RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১২ ১৪২৭ ||  ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

লটারিতে ভর্তি: মা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা  

সেতারা কবির সেতু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১৩, ৩০ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৬, ৩০ নভেম্বর ২০২০
লটারিতে ভর্তি: মা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা  

ঢাকার স্কুলগুলোতে কেজি ও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে সাধারণত লটারি হয়। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। পরীক্ষা পদ্ধতি প্রথমে লিখিত তারপর মৌখিক। এতে সব বাচ্চা ভর্তির সুযোগ পায় না। লটারির ক্ষেত্রে ক্যাচমেন্ট অ্যারিয়ার জন্য আলাদা কিছু সিট নির্ধারণ করা থাকে। 

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, লটারি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত একটি পদ্ধতি। এখানে কখনোই আগে থেকে জানা যায় না কার নাম লটারিতে আসবে। কয়েকটি স্কুলে আবেদন করার পরও যখন লটারিতে বাচ্চার নাম আসে না, তখন ছোট্ট ওই বাচ্চার মনের উপর একটি বিরূপ প্রভাব পড়ে। বাচ্চার অভিভাবকও আশাহত হন। 

এবার আমাদের কথা বলি, লটারি ভাগ্য কখনোই আমাদের প্রসন্ন ছিল না। গত বছর ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি আর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে আমার ছেলেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করার জন্য আবেদন করি। এই ভর্তি পরীক্ষা ছিল লটারিতে। আগেই বলেছি লটারি ভাগ্য আমাদের প্রসন্ন নয়। ফলাফল,  কোনো স্কুলে লটারিতে আমার ছেলের নাম আসলো না। আমার স্মৃতিতে আজও ভেসে ওঠে গত বছর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরিতে যখন লটারিতে অন্যদের নাম উঠছিল তার নাম না উঠার কারণে ছেলে খুব মন খারাপ করেছিল। তার বাবা তাকে সান্ত্বনা  দিয়ে বলেছিল, ‘তোমাকে পরিশ্রম করে অর্জন করতে হবে বাবা।’ 

ছেলেকে কোথায় ভর্তি করাবো এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে শুরু হলো মতপার্থক্য। আমি চেয়েছিলাম ছেলেকে ভালো কোনো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করাতে। কিন্তু আমি জানি কর্তার সিদ্ধান্তই চূরান্ত হবে। অবশেষে বাসার কাছাকাছি হত্তয়ায় কর্তা ছেলেকে নীলক্ষেত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়। 

যথারীতি আমার সিদ্ধান্ত না টিকাই আমার মনটা একটু খারাপ হলো। ছেলেকে আমি সাধারণত বাসা থেকে টিফিন দিতাম। আমি লক্ষ করলাম সে টিফিন খায় না। আমি তাকে বললাম, তুমি প্রতিদিন টিফিন ফেরত নিয়ে আসো কেন? উত্তরে ছেলে আমাকে বললো, মা আমার অনেক ফ্রেন্ড বাসার টিফিন আনে না। আর পরিমাণ কম হওয়ার কারণে আমি সবার সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না। তাই তাদের সামনে টিফিন খেতে আমার আনইজি লাগে। 

একদিন ছেলে তার বাবাকে বলছে, বাবা আমার স্কুলে অনেক ছাত্রছাত্রীরই ভালো স্কুল ব্যাগ নেই। সবার যদি একই রকম স্কুল ব্যাগ হতো তাহলে অনেক ভালো হতো তাই না। আমি বুঝতে পারি, সে কিছু বাস্তব শিক্ষা এখান থেকে গ্রহণ করছে। যা তার জীবনের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন। বিষয়টি আমাদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। আর এখানকার শিক্ষকরাও অনেক আন্তরিক। 

এরপর শুরু হলো দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য ভর্তি পরীক্ষা। ছেলে প্রথমে পরীক্ষা দিলো ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে সে ভর্তির সুযোগ পায়। ভর্তি করানো হলো। এরপর পরীক্ষা দেয় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ অর্থাৎ বুয়েট স্কুলে। এখানেও সে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়।  যেহেতু আমাদের ইচ্ছে ছিল তাকে বুয়েট স্কুলে ভর্তি করানোর, তাই ইউল্যাব থেকে বুয়েট স্কুলে ভর্তি করানো হলো।  এরপর রেজাল্ট হলো গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরির। এখানে পরীক্ষার্থী অনেক বেশি। এটি ছেলেদের স্কুল হওয়ার জন্য অনেকের প্রথম পছন্দ। এখানেও সে ভর্তির সুযোগ পায়। 

এই গল্পটি বলার পেছনে আমার একটি উদ্দেশ্যে ছিল। অধিকাংশ অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের কখনোই সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে চায় না। এই অভিভাবকদের মধ্যে ছিলাম আমিও একজন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম শ্রেণি সরকারি স্কুলে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হত্তয়ার জন্য সে যে কয়েকটি স্কুলে পরীক্ষা দেয় সবগুলোতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়। তার মানে সরকারি স্কুলেও ভালো পড়াশোনা করানো হয়। আমি মনে করি একটি কোমলমতি শিশুর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ তার পরিবার। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ ও সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সচেতন অভিভাবক। 

এবার শিশুদের ভর্তি যুদ্ধ নিয়ে বলি। আমার মনে হয়,  ছোট্ট শিশুদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হচ্ছে তাদের ভর্তি পরীক্ষা। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এই পদ্ধতি চালু আছে কি না তা আমার জানা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে যে এর প্রভাব কতটা প্রকট তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি গত বছর। ঢাকা শহরের চিত্র বলি, নাম করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি করানোর জন্য শুরু হয় ভর্তি কোচিং। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষা দিবে তার জন্য করতে হয় শিশুদের কোচিং ক্লাস। 

খুবই অবাক করা বিষয় কোচিং ক্লাস শুরুর দুই থেকে তিন মাস আগেই বাচ্চাকে কোচিংয়ে ভর্তি করে রাখতে হয়। কারণ, শেষে গেলে সিট খালি না থাকার কারণে তাকে আর কোচিংয়ে ভর্তি নেয় না। ভর্তি পরীক্ষার দুই এক মাস আগে থেকেই কোচিংগুলোতে শুধু বাচ্চাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়। ছোট্ট বাচ্চাগুলোর উপর যে কি পরিমাণ মানসিক চাপ দেত্তয়া হয়, তা বর্ণনার বাইরে। সেই সঙ্গে অভিভাবকদের শঙ্কা, উৎকণ্ঠা দেখে মনে হয় এই পরীক্ষা যেন শিশুদের নয়, অভিভাবকদের। 

লটারি পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভাগ্য নির্ভর। যাদের ভাগ্য ভালো, তাদের নাম আসে। যাদের নাম আসে না তারা মর্মাহত হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই ছোট্ট শিশুগুলোর উপর অনেক চাপ পড়ে যায়। সেই সঙ্গে বাবা, মায়েরও কষ্ট হয় অনেক। পদ্ধতি যে কোনটা ভালো, তা আমার বোধগম্য নয়। যখন যে পদ্ধতি চালু হয়, তার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে চলতে হয়।

ঢাকা/মাহি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়