা অনুযায়ী আজ সারা বিশ্বে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ একটি নাম। বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু!

 

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।   

জবি/মাহি

রাইজিংবিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়