Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ৪ ১৪২৮ ||  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জাপানের আকর্ষণীয় ‘মেক্সট’ স্কলারশিপের বিস্তারিত

সৈয়দা রুবাইয়া নাসরিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৬, ২ ডিসেম্বর ২০২০  
জাপানের আকর্ষণীয় ‘মেক্সট’ স্কলারশিপের বিস্তারিত

জাপানি মানুষেরা উচ্চারণী ক্ষেত্রে কেন যেন শব্দসংক্ষেপণ করতে খুব আগ্রহী। উদাহরণ দেই, রাস্তার পাশে ছোট ছোট ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোকে বিদেশে বলে ‘কনভেনিয়েন্ট স্টোর’। সেটার নাম জাপানে এসে হয়েছে ‘কম্বেনি’। এই যে ‘মেক্সট’ বৃত্তিটার কথা আলাপ করছি তার নাম ‘মেক্সট’/ MEXT (আসলে MECSST) শব্দটি প্রকৃতপক্ষে Ministry of Education, Culture, Sports, Science and Technology। এই লম্বা বড়সড় নামটির সংক্ষিপ্তরূপ ‘মেক্সট’।

সেই ১৯৫৪ সাল থেকে শুরু করে এখন সারা বিশ্বের প্রায় ১৬০টির মতন দেশ থেকে আসা ছাত্রদের জন্য এই বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে জাপানি সরকার। জাপান সরকার প্রদত্ত বৃত্তিগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে খ্যাতনামা আর সবচেয়ে সম্মানিত। ভালোলাগার বিষয় হলো, এই বৃত্তির জন্য ভিসা পেলে ভিসাতে লেখা থাকে ‘Govt. Scholar’. এই কথাটা আমার আব্বু সুযোগ পেলেই খুব গর্বের সাথে উল্লেখ করে থাকেন।

সে যাক, ওয়েবসাইট বলছে, বর্তমানে ছয় ধরণের ছাত্রদের জন্য ‘মেক্সট’ বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে দুইটি বৃত্তি স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি পর্যায়ের রিসার্চ স্টুডেন্ট যা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য, টিচার ট্রেইনিং স্টুডেন্ট যা স্কুল বা কলেজ শিক্ষকদের জন্য। আর বাকি চারটি স্নাতক পর্যায়ের। সেগুলো হলো, ‘আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট’ যার জন্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ হতে হবে। ‘জাপানিজ স্টাডিজ স্টুডেন্ট ‘যার জন্য স্নাতক পাশকৃত হতে হবে। ‘কলেজ অফ স্টাডি স্টুডেন্ট’ ও ‘স্পেশাল ট্রেইনিং কলেজ স্টুডেন্ট’ এই দুটিও স্নাতক পাশকৃতদের জন্যে।

পিএইচডি বা মাস্টার্স পর্যায়ে যোগ দেওয়ার জন্য এই স্কলারশিপে আপনার বয়স ৩৫ বছরের নিচে আর অন্যগুলোর জন্য বয়স হতে হবে ১৭-১৮ থেকে ২৫-৩০ এর মধ্যে। বেশ কিছু বিষয় আমাকে ‘মেক্সট’ বৃত্তির প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশ থেকে জাপানের মতন একটি দেশে গবেষণা করবার সুযোগ তাও কিনা তাদেরই পয়সায়, এটা আমার জন্য বড় আকর্ষণ ছিল। প্রতিবছর বহুসংখ্যক ছাত্রকে জাপান সরকার এই বৃত্তি দিয়ে থাকে।

ওয়েবসাইটে দেখলাম, এ বছরের পরিকল্পনা মতে সব শাখা মিলিয়ে এই সংখ্যা হবে সাড়ে চার হাজারের মত। তাই বলে কম্পিটিশন নেই এটি ভাবলে ভুল করছেন। ২০১৬ সালে আমি যে সেশনে হোক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পেয়ে আসি, সে বছর ১০৬৫ জন বিদেশি ছাত্রের মধ্যে কেবল ৫ টি আসন বরাদ্দ ছিল ‘মেক্সট’প্রাপ্তের জন্য।

বৃত্তিপ্রাপ্তদের নিজ নিজ দেশ থেকে জাপানে আসার জন্য ও ঠিক সময়ে ডিগ্রি শেষে দেশে ফিরে যাবার জন্য বিমান ভাড়া ‘মেক্সট’ বহন করে থাকে। অন্যান্য অনেক বৃত্তিতেই এই সুবিধাটা থাকেনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনোরকম টিউশন ফি, পরীক্ষা ফি বা অন্যান্য কোনো ফি দিতে হয় না। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর যাবতীয় ফি মওকুফ আর পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার টিউশন ফি আর অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করে শিক্ষা, প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

এই প্রোগ্রামের বিভিন্ন বৃত্তির আওতায় স্নাতক পর্যায়ে চার বছর, স্নাতকোত্তরের জন্য ২ বছর আর পিএইচডি এর জন্য ৩ বছর সময় বরাদ্দ করে দেওয়া। আমার পরিচিত ৮-১০ জনের মধ্যে একজনকেই কেবল দেখেছি যিনি ঠিক সময়ে ডিগ্রি নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিগ্রি না হলেও সময়সীমা শেষে বৃত্তি বন্ধ হয়ে যাবে এবং তখন অর্থের ব্যবস্থা ছাত্রের নিজের করতে হবে। তবে এসব বিপদে রিসার্চল্যাবের প্রফেসরই অন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে ছাত্রকে উদ্ধার করেন।

আমার জন্য আরেকটা বড় আকর্ষণ ছিল আমি মাস্টার্স পরীক্ষা শুরু হবার আগেই পিএইচডি করার আবেদন করতে পেরেছিলাম। অবশ্য আমি ইউনিভার্সিটির সুপারিশে ‘মেক্সট’ বৃত্তি পেয়েছি।

মাস্টার্স বা পিএইচডিতে আবেদনের জন্য মেক্সটের নিজস্ব সিজিপিএ মানদন্ডে মোট ৩ এর মধ্যে ২.৩০ থাকতে হবে। তাও সেই ফল আবার সর্বেশেষ দুই একাডেমিক বছরের গড় হতে হবে। আমার জানা কোন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়েই সিজিপিএ ৩ এ বিচার হয় না। ‘মেক্সট’ এর এই হেঁয়ালি কেন এটা তারাই ভাল জানবেন। তাই গ্রেডকে ৪ এর স্কেল থেকে ৩ এর স্কেলে বদলে নিতে তাদের একটা কনভার্সন চার্ট আছে।

জাপানের সেশনগুলো দুইটা সেমিস্টারে শুরু হতে পারে। প্রথম সেমিস্টার এপ্রিল থেকে, দ্বিতীয়টি শুরু হয় অক্টোবর থেকে। বৃত্তির সমস্ত প্রক্রিয়াটা বেশ লম্বা। বৃত্তিভেদে ডেডলাইন আলাদা হবে, সে বিষয়ে পূর্ণ তথ্য অবশ্যই আগে থেকে সংগ্রহ করে নিবেন।

জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মেক্সটের ওয়েবসাইটে দারুণ গুছিয়ে ‘মেক্সট’ বৃত্তির যাবতীয় বৃত্তান্ত সাজিয়ে রাখা আছে। তিনটি উপায়ে বৃত্তির জন্য আবেদন করা সম্ভব-
জাপানী সরকার বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তিনটি উপায়ে নিয়োগ ও নির্বাচিত করে। দূতাবাসের সুপারিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ ও ঘরোয়া নির্বাচন।

আমার অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে কঠিন ধাপ হলো আবেদন প্রক্রিয়া। উপরের তিনটি উপায়ের মধ্যে আমি ‘মেক্সট’ পাই দ্বিতীয়টির মাধ্যমে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশে। প্রথমটির ক্ষেত্রে এই সুপারিশ করে থাকে দূতাবাস। তৃতীয়টির সম্পর্কে এখানে কিছু বলছিনা।

দূতাবাসের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ‘মেক্সট’ পাওয়াটা অপেক্ষাকৃত কঠিন কারণ এর জন্য আপনাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হতে হবে। রিসার্চ স্টুডেন্টদেরকে ইংরেজি ও জাপানিজ দুইটি পরীক্ষা আর অন্যান্য ক্ষেত্রে জাপানি, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান এই বিষয়গুলোতে পরীক্ষা দিতে হয়। ওদের অফিশিয়াল সাইটে বেশ কিছু নমুনা প্রশ্ন উত্তরসহ দিয়ে রাখা আছে।

এই বৃত্তি পাওয়া ছাত্রদের সেশন শুরু হয় এপ্রিল থেকে। আর আবেদন চেয়ে সার্কুলার দেওয়া হয় আগের বছর এপ্রিল আর মে এর মাঝে। জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝে প্রাথমিক বাছাই সম্পন্ন হয়। এর জন্য আছে তিনটি ধাপ- কাগজপত্র যাচাই, লিখিত পরীক্ষা আর সাক্ষাৎকার। আগস্টের শেষদিকে প্রার্থীরা তাদের ফলাফল জানতে পেরে যান।

অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ‘মেক্সট’ পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ আলাদা। সেশন শুরু হয় অক্টোবরে। যথারীতি আগের বছরের অক্টোবরে আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু হতে থাকে।

এজন্য আপনাকে আরো অনেক আগে থেকেই আপনি যে কাজে গবেষণা করতে ইচ্ছুক সেরকম বিষয় নিয়ে কাজ করছেন এমন কয়েকজন প্রফেসরকে পছন্দ করতে হবে। প্রত্যেকের কাছে নিজের নাম পরিচয়, জীবনবৃত্তান্ত, শিক্ষাজীবনে আপনার যা অর্জন সেসবের বর্ণনা আর তার সাথে কাজ করতে আপনার কত আগ্রহ সেসব বুঝিয়ে দিয়ে সুন্দর করে ই-মেইল আর কী লিখুন। হয়ত সবাই সাড়া দেবেন না। এটাই ধরে রাখুন। কিন্তু উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ল্যাব প্রধানদের চিঠি পাঠাতেই থাকুন।

আপনি পছন্দ করলেন এমন কেউ আপনাকে পছন্দ করলেই তাকে জানিয়ে দিন আপনি ‘মেক্সট’ বৃত্তি নিয়ে পড়তে যেতে আগ্রহী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটগুলোতেই উল্লেখ থাকে ‘মেক্সট’ বৃত্তি পেতে কী করণীয়।

এরপরের নিয়মগুলো অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন হয় সেরকমই, প্রফেসরকে মুগ্ধ করার মতন ভবিষ্যত গবেষণার পরিকল্পনা, বিগত সময়ে কাজের অভিজ্ঞতা আর সফল সাক্ষাৎকার। আমার প্রফেসর আমার সাক্ষাৎকার নিতে নিজে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। আর স্কাইপে জাপান থেকে আরো দুজন প্রফেসর যোগ দিয়েছিলেন।

এই সাক্ষাৎকারে সফল হলে তখন আপনার প্রফেসরই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে সুপারিশের ব্যবস্থা করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় সুপারিশ করলে আপনি ‘মেক্সট’ না পাবার আর কারণ দেখছিনা। যদিনা আপনার বিরুদ্ধে চুরি-ডাকাতির কোন রিপোর্ট থাকে।
বিস্তারিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করা যেতে পারে ‘মেক্সট’ অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট- https://www.mext.go.jp/en/index.htm ‘মেক্সট’ বৃত্তি বিষয়ক তথ্যাদি https://www.studyinjapan.go.jp/en/planning/scholarship/
ঢাকার জাপান দুতাবাস https://www.bd.emb-japan.go.jp/itpr_ja/00_000706.html
লেখক- হোক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাক্তন মনবুশো স্কলারশিপপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী 

ঢাকা/নোবেল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়